চাষের জমিতে তথ্য প্রযুক্তি
শিল্পের নামে প্রোমোটিং হলে স্বাগতম!

দেবেশ দাস

সংবাদপত্রে দেখলাম বামফ্রন্ট সরকার ইনফোসিসকে রাজারহাটে যে ৫০ একর জমি লিজে দিয়েছিল, তৃণমূল সরকার সেই জমি লিজের বদলে ফ্রি-হোল্ড হিসাবে তুলে দিয়েছে ইনফোসিসের হাতে। মানে পুরো মালিকানা এখন কোম্পানির, কোম্পানি জমিটা যাকে খুশি বিক্রি করে দিতেও পারে, সরকারের তাতে কিছু বলার থাকবে না। আর লিজ মানে ছিল, যদি তুমি কিছু না করো, তবে জমি সরকারকে ফেরত দিতে হ‍‌বে। সিঙ্গুরে টাটাকে যে জমি দেওয়া হয়েছিল, তাও লিজেই দেওয়া হয়েছিল, টাটার তা বিক্রি করে দেওয়ার অধিকার ছিল না। ইনফোসিসের ক্ষেত্রে সরকার বলছে, জমির ৫১ শতাংশ শিল্প করো, বাকি ৪৯ শতাংশ জমিতে শিল্প ছাড়া অন্য কিছু করো। শিল্পের জন্য বামফ্রন্টের আমলে যে জমি পেয়েছিল, তার দাম হাউসিং করার জন্য যে দাম ছিল, তার থেকে অনেক কম ছিল। যেহেতু এখন ফ্রি-হোল্ড, তাই কোনও প্রোমোটারকে ঐ ৪৯ শতাংশ জমি অনেক দামে এখনই বিক্রি করা যায়। তাতে জমি কিনতে ইনফোসিসের মোট যে টাকা লেগেছে, তারচেয়ে অনেক বেশি টাকা পাওয়া যাবে ঐ ৪৯ শতাংশ জমি বিক্রি করেই। অর্থাৎ ইনফোসিসকে আর শিল্প করে লাভ করার প্রয়োজন নেই, সরকারের হাত থেকে সস্তায় জমি পেয়ে এখন বেশি দামে প্রোমোটারদের বিক্রি করেই তারা অনেক লাভ করতে পারে। সরকারের বক্তব্যে দেখলাম, কোম্পানিই এই লিজের জমি ফ্রি-হোল্ড করার আবেদন জানিয়েছিল। তৃণমূলের আমলে তাহলে রাজ্যে শিল্পপতিদের শিল্প ছেড়ে হাউসিং-এর প্রোমোটার হিসাবে উত্তরণ ঘটছে, তারা বুঝতে পারছে, এই সরকার প্রোমোটারদের প্রতি অতি-প্রসন্ন, শিল্পের প্রতি নয়। চাষের জমিতে শিল্প হলে তৃণমূলের আপত্তি থাকে, কিন্তু সেই জমিতে প্রোমোটিং হলে সুস্বাগতম। স্বাভাবিকভাবেই জমি হাঙররা তাকিয়ে আছে প্রাইম এলাকায় ঐ ৪৯ শতাংশ জমির দিকে।

বামফ্রন্টের আমলে ইনফোসিস ও উ‍‌ইপ্রো রাজারহাটে ৫০ একর জমি নিয়েছিল, বিদেশে সফটওয়্যার রপ্তানির জন্য শিল্প স্থাপন করবে বলে। ভারতের আই টি কোম্পানিগুলির মূল আয় সফটওয়্যার বিদেশে রপ্তানি করে। যেহেতু রপ্তানি করে বিদেশি মুদ্রা তারা দেশে আনে, তাই এই রপ্তানি করতে পারলে কর্পোরেট কর, আমদানি শুল্ক, পরিষেবা কর, উৎপাদন শুল্ক, কেন্দ্রীয় বিক্রয়কর ইত্যাদিতে ছাড় পায়। সব মিলিয়ে ছাড়ের পরিমাণ অনেক। তবে তার জন্য স্পেশাল ইকোনমিক জোনে (এস ই জেড) তাদের থাকতে হবে। এই এস ই জেড কেন্দ্রীয় আইন, সারাদেশের জন্য প্রযোজ্য।

