তিনদিনে রাজ্যে ২২হাজার
পরিবার রেগা থেকে ছাঁটাই

মোদী-মমতার কাঁচির কোপে ছমাসে রাজ্যের সাড়ে ১১লক্ষ

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা : ১১ই অক্টোবর — গত তিন দিনে প্রায় ২৩হাজার। আর গত ছমাসে রাজ্যে একশো দিনের প্রকল্প থেকে নাম কেটে দেওয়া হয়েছে ১১লক্ষ ৬২ হাজার ৯০৭টি পরিবারের!

রেগার আওতা থেকে এইভাবে নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে জব কার্ড বাতিল করে। দেশজুড়েই চলছে এই প্রক্রিয়া। গত ছমাসে দেশে বাদ যাওয়া পরিবারের সংখ্যা ৩৭লক্ষ ৩৭হাজার ৮৬৪। তার মধ্যে একা পশ্চিমবঙ্গে সাড়ে ১১লক্ষের বেশি। পশ্চিমবঙ্গের পরে ভুয়ো জবকার্ড বাতিলের নিরিখে আছে ঝাড়খণ্ড, ওডিশা এবং উত্তর প্রদেশ। তিনটি রাজ্যেই ৩লক্ষের কিছু বেশি জবকার্ড বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু কেন বাদ দেওয়া হলো? নরেন্দ্র মোদীর সরকারের কথায় সায় দিয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকারও মনে করেছে যে —‘ভুয়ো জবকার্ডের মাধ্যমে ভূতুড়ে সুবিধাভোগীদের কাছে’ রেগার টাকা পৌঁছানো হয়েছে।

রাজ্য সরকার এই ভুয়ো জব কার্ডের যুক্তি মেনে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত মাফিক কাজ করছে। প্রমাণ? সেই নাম কাটা চলছে নিঃশব্দে। এই ক্ষেত্রে রাজ্যের গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের কমিশনার দিব্যেন্দু সরকারের চিঠি (মেমো নং-৩৪৪৯(২৩) আর ডি/ও/এনআরইজিএ/১৮এস-০৩/০৯) হচ্ছে নির্দেশিকা। রাজ্যের প্রতিটি জেলাশাসককে তিনি চিঠি দিয়েছেন গত ৫ই জুলাই। চিঠির শিরোনাম হলো — ‘‘ভুয়ো জব কার্ড প্রসঙ্গ’’। চিঠির মোদ্দা কথা হলো — প্রতিটি রাজ্যেই ভুয়ো জব কার্ড আছে বলে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক চিহ্নিত করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও সেই ভুয়ো জব কার্ডের মাধ্যমে ‘ভূতুড়ে সুবিধাভোগীর’ অ্যাকাউন্টে টাকা গেছে। পশ্চিমবঙ্গে ভুয়ো জব কার্ড চিহ্নিত করার কাজ জেলাগুলিতে যথেষ্ট গতি পায়নি। জেলা প্রশাসন বারবার বলেছে, এই কাজে তারা চরম বিন্দুতে পৌঁছেছে। অনেক জবকার্ডধারীই হয় মৃত, নয়তো বাইরে চলে গেছেন কাজের খোঁজে। এই পরিস্থিতিতে আরও গতি আনতে হবে ভুয়ো জব কার্ড চিহ্নিত করে তা বাদ দেওয়ার কাজে।

দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সি পি আই (এম)-র প্রধানরা। উদাহরণ বাদুড়িয়ার রামচন্দ্রপুর পঞ্চায়েতের প্রধান রবিউল হক। তিনি বলেছেন,‘‘আমার কাছে একটি কাগজ পাঠানো হয়েছিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে। সেখানে অনেকগুলি পরিবারের নাম ছিল। বলা হয়েছিল এদের জব কার্ড বাতিল হবে। আপনি সই করুন। আমি বলে দিয়েছি গরিবের জব কার্ড কাটা যাচ্ছে। তাতে আমি সই করবো? কখনো নয়। আমাদের চাপেই প্রথম ইউ পি এ সরকারের আমলে রেগা চালু হয়েছিল। এখন সেই আমিই সই করবো জব কার্ড কাটায়। কে ভুয়ো, কে আসল চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আধার কার্ড কোনও মাপকাঠি হতে পারে না। আমি সই করিনি। কোনদিন করবোও না।’’ ঝাড়গ্রাম জেলার একটি তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত পঞ্চায়েতের প্রধানের খেদ,‘‘এই ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের একটি স্বার্থ আছে। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী চান রেগার কাজে গড় দিন বেশি হোক। জব কার্ড কমিয়ে দিলে গড় কাজের দিন বেড়ে যাবে। আমাদের সঙ্গে আলোচনায় অনেক আমলা এই কথা বলেওছেন। আমাদের কিছু করার নেই। জবকার্ড এখানেও কাটা পড়ছে।’’

