সুরক্ষার বালাই নেই, ঝুঁকি নিয়েও উপার্জনের
তাগিদে বাজি কারখানায় বাড়ছে শ্রমিকের ভিড়

নিজস্ব প্রতিনিধি

Image

+

কলকাতা, ১১ই অক্টোবর— এক উৎসব শেষ হতে না হতেই চলে এলো আর এক উৎসব। আলো আর শব্দের যৌথ উৎসব। তাই এই উৎসব ম্লান হয়ে যায় বাজি ছাড়া। রাতের আকাশ ভরে ওঠে আলোর রোশনাইয়ে। আলোয় ভরা বলেই এই উৎসবের নাম দীপাবলি। ওই কয়েকটা দিন আলোকিত করতে সারাবছরই চলে বাজি তৈরির কাজ। পেশার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সারা দেশেই শ্রমিকরা বাজি তৈরিতে যুক্ত থাকেন। এরাজ্যের বিভিন্ন জেলাতে ছড়িয়ে আছে কয়েক হাজার বাজি কারখানা। রাজ্যে এই মরসুমেই প্রায় কয়েক লক্ষ শ্রমিক বাজি তৈরির কাজ থাকেন। বছরের অন্যান্য সময় সংখ্যা আরও কমে যায়। প্রশ্ন ওঠে, কতটা নিরাপদে কাজ করছেন শ্রমিকরা?

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান কিন্তু বেশ ভয়ংকর। বস্তুত, এরাজ্যে আইনসম্মত বাজি কারখানা রয়েছে গোটা দশেক। এছাড়া প্রায় তিরিশ হাজার বাজি কারখানা আছে, যেগুলির সরকারি অনুমোদন নেই। গত কয়েক বছরে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে এমন অবৈধ কারখানার সংখ্যা। এই কারখানাগুলিতে কাজ করেন এরকম শ্রমিকের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। রাজ্য পুলিশ সূত্রে বুধবার জানা গিয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত বাজি তৈরি করতে গিয়ে বিস্ফোরণে মারা গিয়েছেন ৫৩ জন শ্রমিক। আহত হয়েছেন প্রায় ৭৩ জন। এর মধ্যে সিংহভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে গত ছ’বছরে। দুই ২৪ পরগনাসহ হুগলি, বর্ধমান, বীরভূমের পাশাপাশি মেদিনীপুর অঞ্চলেও বাজি কারখানায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কোলাঘাট, কালনা, পাঁশকুড়া, পিংলা, খয়রাশোল, ভদ্রেশ্বরে প্রতিবছরই কাজ করতে গিয়ে বিস্ফোরণের কবলে পড়ছেন শ্রমিকরা। এর মধ্যে কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন। কেউ আবার গুরুতরভাবে জখম হয়ে কোনক্রমে বেঁচে রয়েছেন, অনেকেরই অঙ্গহানি হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ এবং প্রশাসনের নজর নেই সেদিকে। আবার এই বাজি কারখানাগুলিতে যাঁরা উপার্জনের তাগিদে কাজ করতে বাধ্য হন, তাঁদের সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকারের কোনও উদ্যোগ নেই বলেই অভিযোগ। সাম্প্রতিক সময়ে আমডাঙার বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছে ৫জনের, আহত হয়েছেন প্রায় ৫০জন। আমডাঙার এই ঘটনাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে রাজ্যের কোনও অঞ্চলেই সুরক্ষিত নন শ্রমিকরা। একদিকে রোজগারের চিন্তা অন্যদিকে প্রাণহানির আশঙ্কা। রীতিমতো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে চলেছেন তাঁরা।

পেশার পাশাপাশি উৎসবে আনন্দ দেওয়ার কাজে প্রত্যক্ষভাবে নিযুক্ত এই শ্রমিকরা। কিন্তু তাঁদের সুরক্ষার বিষয়ে ঠিক কী ভাবছে রাজ্য সরকার? নিরাপত্তা সংক্রান্ত কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত এই মুহূর্তে? সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিভিন্ন মহলে। ২০০৮-২০০৯ সাল নাগাদ শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য কর্মশালার আয়োজন করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। বর্তমানে বামফ্রন্টের পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তীর উদ্যোগে সেই সময় চম্পাহাটিতে ১৫দিন ধরে কর্মশালা চলে। মূলত দূষণরোধে শব্দবাজির বদলে ‌আলোর বাজিকে উৎসাহ জোগানোসহ উন্নতমানের কারখানা, পরিকাঠামো তৈরি নিয়ে কর্মশালাটি হয়। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী লাইসেন্স প্রদান এবং কীভাবে বাজির ব্যবসা বাড়তে পারে, সে বিষয় জোর দেওয়া হয়েছিল ওই কর্মশালায়। সুজন চক্রবর্তী জানান, ‘‘সারা রাজ্যে বাজি তৈরিতে নিযুক্ত প্রায় সব শ্রমিকই যোগ দিয়েছিলেন ওই কর্মশালায়।’’ তিনি আরও বলেন ‘‘বাজি কারখানার শ্রমিকদের জন্য এখন রাজ্য সরকার কিছুই করছে না।’’ পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী বিশ্বজিৎ মুখার্জি জানান, ‘‘রাজ্যে বেআইনি বাজি কারখানা বন্ধ হলেই শ্রমিকের মৃত্যু হ্রাস পাবে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘২০১৫ সালে অক্টোবর মাসে পরিবেশ আকাদেমির পক্ষ থেকে গ্রিন ট্রাইব্যুনালে এবিষয় একটি মামলাও করা হয়। তাতে গ্রিন ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে রাজ্য সরকারকে বেআইনি কারখানা বন্ধ করতে বলা হলেও মমতা ব্যানার্জির সরকার এব্যাপারে কোনও পদক্ষেপই গ্রহণ করেননি বলেও জানান তিনি।

Featured Posts

Advertisement