কেন্দ্রীয় এস ই জেড আইন হওয়ার পর রপ্তানির শিল্প করবো বলে এস ই জেডের জন্য দেশজুড়ে অনেকে জমি নিতে শুরু করে। সরকারের কাছ থেকে সব ছাড় নিয়ে ২৫ শতাংশ মাত্র শিল্প দেখিয়ে বাকি জমিটা ব্যবসায়িক কাজে (বাড়ি, দোকান, ইত্যাদি) ব্যবহার করা শুরু করে। কিন্তু যারা শিল্পের জন্য কোম্পানি, যেমন টি সি এস, উইপ্রো, ইনফোসিস, তারা এস ই জেড করলে শিল্প করল, কিন্তু দেশজুড়ে প্রোমোটিংবাহিনীর ঝোঁক ছিল শিল্পের নামে অন্য কিছু করার দিকে। প্রোমোটিংবাহিনী এই সুযোগটা পেয়েছিল এই কারণে যে, কেন্দ্রীয় আইনে বলাই ছিল এস ই জেড করলে ২৫ শতাংশ শিল্প করলেই হবে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের দাবি ছিল ঠিক উলটো। এস ই জেড করলে অন্তত ৭৫ শতাংশ শিল্প করতেই হবে। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকারের আমলে যে এস ই জেডগুলি থেকে কোটি কোটি টাকা রপ্তানি হয়েছে, তার ৭৫ শতাংশ নয়, ১০০ শতাংশই শিল্প। কলকাতার সেক্টর ফাইভে মণিকাঞ্চন বলে একটি বাড়ি আছে, যেখান থেকে জুয়েলারি রপ্তানি হয়। পুরো বাড়িটাই শিল্প, কারিগররা কাজ করে। বহুদিন আগে থেকেই ওটা এস ই জেড। সেক্টর ফাইভে আই টি কোম্পানি উইপ্রোর একটি ১৮ একর জমি আছে এস ই জেড। পুরোটাই শিল্প। ফলতায় এস ই জেড আগে থেকেই আছে। সিঙ্গুরের টাটা ন্যানো কোম্পানি কিন্তু এস ই জেড নয়, কারণ ন্যানো তো রপ্তানির জন্য বানানো হচ্ছিল না।

২০০৫ সালে নতুন এস ই জেড আইন আসার পর মোট ৭টি এস ই জেড কেন্দ্রীয় সরকারের ফর্মাল অনুমোদন পায়—সবই বামফ্রন্ট সরকারের আমলে। ২০০৫-এর পর এই অনুমোদনের সংখ্যায় তেলেঙ্গানাসহ অন্ধ্র প্রদেশে ৯৪, কর্ণাটকে ৬২, তামিলনাড়ুতে ৫০, মহারাষ্ট্রে ৫৭। পশ্চিমবঙ্গের এই ৭টিতে মোট জমির পরিমাণ ১৫৪ হেক্টর, এই ১৫৪ হেক্টরের মধ্যে প্রায় ৭০ একরে কাজ শুরুই হয়নি, তাতে দাঁড়ালো ৮৪ হেক্টর। যে রাজ্যগুলোর নাম করলাম, সেইগুলোতে পশ্চিমবঙ্গে মোট যা এস ই জেডের জমি আছে, সেখানে এক-একটা এস ই জেডেই তারচেয়ে অনেক বেশি জমি আছে। পশ্চিমবঙ্গের মতো কম এস ই জেডও অবশ্য কয়েকটি রাজ্যে আছে—যেমন ওডিশা ৭, গোয়া ৭। ওডিশায় ৭টিতে জমির পরিমাণ ১৮২০ হেক্টর, গোয়ায় ৩৭০ হেক্টর। মানে গোয়াতেও এস ই জেডের মোট জমি পশ্চিমবঙ্গ থেকে বেশি।