যদিও প্রধানের অনুমোদন কিংবা সইয়ের উপর এই প্রক্রিয়া নির্ভর করেনি। করছেও না। মমতা ব্যানার্জির সরকারের আমলে গ্রামের ক্ষমতা আমলাদের হাতে। গ্রামের মানুষ, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে নয়। তাই ঢালাও জব কার্ড কাটা যাচ্ছে। রোজ কাটা যাচ্ছে। ‘ভুয়ো’ হিসাবে সর্বাধিক জব কার্ড চলতি বছরে বাতিল হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় — প্রায় ১লক্ষ ৬৬ হাজার। মারাত্মক সংখ্যা সংখ্যালঘু প্রধান দুই ২৪ পরগনা, মালদহ, মুর্শিদাবাদে।

রেগার জব কার্ড আর আধার কার্ডের যোগাযোগ গড়ে তোলা হয়েছে সম্প্রতি। তা করতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গে দেখা গেছে, তৃণমমূল কংগ্রেসের একাধিপত্যের এলাকায় একই আধার কার্ডে দু-তিনটি জব কার্ড হাজির হচ্ছে। অর্থাৎ গত ছবছরে অনেক ভুয়ো জব কার্ড তৈরি হয়েছে। সেই জব কার্ডগুলির মাধ্যমে রেগার টাকা চুরি করা হয়েছে। এর পরিমাণ কত হবে? রাজ্যের গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের এক অফিসারের কথায়,‘‘কয়েক হাজার কোটি হওয়াই স্বাভাবিক। সাড়ে ১১লক্ষ জব কার্ডের মধ্যে বেশিরভাগই ভুয়ো জব কার্ড। কিছু আছে, যাঁরা আধার কার্ড করাননি এখনও কিংবা ছবি লাগানো হয়নি জব কার্ডে। তাঁদের অংশ বেশি নয় বলেই আমাদের ধারণা। যদি ৮লক্ষও ভুয়ো জব কার্ড হয়, তাহলেই তো প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ কোটি ভূতুড়েদের হাতে চলে গেছে শুধু গত বছরে। চলতি বছরেও গেছে, যাচ্ছে।’’ গ্রামোন্নয়ন দপ্তর এই হিসাবে পৌঁছেছে ২০১৬-১৭-র হিসাবে। গত আর্থিক বছরে গড়ে ১৭১ টাকা ২৪ পয়সা করে রাজ্যে দৈনিক মজুরি পেয়েছেন রেগায় কর্মরতরা। গড়ে কাজ দেখানো হয়েছিল ৪০.৪৪ দিন। অর্থাৎ সাধারণ পাটিগণিত বলছে একবছরে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট ৮লক্ষ ধরলেই লুট হওয়া টাকার পরিমাণ প্রায় ৫৫৪ কোটি টাকা।

কমিশনারের সেই চিঠি আসলে রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী সুব্রত মুখার্জির সিদ্ধান্ত। এতগুলি পরিবারকে এক ধাক্কায় রেগার বাইরে ছিটকে দেওয়ার কাজ শুরুর আগে সুব্রত মুখার্জি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে আলোচনা করে নিয়েছেন। সারা ভারত খেতমজুর ইউনিয়নের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সভাপতি তুষার ঘোষ এবং সম্পাদক অমিয় পাত্রর কথায়, ‘‘তৃণমূল কংগ্রেস দেদার ভুয়ো কার্ড বানিয়ে টাকা লুট করেছে এই কথা সত্য। কিন্তু অনেক গরিব মানুষ এমন আছেন যাঁরা আধার কার্ড করাতে পারেননি। তাঁদের কী হবে? তাঁরা কেন এর শিকার। রাজ্যের কিছু জায়গায় আমরা এই পদক্ষেপ আটকানোর চেষ্টা করেছি।’’

Featured Posts

Advertisement