উৎসবের পরেই দাবি আদায়ের
লড়াইয়ে উত্তাল হবে রাজ্য

লালবাজার অভিযান থেকেই বার্তা

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১৩ই সেপ্টেম্বর— দাবিসনদ পেশ অনেক হয়েছে। এবার শুরু হবে দাবি আদায়ের লড়াই। শারদোৎসবের পর গোটা রাজ্যে আরও উত্তাল চেহারা নিয়ে দাবি আদায়ের লড়াই শুরু করার বার্তা দিল বুধবারের লালবাজার অভিযান। এই লালবাজার অভিযানে পা মিলিয়ে রাজ্য বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু বললেন প্রয়োজনে আবারও নবান্ন অভিযান, আরও লালবাজার অভিযান সংগঠিত হবে। এরাজ্যের আন্দোলন সংগ্রামের ঐতিহ্য নিয়েই প্রয়োজনে নতুন করে বাংলা গড়তে হবে। এই অভিযানের শেষে মঞ্চ গড়ে সভা থেকে সি পি আই (এম)-র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র বললেন, উৎসবের পরেই এরাজ্যের বামপন্থী ও বাম-সহযোগী গণসংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ গড়ে দাবি আদায়ের লড়াই শুরু হবে। কোন দাবি আদায়? পুলিশ যদি চোর, প্রতারকদের না ধরে তাহলে আমাদেরই ধরতে হবে। যে এলাকা থেকে আমরা আসছি, সেখানে সকলে ডিজিটাল রেশন কার্ড না পেলে তা আদায়ের লড়াই, ২টাকা কেজি চাল না পেলে তা আদায়, একশো দিনের কাজ, বকেয়া মজুরি, বিদ্যুতের দর ইউনিট পিছু তিন টাকা দর এসবই আদায় করতে হবে।

কলকাতা জেলা বামফ্রন্টের ডাকে এদিন সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় শুরু হলো লালবাজার অভিযান। হিন্দ সিনেমার পর সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পেরিয়ে গনেশচন্দ্র অ্যাভিনিউয়ের মোড়ে পুলিশের ব্যারিকেডের এপারে থামতে হলো জনস্রোতকে। এখানেই মঞ্চ গড়ে সভা হয় এবং এই সমাবেশ থেকে প্রতিনিধিদল লালবাজারে গিয়ে স্মারকলিপি পেশ করে আসেন। এদিন সূর্য মিশ্র জানালেন গণসংগঠনের যৌথ মঞ্চ বি পি এম ও-র উদ্যোগে রাজ্যজুড়ে পদযাত্রা কর্মসূচি সংগঠিত হবে শারদোৎসবের পর। কোচবিহার থেকে শিলিগুড়ি এবং পুরুলিয়া থেকে কলকাতা। শুধু এই দুই দীর্ঘ পদযাত্রাই নয়, গ্রাম-শহরের প্রতি বুথ থেকে পদযাত্রা বের হবে। কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-যুব-মহিলা সমস্ত গণসংগঠনের যৌথ প্রতিরোধের লড়াই শুরু হবে। বুধবার এই অভিযানে পা মিলিয়ে বিমান বসু বলেছেন, যেভাবে এই তৃণমূলী সরকারের মেয়াদে বিরোধীদের ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে তার অতীত নজির নেই। ঠিক যে কায়দায় নবান্ন অভিযানে শামিল মহিলা-বৃদ্ধ-শিশু নির্বিশেষে নৃশংস আক্রমণ চালানো হয়েছে সেভাবেই গত ১১ই সেপ্টেম্বর জেলায় জেলায় অভিযানের ওপর হামলা-আক্রমণ চালিয়েছে।

বুধবার লালবাজার অভিযানের এই সভায় এছাড়াও বক্তব্য রেখেছেন ফরওয়ার্ড ব্লকের হাফিজ আলম সইরানি, সি পি আই-র তাপস ভট্টাচার্য, আর এস পি-র সুকুমার ঘোষ, সি পি আই (এম)-র রবীন দেব। লালবাজারে যাওয়া প্রতিনিধিদলে ছিলেন জেলা বামফ্রন্টের আহ্বায়ক নিরঞ্জন চ্যাটার্জি, সি পি আই (এম)-র তরুণ ব্যানার্জি, সি পি আই-র প্রবীর দেব, আর এস পি-র তপন মিত্র, ফরওয়ার্ড ব্লকের জীবন সাহা, ওয়ার্কার্স পার্টির শৈবাল চ্যাটার্জি, আর সি পি আই-র সন্দীপ দত্ত এবং বি বি সি-র উমেশ চৌধুরি। এদিন লালবাজার অভিযানে সূর্য মিশ্র বললেন সামনে শারদোৎসব। কিন্তু এই উৎসবের দিনেও লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ যাঁদের ঘরে খাবার নেই, মাথার ওপর ছাদ নেই, পরনের পোশাক নেই তাঁদের কথা ভাবতে হবে। তাঁদের পাশে আমরা বামপন্থীরা ছাড়া আর কে থাকবে?

