দিদিভাই মোদীভাই

দিদি-মোদী বা দাদা-বোনের সেটিং জবরদস্ত সেটা বরাবর বলে এসেছে বামপন্থীরা। আপাতদৃষ্টিতে দুপক্ষের মধ্যে কুস্তি হলেও আসলে যে অনেক পুরনো দোস্তি তা নজর না দিলে টের পাওয়া যাবে না। বামপন্থীদের এই কথাই এখন উচ্চারিত হচ্ছে তৃণমূল থেকে সাসপেন্ড হওয়া বা স্বেচ্ছায় তৃণমূল ত্যাগ করা মুকুল রায়ের কণ্ঠে। একদা দিদির ডান হাত এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত সঙ্গী এবং তৃণমূলের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা আজ পাকেচক্রে যা বলতে বাধ্য হচ্ছেন তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বি জে পি-র সঙ্গে নকল যুদ্ধের বার্তা দিয়ে যতই সত্য আড়ালের চেষ্টা হোক না কেন জন্ম থেকেই তৃণমূল বি জে পি-র ঘনিষ্ঠ। বাজপেয়ী সরকারের শরিক এবং মন্ত্রীও ছিলেন। মমতা ব্যানার্জির মুখেই শোনা গিয়েছিল সেই বিখ্যাত ভাষ্য, ‘বি জে পি অছ্যুৎ নয়’। অর্থাৎ বি জে পি-র সঙ্গে জোট করা যায় এবং ঘর করা যায়। দুটি রাজনৈতিক দল জোট করে ভোটে লড়তে পারে, সরকার গড়তে পারে তখনই যখন তাদের মধ্যে আদর্শগত ও নীতিগত প্রশ্নে সহমতের জায়গা থাকে। বি জে পি এবং তৃণমূলের মধ্যে তেমন একটা সম্পর্ক আছে। একে অন্যের পরিপূরক হিসাবে অন্যকে সাহায্য করছে। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে নতুন দল করার পর দল হিসাবে একটা জায়গা করে নিতে একটা আশ্রয়ের প্রয়োজন ছিল। বি জে পি তাদের সেই আশ্রয় দেয়। একটা সাম্প্রদায়িক দলকে আশ্রয় করে দিল্লিতে ক্ষমতার শরিক হয়েছে তৃণমূল। বি জে পি-র আহ্বানেই তৃণমূল এন ডি এ জোটে সানন্দে যোগ দেন। তখন বি জে পি নেতাদের সঙ্গে নিত্য গলাগলি, কোলাকুলি। বাজপেয়ী মন্ত্রীসভায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকও পায় তৃণমূল।

শুধু বি জে পি-তেই তৃণমূল নেত্রী দৌড় শেষ করেননি একেবারে ঢুকে পড়েছেন হিন্দু রাষ্ট্রের দাবিদার আর এস এস-র অন্দরমহলে। আর এস এস আদর্শগতভাবে কমিউনিস্ট-বিরোধী। ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা বা হিন্দু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আর এস এস সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে করে কমিউনিস্টদের। আসলে আর এস এস পরিচালিত বি জে পি-র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, ধর্মীয় মেরুকরণ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ী চেতনা, উগ্র মুসলিম বিদ্বেষ, জাতপাতের বিভাজন ইত্যাদির বিরুদ্ধে সবার আগে বুক চিতিয়ে লড়াই করে কমিউনিস্টরা। এই আর এস এস-র মুখপত্র ‘পাঞ্চজন্য’ পত্রিকা যখন কমিউনিস্ট বিরোধী বই প্রকাশ করে তখন সেখানে সাগ্রহে হাজির হয়ে যান তৃণমূল নেত্রী। সেখানে তিনি অকপটে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রশংসায় ভরিয়ে দেন আর এস এস-কে। বলেছিলেন আর এস এস-র নেতারাই নাকি প্রকৃত দেশপ্রেমিক। অথচ ইতিহাস বলে ভারতের ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে আর এস এস-র কাঠবিড়ালীর ভূমিকাও ছিল না। উলটে তারা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের চর হিসেবে কাজ করেছে। নানাভাবে ব্রিটিশদের সাহায্য করেছে। প্রতিদানে আর এস এস তাকে ‘সাক্ষাৎ দুর্গা’ বলে অভিহিত করেছে। নেত্রী তাঁর আন্দোলনে আর এস এস-র সাহায্য চেয়েছিলেন প্রকাশ্যে। তাঁর নির্দেশেই মুকুল রায় নাকি আর এস এস কর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মুকুলকে নিয়ে তিনি নিজেই নাকি বৈঠক করেছেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা অশোক সিংঘালের সাথে। অর্থাৎ আর এস এস, ভি এইচ পি, বি জে পি-কে সঙ্গে নিয়েই পথ চলেছেন তৃণমূল নেত্রী। আসলে আদর্শহীন, দিশাহীন কোনও কোনও দল যদি চরম ক্ষমতালোভী হয় তাহলে তাদের এমনই চরিত্রহীন হতে হয়। ক্ষমতার জন্য দেশ, রাজ্য, সমাজকে অধঃপতনের দিকে ঠেলে দিতেও এরা দ্বিধা করে না। আজ বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য ম্লান হতে বসেছে এদেরই জন্য। এরা সাপের মুখে যেমন চুমু খায়‌ তেমনি ব্যাঙের মুখেও খায়। নরম সাম্প্রদায়িকতার চাতুরির আড়ালে এরা আসলে বঙ্গসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে পশ্চাৎপদতার অন্ধকারে।

Featured Posts

Advertisement