দেগঙ্গা-হাবড়ায় ফের মৃত্যু
ডেঙ্গুতে, নির্বিকার মুখ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১২ই অক্টোবর— তাঁর কাছে মহারাষ্ট্র, গুজরাট, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান থাকলেও নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের ডেঙ্গু আক্রান্তের সঠিক পরিসংখ্যান থাকে না। তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ, বৃহস্পতিবার নতুন করে ডেঙ্গুতে এক শিশুসহ দুজন প্রাণ হারিয়েছেন। কলকাতায় একজনের মৃত্যু হয়েছে, তাঁর রক্তে মিলেছে ডেঙ্গু জীবাণু।

মুখ্যমন্ত্রীর কাছে রাজ্যে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর যে সংখ্যা রয়েছে, সেই তথ্য প্রকৃত সত্যকে প্রকাশ্যে আনছে না। ডেঙ্গু রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় মহামারীর আকার নিয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের দেগঙ্গা, গাইঘাটা থেকে উত্তরবঙ্গের চামুর্চিসহ বিভিন্ন চা বাগানে প্রায় ঘরে ঘরে ডেঙ্গু রোগী। উত্তরোত্তর বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। বৃহস্পতিবার দেগঙ্গায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। হাবড়ায় প্রাণ হারিয়েছেন একজন। ডেঙ্গুকে কেন্দ্র করে দেগঙ্গার পর এখন গাইঘাটায় পরিস্থিতি শোচনীয়। আতঙ্ক ছড়াচ্ছে বাসিন্দাদের মধ্যে। বারাসত হাসপাতালে বৃহস্পতিবার ডেঙ্গু রোগীদের উপচে পড়া ভিড় প্রকৃত অবস্থা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

অথচ মুখ্যমন্ত্রী সেসব স্বীকার তো করছেনই না, উলটে বলছেন দেগঙ্গায় ডেঙ্গুতে কারোর মৃত্যুই হয়নি। সেখানে চারটি এরকম ঘটনা ঘটলেও সেগুলি ডেঙ্গু প্রমাণ হয়নি। নবান্নে বৃহস্পতিবার এক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। কিছু কিছু ল্যাবরেটরি ভয় দেখাচ্ছে, রক্ত পরীক্ষার নামে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। গত সাত-আট মাসে মোট ৩০ জনের নাকি মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে! আর সম্প্রতি প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বিধাননগরে দুজন ডেঙ্গু আক্রান্তের মৃত্যু হলেও কলকাতায় ছজনের মৃত্যুর যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তা ‘নট ভেরিফায়েড’ অর্থাৎ নিশ্চিত নয়। কিন্তু ডেঙ্গুতে মৃত্যু যে হচ্ছে এবং সেই সংখ্যা যে বাড়ছে তা প্রকৃত অবস্থার বিচারে শাসক দলের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী স্বীকার করে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। নবান্নের এই বৈঠকে এদিন স্বাস্থ্য, পঞ্চায়েত, পৌর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার হাবড়ায় এক সাত বছরের শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কুমড়োকাশীপুর গ্রামের অশোক ঘোষের ছেলে বাবন ঘোষ সোমবার জ্বর নিয়ে হাবড়া হাসপাতালে ভর্তি হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানেই সে প্রাণ হারায়। মৃত শিশুর দাদা সুমন ঘোষের অভিযোগ, হাবড়া হাসপাতালে ভাইয়ের রোগকে কোনও গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। চিকিৎসা হয়নি। রক্তে ডেঙ্গুর জীবাণু পাওয়ার পর তড়িঘড়ি কলকাতার হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালে জানতে চাইলে বলা হচ্ছে, অজানা জ্বর।

অন্যদিকে, দেগঙ্গার উত্তর চাঁদপুর গ্রামের সাবেনা খাতুন (২৮) প্রাণ হারিয়েছেন ডেঙ্গুতে। তাঁর পরিবারের লোকজনের অভিযোগ, বুধবার বারাসত হাসপাতালে রাজ্যের স্বাস্থ্যদপ্তর ও জেলা আধিকারিকরা আসার আগেই হাসপাতাল থেকে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয় রোগীদের। যাতে হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখায় এবং রোগীর সংখ্যা কম থাকে। সেই তালিকায় ছিলেন ডেঙ্গু আক্রান্ত সাবেনা খাতুনও। হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার পর বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। এরকম বহু ডেঙ্গু রোগী বৃহস্পতিবার ফের এসে বারাসত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অবস্থা এমনই যে হাসপাতালে বেডের সংখ্যা ৬০০ হলেও ভর্তি হয়েছেন প্রায় এক হাজার রোগী। বাকি রোগীদের চিকিৎসা কীভাবে হবে, তাও স্পষ্ট নয়।

প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসন কেন ডেঙ্গুর কথা স্বীকার করছে না? কেন ডেঙ্গুকে অজানা জ্বর বলা হচ্ছে? আর যদি অজানা জ্বরই হয়, তাহলে তার প্রতিকার এতদিনেও সম্ভব হলো না কেন? এতগুলি মানুষের প্রাণ চলে যাওয়ার কোনও গুরুত্ব প্রশাসনের কাছে নেই? তবে দেগঙ্গা ও হাবড়াতে গ্রামবাসীরা শোরগোল তোলার পর বৃহস্পতিবার হাবড়া ব্লক অফিসে হাবড়া ও দেগঙ্গার বি ডি ও এবং পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিদের নিয়ে সভা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে ,শুক্রবার থেকে দেগঙ্গার পাঁচটি পঞ্চায়েত এলাকায় শিবির হবে। সেখানে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হবে। শিবির হবে গাইঘাটা, হাড়োয়া, বাদুড়িয়াতেও। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, যদি ডেঙ্গু মহামারীর আকারে না ছড়িয়েই থাকতো, তাহলে তড়িঘড়ি এই ধরনের শিবিরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো কেন?

উত্তর চব্বিশ পরগনায় ইতিমধ্যেই ডেঙ্গুতে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে খবর মিলেছে। মুখ্যমন্ত্রী কলকাতায় ডেঙ্গু নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও বৃহস্পতিবারই নেতাজী নগরের বাসিন্দা বিমলকুমার কামাথ (৪৫) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। তাঁর দেহে রক্ত পরীক্ষার নমুনায় ডেঙ্গু পজিটিভ প্রমাণ মিলেছে। কলকাতার বিশেষ করে নয় এবং দশ নম্বর ওয়ার্ডে যে ডেঙ্গু ছেয়ে গিয়েছে, তা কর্পোরেশন সূত্রেই জানা গিয়েছে। তবে অন্যান্য এলাকাও বাদ যায়নি। খোদ কলকাতা এবং বিধাননগরের বহু এলাকায় অনেক শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রয়েছে এখন। ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বিগ্ন চিকিৎসক এবং পতঙ্গবিদরাও। শুধু উদ্বেগ নেই মুখ্যমন্ত্রীর। তাঁর কাছে সমস্ত রাজ্যের পরিসংখ্যান থাকলেও নিজের রাজ্যের এবং পৌর এলাকাগুলির প্রকৃত তথ্যই তিনি রাখেননি অথবা প্রকাশ করেননি, অভিযোগ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের পরিবারের।

Featured Posts

Advertisement