আগে ভোট পরে গণতন্ত্র

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের বছরে সংসদের অধিবেশন চ‍‌লে মাত্র ৩৮দিন। সৌজন্যে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে ‘অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ’। স্মরণ করা যেতে পারে ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে জয়ের পর জীবনে প্রথমবার সংসদে প্রবেশের প্রাকমুহূর্তে সংসদের সিঁড়ির সামনে ষাষ্টাঙ্গ প্রণাম করেছি‍‌লেন মোদী। বোঝাতে চেয়েছিলেন সংসদীয় গণতন্ত্রকে তিনি কতটা সম্মান, শ্রদ্ধা ‍‌ও মর্যাদা দেন। সাড়ে তিন বছরের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে এখন স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে সেদিনের সেই চমকপ্রদ ঘটনাটি নিছকই ভাঁওতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ক্ষমতা দখলের পর থেকেই সংসদের গুরুত্ব ক্রমশ খর্ব করা হয়েছে। সংসদের আলোচনা ও বিতর্কের পরিসর উদ্বেগজনকভাবে সংকুচিত হয়েছে। যে সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার পক্ষের মতোই বিরোধীদেরও সমান গুরুত্ব থাকার কথা সেখা‍‌নে বিরোধীরা শুধু উপেক্ষিতই থাকছে না, গণতন্ত্রের মৌলিক বিধি অনুযায়ী জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলিও বিরোধীদের গোচরে আনা হয় না। অর্থাৎ মোদীরা ধাপে ধাপে বিরোধীদের অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়ে হিন্দুত্ববাদের মতাদর্শে পুষ্ট বি জে পি-র স্বৈরাচারী ক্ষমতা কায়েমের পথে হাঁটতে চাইছে।

মোদী সরকারের সৌজন্যে সংসদের অধিবেশন ডাকা অনিয়মিত ও অনিশ্চিত হ‍‌য়ে গেছে। সংসদে সাধারণভাবে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন হলো বাজেট অধিবেশন, বর্ষাকালীন অধিবেশন ও শীতকালীন অধিবেশন। এছাড়াও প্রয়োজনে স্বল্পকালীন অধিবেশন হয়। এখন এই অধিবেশনগুলি দ্রুত সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশের ও জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনার সুযোগ কমে যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজেট অধিবেশনও এখন কার্যত আনুষঙ্গিকতায়‍‌ পর্যবসিত হচ্ছে। বাজেট পেশ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একতরফভাবে পাশ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আলোচনার কোন সুযোগই কার্যত থাকছে না। বিরোধীদের সমালোচনা, সংশোধনকে গ্রাহ্য করা হচ্ছে না। অর্থাৎ সংসদ নামে থাকলেও সরকার চলে নিজের মরজি মতো। আগে বিভিন্ন বিল পেশ হবার বিস্তারিত আলোচনা হতো। তারপরও আরও আলোচনার জন্য বিলগুলির বেশিরভাগই সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানো হতো। এখন সব বিলই লোক দেখানোর মতো আলোচনা করে তড়িঘড়ি পাশ ক‍‌রিয়ে নেওয়া হয়। সংসদীয় কমিটিতে বিল যাবার ঘটনা ভীষণভাবে কমে গেছে। অর্থাৎ নিয়ম রক্ষার জন্য পেশ হয় বটে তবে বিরোধীদের কোন ভূমিকা তাতে থাকে না। এরপরও সরকার বিল পেশ করাটাও গুটিয়ে ফেলতে সচেষ্ট। অনেক ক্ষেত্রেই তারা বিল পাশ করিয়ে আইন প্রণয়নের ধার ধারতে চাইছে না। সরাসরি অর্ডিন্যান্স জারি করার প্রবণতা বাড়ছে। সংসদকে এড়িয়ে বিরোধীদের অস্বীকার করে নিজেদের খুশিমতো যা খুশি তাই করতে চাইছে।

ইদানীং সংসদ অপেক্ষা ভোট রাজনীতির গুরুত্ব শাসকদলের কাছে অস্বাভাবিক বেড়েছে। কোন রাজ্যে বিধানসভা এলেই কার্যত মাসাধিককাল কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা কুলুঙ্গিতে উঠে যায়। তখন প্রায় সব মন্ত্রীই চলে যান সেই রাজ্যে নির্বাচনী প্রচারে। কার্যত গোটা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভাটাই ঝাঁপিয়ে পড়ে দলকে জেতাতে। এরফলে সরকারি সুযোগ সুবিধা পুরোমাত্রায় পরোক্ষভাবে ব্যবহৃত হয় শাসকদলের অনুকূলে। বিহার, উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে এই দৃশ্য দেখা গেছে। এখন গুজরাটে তা দেখা যাচ্ছে। গুজরাটে খোদ প্রধানমন্ত্রীই কার্যত বি জে পি-কে জেতানোর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এখন কেন্দ্রীয় সরকার আংশিক ছুটিতে আছে। এই অবস্থায় সংসদের শীতকালীন অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে গেছে। অবশ্য অধিবেশন না বসানোর পেছনে এবারের প্রধান কারণ সরকার বিরোধীদের মুখোমুখি হবার সাহস পাচ্ছে না। গুজরাটের পরিস্থিতি যা তাতে জেতার কথা জোর দিয়ে বলতে পারছে না। নোট বাতিল, জি এস টি, অর্থনীতি, বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি, হিন্দুত্ববাদী হিংস্রতা ও অসহিষ্ণুতা ইত্যাদি নিয়ে যা জেরবার অবস্থা তাতে এখন অধিবেশন ডাকলে নতুন করে বিড়ম্বনা বাড়বে। অতএব সংসদ গৌণ। আগে ভোট।

Featured Posts

Advertisement