বুধবার লালবাজার অভিযানে গনেশচন্দ্র অ্যাভিনিউয়ে সভায় সূর্য মিশ্র বলছিলেন আজ হাতে ঘড়ি পরে আসিনি। পকেটে মোবাইলও রাখিনি। পায়ে যে চটিটা পড়ে আছি সেটাও বেশ কয়েক বছরের পুরানো। কেন এমন মন্তব্য? বললেন, আগে যখন জেলে গিয়েছি তখন এসব কিছুই সঙ্গে রাখতে দেয়নি। আপাতত রাজ্যে বাম কর্মী-নেতৃত্বের যখন-তখন গ্রেপ্তার করে জেলে ঢোকানোর মতো পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরলেন এদিন তিনি। বললেন, আমাদের পার্টির রাজ্য দপ্তরে পুলিস গিয়ে নোটিস ধরিয়ে আসছে। এমন নোটিস এখন রাজ্যের সর্বত্র ধরানো চলছে। কিন্তু আমরা এবার স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি, চিঠি বা নোটিস দিয়ে যেতেই পারেন। কিন্তু আর থানায় গিয়ে হাজিরা আমরা দিতে পারবো না। প্রয়োজন হলে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যান।

খুবই তাড়া ছিল ওনার! লালবাজারে স্মারকলিপি জমা দিয়ে আসার পর জেলা বামফ্রন্টের প্রতিনিধিদের তরফে এই কথাটাই প্রথম বললেন জেলা বামফ্রন্ট আহ্বায়ক নিরঞ্জন চ্যাটার্জি। নবান্ন অভিযানে যেপথে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ‘ব্যস্ত’ থেকে নবান্ন-ছাড়া ছিলেন, গত ১১ই সেপ্টেম্বর জেলায় জেলায় সদরে ধরনা অভিযানে জেলাশাসক ‘ব্যস্ত’ থেকে সদর-ছাড়া ছিলেন, ঠিক সেপথেই এদিন কলকাতার পুলিস কমিশনার ‘ব্যস্ত’ থেকে লালবাজার-ছাড়া ছিলেন। যুগ্ম পুলিস কমিশনার (সদর) স্মারকলিপি গ্রহণ করলেন এবং পুলিশ কমিশনারকে জানিয়ে দেবেন বলে জানালেন। নিরঞ্জন চ্যাটার্জি এদিন বললেন এতই তাড়া ছিল ওনার যে স্মারকলিপি পড়ারও সময় হয়নি। তবে জেলা বামফ্রন্ট প্রতিনিধিরা এদিন লালবাজারের কর্তাদের জানিয়ে এসেছেন চাই ইতিবাচক পদক্ষেপ। অন্যথায় শারদোৎসবের পর আরও উত্তাল চেহারার আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে পুলিশ, প্রশাসনকে।

স্মারকলিপি গ্রহণ করতেও শাসকের অনীহা প্রসঙ্গে এদিন সূর্য মিশ্র বলেছেন শুরুটা হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীকে দিয়ে। এরপর জেলা সদরে গণডেপুটেশন কর্মসূচিতেও জেলাশাসকেরা দেখা করেননি। এখন পুলিশ কমিশনারও দেখা করলেন না। এরপর হয়তো গ্রামে-গঞ্জে বি ডি ও বলবেন দেখা করবেন না। প্রশ্ন হলো তাহলে মানুষের জরুরি সমস্যার দাবির কথা কে শুনবে? তিনি বলেছেন, শাসকেরা শুনে রাখুন পরের বার নিশ্চিত করতে হবে পুলিশ কমিশনার, জেলাশাসকেরা থাকবেন। অন্যথায় আমাদের বিনা নোটিসেই দাবি আদায়ের লড়াই সংগঠিত হবে। এই সভায় এদিন রবীন দেব বললেন রাজ্যে মমতা ব্যানার্জি আর কেন্দ্রে মোদী এই দুয়েরই প্রতিযোগিতা চলছে কিভাবে হিন্দু-মুসলিমে দাঙ্গা বাঁধানো যায়। ফরওয়ার্ড ব্লকের হাফিজ আলম সইরানি বললেন সাম্প্রতিক বন্যায় অনেক মানুষের মৃত্যু হলো। কিন্তু এখন রাজ্য সরকার বলছে মৃতদের পরিবারকে কোনও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না।