শ্যামল সেন কমিশনের কী হলো?
এবারে প্রশ্ন তুললো হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১৩ই সেপ্টেম্বর- সাড়া জাগিয়ে চালু করা হয়েছিল শ্যামল সেন কমিশন। সারদা কেলেঙ্কারি পরে খাস খোদ মহাকরণে দাঁড়িয়ে কমিশনের ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। ৫০০ কোটি টাকার তহবিলের ঘোষণা হয়েছিল। যদিও আমানতকারী অর্থ ফেরতের প্রতিশ্রুতি যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতেই এবার শ্যামল সেন কমিশন নিয়ে আদালতের রীতিমত প্রশ্নের মুখে পড়তে হলো রাজ্য সরকারকে। মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিলো কলকাতা হাইকোর্টে। সারদাকাণ্ডের একটি মামলায় এদিন জয়মাল্য বাগচী ও অনিরুদ্ধ বসুকে নিয়ে গঠিত ডিভিসন বেঞ্চ মন্তব্য করেন নোটিফিকেশন করে শ্যামল সেন কমিশন যে গঠিত হয়েছিল তা কেন গুটিয়ে ফেলা হয়েছিল? ৫০০ কোটি টাকার যে তহবিল গড়ার কথা হয়েছিল ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য তাই বা কেন বন্ধ হয়ে যায়? কার্যত শ্যামল সেন কমিশন নিয়েই এবার আদালতের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে রাজ্য সরকারকে।

শুধু পর্যবেক্ষণই নয়, ডিভিসন বেঞ্চ এদিন নির্দিষ্টভাবে রাজ্য সরকারের কাছে প্রশ্ন করেন, যে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল তৈরির ঘোষণা হয়েছিল তার থেকে কত টাকা ক্ষতিপূরণের জন্য খরচ হয়েছে, কত টাকাই বা রয়েছে এবং সেই টাকা কোথায় রাখা আছে? এই বিষয়েই এবার রাজ্য সরকারকে ২৫শে অক্টোবরের মধ্যে হলফনামা জমা দিয়ে জানানো জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট’কেও হলফনামা দিয়ে এবার জানাতে হবে সারদার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কাছে কত টাকা ছিল, বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তির পরিমাণ কত? ইডি’র কাছে কত টাকা রয়েছে? মামলার আবেদনকারীর তরফে আইনজীবী শুভাশিস চ্যাটার্জিকেও আগামী ২৫শে অক্টোবরের মধ্যে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।

অর্থাৎ এবার রাজ্য সরকারকেই ব্যাখ্যা দিতে হবে কেন শ্যামল কমিশন গঠন, কেনই বা কমিশন গুটিয়ে নেওয়া হলো এবং কমিশনের ৫০০ কোটি টাকার তহবিলে কত টাকা ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীরা পেয়েছেন আর কত টাকা তহবিলে রয়েছে এবং সেই টাকা কোথায় রাখা আছে?

২০১৩ সালের ২৩শে এপ্রিল সারদাকাণ্ডে গোটা রাজ্যজুড়ে প্রবল বিক্ষোভের মাঝে মুখ্যমন্ত্রী মহাকরণে দাঁড়িয়ে শ্যামল সেন কমিশন গঠনের কথা ঘোষণা করেন। ২৪শে এপ্রিল গেজেট নোটিফিকেশন জারি হয়।একবছর পরে ২০১৪ সালের এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্ট সারদা কেলেঙ্কারির তদন্তভার সি বি আই’র হাতে তুলে দেওয়ার দিন-ই ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রীর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল,‘আমি বাঁচলাম।এখন ক্ষতিগ্রস্থদের টাকা দেবে তুমি (পড়ুন সি বি আই)’। সুপ্রিম কোর্ট সারদা কেলেঙ্কারিতে সি বি আই তদন্তের রায় দিয়েছিল ২০১৪ সালের ৯ই মে। রাজ্য সরকারের শ্যামল সেন কমিশনের ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ লিখে দেয় ২০১৪ সালের ২২শে অক্টোবর।গুটিয়ে যাওয়ার আগে কমিশন সূত্রে জানা যায়, মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির ৫০০ কোটির মধ্যে মাত্র ২৮৭ কোটি টাকা মিলেছে। তাও আবার তিন দফায়। সারদাকাণ্ডেই প্রায় ১৭লক্ষ বেশি আবেদনপত্র জমা পড়েছিল কমিশনে। টাকা পেয়েছিলেন মাত্র ৪ লক্ষ ৯৮হাজার জন। কিন্তু দেখা গেছে যে, ২৮৭ কোটি টাকার কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে কমিশনের তরফে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে টাকা ফেরতের জন্য খরচ হয় ২৫২ কোটি টাকা। এই ২৫২কোটি টাকার মধ্যে ১০২ কোটি টাকার চেক হয় বাউন্স করেছে নতুবা আমানতকারীরা হাতে পেলেও তা ভাঙাতে পারেননি। অন্যদিকে, ২৮৭ কোটি টাকার মধ্যে ২৫১কোটি টাকার হিসাব দেখালেও ৩৬ কোটি টাকা হাতে রয়ে যায়। ফলে বাউন্স হয়ে আসা ১০২ কোটি টাকা এবং ৩৬কোটি টাকা পড়ে থাকার কথা রাজ্য সরকারের ঘরে।সারদা সম্পত্তি বেচে দুকোটি টাকাও মিলেছিল বলে জানা যায়। বাকি টাকা কোথায় উত্তর মিলতে পারতো কমিশনের রিপোর্টে যা নবান্নে চোদ্দতলায় মুখ্যমন্ত্রীর বিলাসবহুল অফিসঘরের টেবিলে চাপা পড়ে আছে। এবার সেই জবাবদিহি চেয়েছে হাইকোর্ট।

এদিকে এদিন নারদ ঘুষকাণ্ডে এদিন প্রায় ছয় ঘণ্টার জেরার মুখে পড়লেন তৃণমূলী নেতা মদন মিত্র। সারদাকাণ্ডে সি বি আই’র হাতেই গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় ২১মাস জেল খেটেছেন এই তৃণমূল নেতা। এখন জামিনে আছেন। দলে নতুন করে জায়গা পেয়েছেন ফের। এর মধ্যেই এবার নারদ ঘুষকাণ্ডে এদিন সকাল প্রায় পৌনে বারোটা নাগাদ নিজাম প্যালেসে সি বি আই দপ্তরে হাজিরা দেন তিনি। সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত চলে জেরা।সি বি আই-সূত্রে জানা গেছে, জেরায় একাধিক প্রশ্নে কার্যত কোন জবাব দিতে পারেননি তিনি। নারদের ঘুষের টাকা কোথায় কীভাবে কোথায় ব্যবহার হয়েছে সেই প্রশ্নে কার্যত কোন জবাব দিতে পারেননি তিনি। নারদের ভিডিও ফুটেজ দেখিয়েই চলে এই দীর্ঘ জেরা।