ঠেলার নাম বাবাজী

নোট বাতিলের অব্যবহিত পরে অমর্ত্য সেনসহ দেশ বিদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা যখন কড়া সমালোচনা শুরু করেন, তখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সাফল্যের জয়গান গাইতে গিয়ে অমর্ত্য সেনদের বিদ্রুপ করতেও ছাড়েননি। বলেছিলেন, হার্ভার্ড নন, তিনি হার্ডওয়ার্কার। বোঝাতে চেয়েছেন বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদদের থেকে হার্ডওয়ার্কার মোদীর অর্থনীতিজ্ঞান বেশি। ৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতি ফোলানোর গরিমায় যিনি প্রায় অন্ধ, তাঁর পক্ষে সর্বজ্ঞ হওয়াটা কঠিন কিছু নয়। গুজরাট মডেলের জনক হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর কুরসি পেয়ে তিনি ধরাকে সরাজ্ঞান করতে শুরু করেন। তিনি ধরেই নিয়েছেন, অর্থনীতি পরিচালনায় তিনি নিজেই একশো। অর্থনীতিবিদ বা অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতামত বা পরামর্শ তাঁর প্রয়োজন নেই। তাই ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি উপদেষ্টা পরিষদ গুটিয়ে ফেলেন। অতীতে সব প্রধানমন্ত্রীরই এই উপদেষ্টা পরিষদ ছিল। বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রপ্রধানদেরও এমন উপদেষ্টা পরিষদ থাকে। কারণ এটাই সর্বজনস্বীকৃত যে কোনও মানুষই সর্বজ্ঞ বা সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে পারেন না। হলেও দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্য বিশেষজ্ঞদেরও মতামত বা পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিজে অর্থনীতিবিদ হলেও, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-র অর্থনীতি উপদেষ্টা পরিষদ ছিল। নরেন্দ্র মোদী এসবের ধার ধারেন না। তাই পরিষদ রাখার প্রথাটাই তুলে দিলেন।

এখানেই শেষ নয়, তাঁর বিবেচনায় যোজনা কমিশনও অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে যোজনা কমিশন। ভারতের উন্নয়ন পরিকল্পনা, শিল্প বিকাশ, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের ক্ষেত্রেও যোজনা কমিশনের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। মোদী ক্ষমতায় এসেই তুলে দিয়েছেন যোজনা কমিশন। নয়া উদারনীতির পথ ধরে দেশি বিদেশি পুঁজির হাতে ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে সমর্পণ করতে হলে রাষ্ট্রের ভূমিকা নস্যাৎ করতে হয়। ফলে পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। তেমনি নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ বা বিশেষজ্ঞদের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। গুজরাট থেকে তাঁর বিশ্বস্ত ও অনুগত আমলাদের এনে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর আলোকিত করেছেন এবং তাদের দিয়ে নিজের মতো করে অর্থনীতি পরিচালনা করেছেন।

তিন-সাড়ে তিন বছর ধরে কেমন পরিচালনা করেছেন, এখন তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন সকলে। বৃদ্ধির হার দেড় বছর ধরে কমছে। আশঙ্কায়, কখন স্থবির হয়ে যায়। ঘটা করে মেক ইন ইন্ডিয়ার ঝড় তোলা হয়েছে। নিট ফল শিল্পোৎপাদনের হার গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বছরে ২ কোটি চাকরি দেবার কথা। বাস্তবে ২ লক্ষও হচ্ছে না। শিল্পে বিনিয়োগ নেই। ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা ‍‌ লাটে ওঠার অবস্থা। বাজারে চাহিদা নেই। উৎপাদন ক্ষমতার ব্যবহার হচ্ছে না। কৃষি বিপন্ন। শেষে নোটবন্দি এবং জি এস টি-র ধাক্কায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প তথা অসংগঠিতক্ষেত্র মৃত্যুর প্রহর গুনছে।

সংকটের এই নির্মম বাস্তবতা প্রতিটি সমীক্ষা ও রিপোর্টে স্পষ্ট। দেশি এবং বিদেশি প্রতিটি সংস্থা সংকটকে স্বীকৃত দিচ্ছে। সরকারি সংস্থার রিপোর্টেও দুর্দশার ছবি। আর মুখ লুকোবার পথ না পেয়ে অর্থমন্ত্রীকেও মেনে নিতে হয়েছে অর্থনীতির দুরবস্থার কথা। কিন্তু ‘বিশ্বের সেরা আর্থিক বি‍‌শেষজ্ঞ’ মোদী কিন্তু একবারের জন্যও স্বীকার করেননি। এখনও গলার শিরা ফুলিয়ে বলে যাচ্ছেন অর্থনীতি ঠিকঠাকই আছে। অবশ্য মুখে স্বীকার না করলেও ভিতরে ভিতরে ভয় পেয়েছেন। দেড় বছর পরই ভোট। ক্ষমতা হারাবার ভয়। যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন, প্রতিটিতেই ডাহা ফেল! মানুষ ঘাড়ধাক্কা দিয়ে কুরসি থেকে সরিয়ে দিলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। তাই ঠেলার নাম বাবাজী। গুঁতোর ঠেলায় গঠন করেছেন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদ। নিজের অহমিকা সর্বনাশ ডেকে এনেছেন। এবার সেই হার্ভার্ডদের কাছেই মাথানত করতে হচ্ছে। পরিষদ তাদের প্রথম বৈঠকেই মোদীর মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে মেনে নিয়েছেন সত্যিই অর্থনীতির হাল খুবই সঙিন।

Featured Posts

Advertisement