ব্রাত্য-ঘনিষ্ঠ নাট্যকারের
অশালীন আচরণ, প্রতিবাদে
সাংস্কৃতিক কর্মীরা

নিজস্ব সংবাদদাতা

সিউড়ি, ১২ই অক্টোবর—রাজ্য সরকার আয়োজিত নাট্য কর্মশালায় মহিলা শিক্ষার্থীদের প্রতি অভব্য আচরণ, তাঁদের প্রতি কুপ্রস্তাবের অভিযোগ খোদ প্রশিক্ষকের বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থীরা এমন অবাঞ্চিত ঘটনার প্রতিবাদ ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলেন সোশ‌্যাল মিডিয়ায়। যা দেখে প্রতিবাদ বিক্ষোভে শামিল হলেন নাট্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা। বীরভূমের সিউড়ি ও বোলপুরে ঘটনার তীব্র নিন্দা করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরে বিক্ষোভ স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয় বৃহস্পতিবার।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মিনার্ভা নাট্যসংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের উদ্যোগে মিনার্ভা রেপার্টরি থিয়েটারের আয়োজনে গত ৮ই অক্টোবর থেকে ১৩ই অক্টোবর পর্যন্ত পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান এবং বীরভূমের নির্বাচিত নাট্যশিল্পীদের নিয়ে আবাসিক কর্মশালার আসর বসেছে বর্ধমানের রবীন্দ্র ভবনে। গত মঙ্গলবার রাতে সেই কর্মশালায় শামিল শিক্ষার্থীরা ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে এক ভিডিও পোস্ট করে সোশ‌্যাল মিডিয়ায়। যা প্রচার হতেই তোলপাড় পড়ে যায় সাংস্কৃতিক মহলে। সেই পোস্টে দেখা যায় বিশ্বভারতীর নাটক বিভাগের ছাত্র সার্থক রায় কর্মশালার অন্যতম কো-অর্ডিনেটর চিত্র পরিচালক প্রেমাংশু রায়ের প্রতি মারাত্মক অভিযোগ এনে সরব হয়েছেন। সার্থক রায় বলেন, বিভিন্ন জেলার বাছাই করা নাট্য শিল্পীরা নাটক শিখতে কর্মশালায় শামিল হলেও সেখানে এক অনভিপ্রেত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন শিক্ষার্থীরা। তাঁর অভিযোগ, ‘‘প্রশিক্ষক প্রেমাংশু রায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশেষ করে মহিলাদের প্রতি নানা কুরুচিকর ইঙ্গিত করেছেন, অশালীন প্রস্তাব দিয়েছেন। এমনকি তিনি মদ্যপ অবস্থাতেই প্রশিক্ষণ দেন। প্রতিবাদ করায় আমাকে খুনের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন। নাটক শিখতে এসে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে ভাবিনি।’’ সাঁইথিয়া থেকে যাওয়া এক মহিলা প্রতিনিধির আরও মারাত্মক অভিযোগ, ‘‘মদ্যপ অবস্থায় প্রশিক্ষক প্রেমাংশু রায় রাতের বেলায় সমস্ত মেয়েকে একা তাঁর নিজের ঘরে ডাকেন। আমার সঙ্গেও চরম খারাপ ব্যবহার করেছেন। তাঁকে এক ঘণ্টা সময় দিলে তিনি এক বছরের জন্য আমাকে দেখবেন বলে কুপ্রস্তাব দেন।’’ বোলপুরের অপর এক মহিলা শিক্ষার্থী বলেছেন, ‘‘প্রেমাংশু রায় হোয়াটস অ্যাপে নানা কুপ্রস্তাব পাঠাচ্ছেন। রাতে ফোন করে তাঁর ঘরে যেতে চাপ দিচ্ছেন। আমরা সকলেই খুব অপমানিত বোধ করছি। নিরাপত্তাহীনতাতেও ভুগছি।’’ সোশ‌্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত হওয়া ভিডিওটিতে এমন অস্বস্তিকর পরিবেশের মুখোমুখি প্রত্যেক শিক্ষার্থী তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। সকলেরই অভিযোগ একজনেরই বিরুদ্ধে। তিনি মন্ত্রী ব্রাত্য বসুর ঘনিষ্ঠ চিত্র পরিচালক প্রেমাংশু রায়। কর্মশালায় আরও দুজন সহকারী প্রশিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের প্রতি অবশ্য কোনও অভিযোগ শিক্ষার্থীরা তোলেননি। ঘটনার পর থেকেই অবশ্য কোনও শিক্ষার্থীর সঙ্গেই আর ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। এব্যাপারে বাইরের কারও কাছে আর কোন মন্তব্য করার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উপর ফতোয়া জারি করা হয়েছে বলে অনুমান করছেন সকলে।

প্রতিবাদে সিউড়ি ও বোলপুরের নাট্যকর্মীরা একজোট এদিন বিক্ষোভে শামিল হয়েছেন দুই তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরেই। স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। সিউড়ির রবীন্দ্রসদন অনুরাগী মঞ্চের আহ্বায়ক দেবাশিস দত্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন, ‘‘চূড়ান্ত আপত্তিজনক, অবমানকার কাজ করেছেন ওই প্রশিক্ষক। ঘটনার প্রশাসনিক তদন্ত করে অবিলম্বে প্রশিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’’

ঘটনায় বিব্রত অভিযুক্ত প্রশিক্ষক প্রেমাংশু রায় তাঁর প্রতি ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে সাফাই দিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট করে বলেছেন, ‘‘নিজের সাফাই গাইতে এই পোস্ট নয় :গতকাল একটা ফেসবুক লাইভে যে দোষারোপ আমায় ওই বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো করেছে , তাতে আপনারা যদি আমায় পিটিয়ে মেরে ফেলেন তাতেই সঠিক বিচার হবে। আমি চিরকালই সকল বিষয়ে উত্তেজিত বেশি। ছেলে মেয়েগুলোর সাথে সবার আগে বন্ধুর মতো মেশার চেষ্টা করেছি এবং নিজের দলের ছেলেমেয়েদের সাথে যেমন চিৎকার চেঁচামেচি করি, সেটা করে ফেলেছি। সেটা আমি ভুল করেছি। কারণ, আমার বোঝা উচিত ছিল এদের মানসিকতা এখনও পেশাদার অভিনেতার মত তৈরি হয়নি। ঘরে ফোন করে ডাকার ব্যাপারটা সত্য। কিন্তু, যে উদ্দেশ্য ফেসবুক লাইভে বলা হয়েছে সেটা ভুল। আমি ভীষণ ইয়ার্কি করতে করতে কাজ করি। সেই ইয়ার্কিগুলোও এদের সঙ্গে করা আমার উচিত হয়নি । কারণ, এদের অনেকের সেই ইয়ার্কিগুলো নেওয়ার মন তৈরি হয়নি , সেটা আমি বুঝতে পারিনি!’’

Featured Posts

Advertisement