নৈরাজ্যের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ

ঈশিতা মুখার্জি

রাজ্যজুড়ে হোর্ডিং সংবাদপত্র-টেলিভিশনে বিজ্ঞাপনে রাজ্য সরকারের ঢালাও প্রচার চলছে। সর্বত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখের ছবি। বিজ্ঞাপনে একটাই কথা পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়নের জোয়ার এসেছে। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা কি? উন্নয়নে এগিয়ে যাওয়া না পিছিয়ে যাওয়া? রাজ্যের আসল ছবিটাই তুলে ধরা হয়েছে এই লেখায়।

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর স্লোগান হলো ‘এগিয়ে বাংলা’। মুখ্যমন্ত্রীর স্লোগান একদিকে আর অন্যদিকে রাজ্যের মানুষের জীবনযাত্রা। রাজ্যে বেকারি বাড়ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য বাড়ছে। এ কবছরে রাজ্যের মানুষ জানে যে উন্নয়ন এবং আর্থিক বৃদ্ধির অর্থ কী এ রাজ্যে। এ ক’বছরে রাজ্যের মানুষ চোখে দেখেছেন এবং অভিজ্ঞতায় জেনেছেন আর্থিক কেলেঙ্কারির কথা—সারদা, চিট ফান্ড, রোজভ্যালি, নারদ ইত্যাদি। অর্থাৎ রাজ্যে অর্থ আছে, কিন্তু যে অর্থ অর্থনৈতিক উন্নয়নের কোনও কাজে আসছে না। কৃষি না শিল্প—এই বিতর্কের মধ্যে যে সরকার ক্ষমতাসীন হলো, আজ ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে কৃষি এবং শিল্প দুটিই সর্বনাশের পথে এ রাজ্যে। কৃষি উৎপাদন পড়তির দিকে। কারখানাগুলি একে একে বন্ধ হচ্ছে। কিন্তু কলকাতায় বসে গেছে লন্ডনের ৯৬ মিটার বিগ বেনের নকল ৩০ মিটারের বিগ বেন। দুবাই, প্যারিসের নানা নকল টাওয়ার ছোট আকারে বসানো হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর চিন্তাভাবনায় এসব হচ্ছে বলে জানা যায়। অর্থাৎ পৃথিবীর যা কিছু দর্শনীয় তার ক্ষুদ্র সংস্করণে উনি রাজ্য ভরাচ্ছেন। উদ্দেশ্যটি একেবারে নিরামিষ নয়। এক, ক্ষুদ্র এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের হলেই আমাদের রাজ্যের চলে যাবে। সিঙ্গুরের বড় কারখানা দরকার কী? ক্ষুদ্র—তিনি বলেও ফেলেন চালভাজা, মুড়িভাজা, তেলেভাজা—এই শিল্পের দিকে মনোনিবেশ করুন। ক্ষুদ্রই পথ। ছোট থেকেই নাকি বাঁচার রসদ পাবেন বাংলার মানুষ। পেয়েছেন কী? যেখানে গুজরাটে ইনফোসিস পেয়েছে ৮৮৬ একর জমি এবং কর্ণাটকে পেয়েছে ৩৩৭ একর জমি, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের চিন্তাভাবনায় ৫০ একর। ক্ষুদ্রতে মন দিলে রাজ্যের মানুষ কোথায় কাজ পাবেন? রাজ্যের শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম, শিক্ষানবীশ নতুন প্রজন্মকে ছুটে চলে যেতে হবে রাজ্যের বাইরে। তেমনই ঘটছে ২০১১ সালের পর থেকে। বিগ বেন জাতীয় ক্ষুদ্র সংস্করণের সঙ্গে শহর-গ্রাম জুড়ে নীল-সাদা মোড়ক—কারণ দৃশ্য। মুখ্যমন্ত্রী চান শহরের মানুষ দেখুক, চোখ ভরে দেখুক। দৃশ্যের একটা বড় গুণ হলো তা মানুষের মনের মধ্যে বোধের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। কোনও কথা শুনলে মানুষের স্মৃতিতে যত থাকে, চোখে দেখলে তা মনের মধ্যে গেঁথে যায়। তাই দৃশ্য দিয়ে মানসিক প্রলেপ। মনে প্রশ্ন উঠলেই—দৃশ্য এসে চোখ ঢাকবে—এমনই আশা মুখ্যমন্ত্রীর। কিন্তু কতদিন এই চোখ ঢাকবে দৃশ্য?

এতেই যদি কাজ হতো, যদি অর্থনীতি সত্যিই বলতো ‘এগিয়ে বাংলা’ তাহলে প্রতিটি নির্বাচনে সন্ত্রাস প্রয়োজন হয় কেন তৃণমূলনেত্রীর?

