পাহাড়ে বন্‌ধ নিয়ে
রইলো অনিশ্চয়তাই

নিজস্ব সংবাদদাতা

শিলিগুড়ি, ১২ই সেপ্টেম্বর — নবান্ন থেকে উত্তরকন্যা। কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি। বদল হলো স্থান, কাল। যে তিমিরে ছিল পাহাড় সেই তিমিরেই রয়ে গেল সমস্যা।

গোর্খাল্যান্ডের দাবি এড়ানো গেল না সরকারের দ্বিতীয় সর্বদলীয় সভাতেও।

নবান্নের মতো উত্তরকন্যার সভাতেও উঠল গোর্খাল্যান্ডের দাবি। এবার সেই দাবি আদায়ে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের আয়োজন নিশ্চিত করার জন্য খোদ মমতা ব্যানার্জিকেই দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানিয়ে গেলেন পাহাড়ের নেতারা।

আর অনির্দিষ্টকালের বন্‌ধ?

২৯শে আগস্ট ৭৮দিনে পড়েছিল পাহাড়ের বন্‌ধ। এদিন মিটিং-এর আগে তা ৯০দিনে পৌঁছায়। ১৩দিন আগে নবান্ন থেকে বৈঠক করে বন্‌ধ প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। উলটে ওই বৈঠকেই তাঁকে শুনতে হয়েছিল আলাদা রাজ্যের দাবি। দুসপ্তাহ পরে শিলিগুড়ির উত্তরকন্যার একই বৈঠকের আগে ৯০দিনে পড়া পাহাড়ের বন্‌ধ প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়েছে রাজ্য সরকার। কিন্তু সমাধান মেলেনি।

২৯শে আগস্টও যা বলেছিলেন মমতা ব্যানার্জি এদিনও শিলিগুড়িতে তাঁর মুখে ধরা ছিল ওই একই বাক্য। আর তা হলো,‘‘ কলকাতায় গত বৈঠকও ফলপ্রসূ হয়েছে। এদিনের বৈঠকও ফলপ্রসূ হয়েছে। আলোচনা জারি থাকবে।’’ আগামী ১৬ই অক্টোবর কলকাতায় ফের আলোচনার দিন ঠিক হয়েছে। ফলে উত্তরকন্যায় দ্বিতীয় দফার বৈঠক থেকেও সমস্যা সমাধানের কোন সূত্র বেরিয়ে আসলো না। পাহাড়ে বন্‌ধ আদৌ প্রত্যাহার করা হবে কিনা তা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়ে গেল।

গোপন ডেরা থেকে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সুপ্রিমো বিমল গুরুঙ জানিয়েছেন, ‘‘পাহাড়ে বন্‌ধ ডেকেছে বিনয় তামাঙ। একমাত্র ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে গোর্খাল্যান্ড নিয়ে আলোচনা হলে বন্‌ধ প্রত্যাহার করা হতে পারে। আমরা চাই ত্রিপাক্ষিক বৈঠক। যেখানে আলোচনা হবে আলাদা রাজ্যের দাবি।’’ তাৎপর্যপূর্ণভাবে এদিন মুখ্যমন্ত্রীও বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন,‘‘পাহাড়বাসীর মনোভাব আমি বুঝি। সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান দরকার।’’

এদিনের বৈঠকে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা থেকে বহিষ্কৃত বিনয় তামাঙ মোর্চার প্রতিনিধিত্ব করছেন বলে জানান। আর এক বহিষ্কৃত নেতা অনিত থাপাসহ মোট ছয় জন উপস্থিত ছিলেন। গুরুঙপন্থী দুই বিধায়ক অমর রাই ও সরিতা রাই এদিনের বৈঠকে যোগ দিলেও বিনয় তামাঙ জানান, তাঁরা সবাই মোর্চার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন। এমনকি বৈঠকে মোর্চার ১৭দফা দাবিও পেশ করা হয়েছে দলের প্যাডে। জি এন এল এফ-র মন ঘিসিঙসহ পাঁচ জন, জন আন্দোলন পার্টির হরকা বাহাদুরসহ পাঁচজন, এ বি জি এলের ভারতী তামাঙ, লক্ষণ প্রসাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় ধরে বৈঠক চলে। তবে সি পি আর এম-র কোন প্রতিনিধি বৈঠকে ছিলেন না। তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে জানা গেছে।

এদিনের বৈঠকে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। যার রেশ ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। কারণ যখন জি টি এ ছিল তখন ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের গুরুত্ব ছিল। উল্লেখ্য কোন সমস্যার সৃষ্টি হলে তা দ্রুত ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়া হবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ ছিল। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এখন জি টি এ বলে কিছু নেই। সুতরাং সব কিছু খতিয়ে দেখতে হবে। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও সমাধানের বিষয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই এ বি জি এলের সম্পাদক লক্ষণ প্রসাদ সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, পৃথক রাজ্যই পাহাড়ে স্থায়ী সমাধানের একমাত্র রাস্তা।

মুখ্যমন্ত্রী বললেও বন্‌ধ প্রত্যাহার নিয়ে পাহাড় থেকে আসা কোন নেতাই স্পষ্টভাবে কিছু বলতে পারেননি। বিনয় তামাঙ বৈঠকে দেওয়া তাদের দাবিসনদের কথা সাংবাদিকদের জানান। দাবিসনদের পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা কিছু বিষয়ে সহমত পোষণ করেছি। অন্যতম দাবি ছিল পাহাড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত ও আহতদের পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণ প্রদান ও গুলি চালানোর ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করা। মুখ্যমন্ত্রী দুটি দাবিই মেনে নিয়েছেন। উল্লেখ্য, এতদিন ধরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল কোন রকম গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেনি। আন্দোলন চলাকালীন ৮জনের পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়। ৪৫জন জখম হন। বিনয় তামাঙ দাবি জানিয়েছেন, আন্দোলন চলাকালীন যাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে সেইসমস্ত মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের ছেড়ে দিতে হবে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী এবিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি। বন্‌ধ চলাকালীন কোন সরকারি ও জিটিএ কর্মীর কর্মক্ষেত্রে কোনরকম ছেদ চলবে না। তবে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন আগামী ১৫ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে যারা কাজে যোগ দেবেন তাদের এক মাসের অগ্রিম বেতন দেওয়া হবে। এছাড়াও স্কুল,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে। একইভাবে পাহাড়ের চা বাগানের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির আওতায় আনার পাশাপাশি চা শ্রমিকদের বোনাসের দাবিও এদিন লিখিতভাবে জানান বিনয় তামাঙরা। পাহাড়ে বিস্ফোরণের ঘটনারও উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে স্মারকলিপিতে। বন্‌ধ প্রত্যাহার নিয়ে বৈঠকে যোগ দেওয়া দলগুলি কি সিদ্ধান্ত নেয় সেটাই দেখার।