অনেকের মনে থাকবে যে, উইপ্রো-ইনফোসিস জমি নেওয়ার ব্যাপারে বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই বেশ টানাপোড়েন হয়েছিল। কারণ ছিল, জমির দাম। হিডকো শিল্পের জন্য এক একর জমি দেড় কোটি টাকা করে দাম ধার্য করেছিল। সেই দামেই অনেক ছোট কোম্পানি জমি নিয়েছিল, এমনকি বড় কোম্পানি টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিস (টি সি এস)-ও সেই দামে ৪০ একর জমি নিয়েছিল। তারা সেখানে এস ই জেড বানিয়েছে, কয়েক হাজার ছেলেমেয়ে সেখানে চাকরি করে। কিন্তু উইপ্রো-ইনফোসিস চাইছিল সস্তায় জমি, তাদের যুক্তি ছিল অন্য রাজ্যে তারা সস্তায় জমি পায়, যে দাম এখানে ধার্য হয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশ বা তারও কম দামে তারা অন্য রাজ্যে জমি পাচ্ছে। আবার বামফ্রন্ট সরকারের কাছে ছিল স্বচ্ছতার প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় কোম্পানি টি সি এস যেখানে দেড় কোটি করে একর দামে ৪০ একর জমি নিয়েছে, ছোট কোম্পানিরাও একই দাম দিচ্ছে, সেখানে হিডকো কিভাবেই বা কারোর জন্য স্পেশাল কম দাম করতে পারে যেখানে দুটোই আই টি কোম্পানি? সংবাদপত্রে দেখলাম, তৃণমূল সরকার বলছে, একই ধরনের কোম্পানি হলেও, তারা কেস-টু-কেস বিচার করে কাউকে বেশি, কাউকে কম সুবিধা দেবে। বামফ্রন্ট সরকার এটা করেনি। টি সি এস-এর রপ্তানি ছিল উইপ্রো-ইনফোসিস থেকেও বেশি। টি সি এস এস ই জেড করেছে। উইপ্রো-ইনফোসিসও এস ই জেড করতে চায়। আই টি কোম্পানির মূল ব্যবসাটাই বিদেশের সাথে, রপ্তানি করেই তাদের মূল আয়, তার জন্য ছাড় পেতে গেলে কেন্দ্রীয় সরকারের আইনে এস ই জেড করতেই হবে। শেষপর্যন্ত দেড় কোটি করেই একর প্রতি দাম দিয়েই উইপ্রো-ইনফোসিস জমি নিল ৫০ একর করে হিডকোর কাছ থেকে লিজে। বামফ্রন্ট সরকার বললো, সারাদেশে যেখানে এস ই জেডে তখন নিয়ম ‍‌ ২৫ শতাংশ শিল্প করলেই চলবে, বামফ্রন্টের কথা অন্তত ৭৫ শতাংশ শিল্প করতেই হবে। সেইভাবেই হিডকোর সাথে চুক্তি হলো। কিন্তু এরাজ্যে ‍‌টি সি এস-সহ অন্যান্যরা যেমন এস ই জেডে ১০০ শতাংশই শিল্প করতে চায়, উইপ্রো-ইনফোসিসও সেটাই করতে চায় বলে মুখে জানিয়েছিল।

নতুন তৃণমূল সরকার আসার পর উইপ্রো-ইনফোসিস এস ই জেডের অনুমোদনের জন্য আবেদন করে। তখন সরকার বলে, চাষের জমিতে শিল্পের জন্য এস ই জেড তারা করতে দেবে না। এদিকে এস ই জেডের অনুমোদন না পেলে তাদের কাছে যে বিদেশে সফটওয়্যার রপ্তানি করার প্রজেক্টগুলো আছে, তা তারা করতে পারবে না। এটাই তো তাদের মূল ব্যবসা। ৬ বছর ধরে ঝুলিয়ে রেখে দিল সরকার, আই টি-তে সময়টা বড় বিষয়, এই ৬ বছরে পশ্চিমবঙ্গ সেখানে অনেকটাই পিছিয়ে গেল। ৬ বছর পর এখন সরকার বলছে—শিল্পের জন্য চাষের জমিতে এস ই জেড হবে না, কিন্তু প্রোমোটিং চলবে।

সংবাদপত্রে দেখলাম, ইনফোসিস রাজারহাটে এক হাজার জনের চাকরি হবে বলেছে, ৫০ একরে মাত্র হাজার। উইপ্রোর বর্তমান সল্টলেকের এস ই জেডে একর প্রতি প্রায় ৫০০জন কাজ করে, আরও বাড়বে বলছে, সেই অনুপাতে ইনফোসিসের ৫০ একরে ২৫ হাজার ছেলেমেয়ের চাকরি হওয়ার কথা ছিল। ইনফোসিস আরও বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। ৫০ একরে মাত্র ১০০ কোটি। ৫০ একরে আই টি-র প্রথম ধাপে ইনফ্রাস্ট্রাকচার করতেই প্রায় কম করে ২০০০ কোটি টাকা লাগার কথা। স্বভাবতই ইনফোসিস এখান থেকে আর রপ্তানি করবে না, ভবিষ্যতেও তাদের এখান এস ই জেড বানানোর সুযোগ থাকবে না। কারণ জমিতে ইট ফেলার আগেই এই এস ই জেডের অনুমোদন নিতে হয়—এটাই আইন। সফটওয়্যার রপ্তানি থেকেই আই টি কোম্পানিগুলির মূল আয়। তাই মূল ব্যবসা যে ইনফোসিস পশ্চিমবঙ্গে আনছে না, তা একেবারেই পরিষ্কার।