কয়েকটি মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত স্বপ্নের প্রকল্পের কথা বলা যাক। দেশজুড়ে অমৃতসর, দিল্লি, কলকাতা শিল্প করিডর তৈরির কথা হয়েছে যেখানে পূর্ব ভারতের ১৫০—২০০ কিমি মাশুল করিডর সৃষ্টি হবে। বিভিন্ন ধাপে এই শিল্প করিডর হবে। করিডর জুড়ে প্রতিটি রাজ্যে ২৪৭০ একর জুড়ে শিল্প ক্লাস্টার তৈরি করতে হবে যেখানে ৪০ শতাংশ জমিই নির্ধারিত থাকবে কারখানাজাত উৎপাদন এবং পরিশোধনের কাজের জন্য। প‍‌শ্চিমবঙ্গে এই করিডর যাবে আসানসোল, দুর্গাপুর এবং কলকাতার মধ্যদিয়ে। ২৪৭০ একর জ‍‌মির খোঁজ এখনও দিতে পারেনি রাজ্য সরকার। জমির সমস্যায় এখনও সরকারি খাস জমিতেই শিল্প হবে, এই অনড় মনোভাব নিয়েই চলছেন মুখ্যমন্ত্রী। সরকারের হাতে ‘জমি ব্যাঙ্কের’ আস্ফালন থাকলেও ২৪৭০ একর জমির এখনও পর্যন্ত খোঁজ নেই। ২০১১ আদমশুমারি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বাস করেন ১,০২৯ জন মানুষ। দেশের সব রাজ্যের মধ্যে জনঘনত্বের তুলনায় এটি দ্বিতীয়। তাই এই বিপুল সংখ্যায় মানুষের জীবনযাপনের পরিকল্পনা করতে হলেই জমির সদ্ব্যবহার কথাটি চলে আসছে। শিল্প করিডর অন্যান্য রাজ্য পেলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার এ নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করছে না। বঞ্চিত হচ্ছে রাজ্যের মানুষ। আরও বেকারি, আরও মানুষের কাজের খোঁজে অন্য রাজ্যে চলে যাওয়া।

২০১১ সালের আদমশুমারি এটিও জানিয়েছিল যে কলকাতার জনসংখ্যা ১.৯ শতাংশ হারে কমছে। নগরের বিস্তৃতি ঘটছে চারপাশে। সমস্ত কর্মক্ষম মানুষকে কৃষি আজ জীবনযাপনের ভিত্তি জোগাতে অক্ষম। কৃষি থেকে রাজ্যের ৮ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হয়। ৯২ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থানের কী উপায় হবে? ধান, চা—এই উৎপাদনেই এগিয়ে ছিল রাজ্য। ধান উৎপাদন বৃদ্ধির হার কমছে। চা বাগান একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চা শ্রমিকের অনাহার এবং আত্মহত্যার খবরে পাতা ভরছে দৈনিক সংবাদপত্র। কৃষি উৎপাদন রাজ্যের মোট উৎপাদনের ১৮.৮ শতাংশ মাত্র। জমির উপর কর্মক্ষম মানুষের বোঝা কীভাবে সমাধান করা যাবে শিল্প-কারখানা ছাড়া? জমির সমস্যা না মিটিয়ে এই সমস্যা মেটানো সম্ভব নয়। বর্তমানে গ্রামের ৬৫ শতাংশের বেশি মানুষের রোজগার কৃষি থেকে হয় না, আসে অকৃষিজনিত ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উৎপাদন থেকে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প একটি বড় অংশ। ২০১১ সালের আগেই পশ্চিমবঙ্গ ছিল ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্পের সেনসাস অনুযায়ী পরিসংখ্যানে দেশের মধ্যে এগিয়ে। কিন্তু ২০১১ সালের পরে তাও থমকে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ‘ক্ষুদ্র’ প্রচার করলেও থামিয়ে দিয়েছে ক্ষুদ্র, মাঝারি, কুটির শিল্পের সম্ভাবনার দিকগুলি। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুতহারে কমিয়ে দিয়ে সুযোগ করে দিয়েছে ক্ষুদ্র ফিনান্স বেসরকারি ঋণদান সংস্থাগুলিকে। গোষ্ঠী নয়, ব্যক্তিকে ঋণ দিচ্ছে তারা। এর ফলে ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগী এবং ব্যক্তিভিত্তিক উৎপাদক ক্রমশ ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে।

তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অর্থনৈতিক ভিত্তি আজ সাধারণ মানুষের কাছে লুকোছাপা নেই। ‘সিন্ডিকেট’ বা ‘কাটমানি’ বা ‘কমিশন’ দিয়ে কাজ পেতে হয়। ঋণ পেতে হয় এ রাজ্যে। তাই যে কোনও কাজ ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উদ্যোগে হলেও লাভের মুখ দেখা কঠিন। তাই উদ্যোগও একের পর এক পিছিয়ে পড়ছে, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এরফলে ‘এগিয়ে বাংলা’য় যে তথ্যই থাকুক না কেন, রাজ্যে মাথাপিছু আয়, শিল্পোন্নয়ন বৃদ্ধির হার, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির হার কমছে প্রতি বছরই। ঋণের বোঝা বিপুল হলেও রাজ্যের মানুষের কোনও উপকারে লাগছে না এই ঋণ।

রাজ্যের এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঢাকতে তাই মুখ্যমন্ত্রী আশ্রয় নিয়েছে পরিসংখ্যানের কারচুপির। একটি রাজ্য হলো পশ্চিমবঙ্গ, যেখানে দেশের পরিসংখ্যান দপ্তর, জাতীয় নমুনা সমীক্ষা, নীতি আয়োগ, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক—কারুর কোনও পরিসংখ্যানের সঙ্গে মেলে না মুখ্যমন্ত্রীর ‘এগিয়ে বাংলা’র পরিসংখ্যান।

২০১৪ সালে পরিসংখ্যান দপ্তর জানিয়েছিল যে, রাজ্যে রয়েছে ৮,৮৫৭টি কারখানা যার মূলধন ৮০,৯৫,৫৯৪ লক্ষ টাকা। এখানে ৫,২২,২২৪ জন শ্রমিক কাজ করেন। মহারাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কারখানা ছিল—সংখ্যা ২৯,১২৯। শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১৩,১১,৫৫২। ২০১৪-র পর কি এমন ঘটলো যে ১১টি রাজ্যকে টপকে পশ্চিমবঙ্গ এক নম্বরে পৌঁছালো? ২০১১ সালের আগেও পশ্চিমবঙ্গের যা অবস্থান ছিল ২০১৪ সালেও তাই ছিল। সুতরাং মিথ্যাভাষণ স্পষ্ট। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে ভিখারির সংখ্যা সর্বোচ্চ! গোটা দেশে ভিখারির সংখ্যার মধ্যে ২০ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গে। কেন এমন হলো? জবাব আছে ‘এগিয়ে বাংলা’র পরিসংখ্যানে? নীতি আয়োগের রিপোর্ট অনুযায়ী রেশন ব্যবস্থা, রান্নার গ্যাস সরবরাহ, ১০০ দিনের কাজে পশ্চিমবঙ্গের সাফল্য মাত্র ১০ শতাংশ। গোটা দেশে ৪৪.৫৯ শতাংশ মানুষের পাকা বাসস্থান নেই, পশ্চিমবঙ্গে ৫৯.২৭ শতাংশ মানুষের পাকা বাসস্থান নেই। কেমন আছে বাংলার মানুষ? ২০১০-১১ সালের পর থেকে রাজ্যের শিল্প বিনিয়োগ ৯৭ শতাংশ কমেছে—পরিসংখ্যান অতীতের যোজনা কমিশনের দেওয়া। মিথ্যাভাষণ এখানেও প্রকট। রাজ্যের রাজস্ব আয়েও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্যে কম বলেই প্রমাণিত। বেনিয়মের টাকা, ক্লাবে অনুদান, সিন্ডিকেটরাজ—এগুলি বজায় রেখে স্বচ্ছ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দেওয়া অসম্ভব এই রাজ্য সরকারের পক্ষে।

দেশের মানুষ ধুঁকছে, মিথ্যাভাষণ চলছে, তথ্যের রচনা বাড়ছে। সব জেনেও কেন্দ্রীয় সরকার চুপ থাকবেন কারণ জনমুখী উন্নয়নমুখী অর্থনীতির পরিপন্থী এই দুটি সরকারই। বেকারি বাড়ুক, কর্মক্ষম মানুষের অন্য রাজ্যে চলে যাওয়া বাড়ুক, বাড়ুক নৈরাজ্য, বাড়ুক দৃশ্যশ্রাব্য হট্টগোল, বাড়ুক ছুটি, বাড়ুক অনাচার। কমুক কৃষি উৎপাদন, বন্ধ হোক কলকারখানা, বন্ধ হোক চা বাগান, হোক শিশুমৃত্যু, বাড়ুক কৃষক আত্মহত্যা, ছারখার হয়ে যাক রাজ্য। মুখ্যমন্ত্রী এমনটা চাইতে পারেন, কিন্তু আপনি, আমি? রাজ্যবাসীর সুখ-শান্তির কথা ভাবলে তাই রাজ্যের অর্থনীতির মৌলিক প্রশ্নগুলির মুখোমুখি দাঁড়াতে রাজ্য সরকারকে বাধ্য করা ছাড়া আর কোনও পথ নেই।

Featured Posts

Advertisement