দেশের ভালো হচ্ছে না

বার্মায় সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ এবং সেদেশের সেনাবাহিনীর যৌথ অত্যাচার ও নিপীড়নের জেরে যখন লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা প্রাণের দায়ে সর্বস্ব হারিয়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় প্রার্থী তখন তাদের ভারতে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেই মোদী সরকার ক্ষান্ত হয়নি উলটে ইতিমধ্যেই ভারতে বসবাসকারী ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী ঘোষণা করে বিতাড়নে তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে। এই ঘটনা থেকে মানবাধিকার প্রশ্নে এই সরকারের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি ফের স্পষ্ট হয়ে গেছে। কোনও দেশে অভ্যন্তরীণ কারণে হলেও কোনও জাতি, ভাষা ও ধর্মীয় গোষ্ঠী বা কোনও এক ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষের জীবন বিপন্ন হলে বাঁচার তাগিদে তারা যদি আশ্রয়ের সন্ধানে বের হয় তখন সেই সহায় সম্বলহীন অসহায় মানুষগুলিকে আশ্রয়দান নিকট প্রতিবেশী দেশগুলির মানবিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এটা আন্তর্জাতিকভাবেই একটি স্বীকৃত প্রথা বা বিধি। স্বাধীনতার পর থেকে বরাবরই ভারত শরণার্থীদের প্রশ্নে এমন মানবিকতা ও মহানুভবতা হাসিমুখে দেখিয়েছে। আশ্রয় প্রার্থী কোনও অসহায় মানুষকেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়নি। বিশ্ব মানবিকতার এই ভারতীয় ঐতিহ্য এবারই প্রথম ভাঙা হলো রোহিঙ্গা প্রশ্নে। কেন এমন অমানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করল মোদী সরকার।

এক্ষেত্রেও স্পষ্ট হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের নির্দেশনা। হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শে মানবিকতার স্থান নিতান্তই সংকীর্ণ। মনুষ্যত্ব ও মানবিকতা হিন্দুত্ববাদীরা নিরূপণ করে ধর্মীয় পরিচিতির মাপকাঠিতে। তাই অহিন্দুরা বি জে পি-র মতো হিন্দুত্ববাদীদের চোখে মানবিক সহায়তা পাবার যোগ্য নয়। রোহিঙ্গারা যেহেতু মুসলিম তাই ভারতে তাদের প্রবেশাধিকার দিতে পারে না মোদী সরকার। তাছাড়া যে মুসলিমরা ভারতে যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় বসবাস করছে যারা ভারতের নাগরিক তাদেরকেই যে সরকার বিতাড়ন করে হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে চায় তাদের কাছে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দান প্রত্যাশা করা যায় না।

মোদীদের হিন্দুত্ববাদ মুসলিমদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করতে প্রথমেই তাদের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদকে যুক্ত করে দেয়। এটাই তারা বোঝাতে চায় মুসলিম মানেই হিন্দুদের শত্রু এবং সন্ত্রাসবাদী। এই মানসিকতা থেকেই হিন্দুত্ববাদীরা ধর্মনিরপেক্ষতা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি-সংহতির বিরোধী। এই মানসিকতা থেকেই তারা শরণার্থী রোহিঙ্গাদের ওপর সন্ত্রাসবাদী তকমা দেগে দিচ্ছে। ভারতে ইতিমধ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদেরও তারা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রচার চালাচ্ছে এবং সেই প্রচারের ওপর ভিত্তি করেই তাদের বিতাড়নের ‍‌জিগির তুলছে। সর্বস্ব খুইয়ে, ভিটেমাটি ছেড়ে নিঃস্ব অসহায় মানুষ যখন মৃত্যু উপত্যকা ছেড়ে বাঁচার আশ্রয় খোঁজে তখন তাদের সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যানের নজির বি জে পি-র মতো উগ্র ও কট্টর দক্ষিণপন্থীদের পক্ষেই সম্ভব।

চীনের সঙ্গে পাল্লা দেবার অবান্তর জেদের কারণে মোদী সরকার চাইছে বার্মার ঘনিষ্ঠ হতে এবং প্রয়োজনে চীনের বিরুদ্ধে বার্মাকে ব্যবহার করতে। তাই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মোদীরা বার্মার বিরাগভাজন হতে চায় না। তাই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় না দেবার যুক্তি খাড়া করতে তাদের সন্ত্রাসবাদী বলতেও দ্বিধা করছে না। আবার বার্মাকে কাছে পেতে বাংলাদেশ থেকে যে দূরে সরে যাচ্ছে ভারত সেদিকে খেয়াল নেই। ভারত শরণার্থীদের জায়গা না দেওয়ায় পুরো চাপটাই পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। ইতিমধ্যে যে দেশে ৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে সেখানে নতুন করে আরও প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ শরণার্থী ঢুকেছে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে ভারত বার্মার ওপর চাপ বাড়াক যাতে শরণার্থীরা দেশে ফিরতে পারে। কিন্তু ভারত তা না করায় ভারতের প্রতি তাদের ক্ষোভ বাড়া অস্বাভাবিক নয়। সেই সুযোগে চীন আরও বেশি করে বাংলাদেশের কাছে পৌঁছে গেলে ভারতের লাভ কিছু হবে না। মাঝখান থেকে আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের বদনাম বাড়বে এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হবে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement