থানার লকআপেই দুই বন্দির মৃত্যু,
পুলিশের নজরদারি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ২২শে নভেম্বর — কলকাতা ও শহরতলিতে পুলিশ হেপাজতে দুই সন্দেহভাজন দুষ্কৃতীর মৃত্যুকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়ালো। চুরির অভিযোগে উত্তর ২৪পরগনার নিউ বারাকপুর আর কলকাতার মেটিয়াবুরুজ থানার লক আপে দুই বন্দির অস্বাভাবিক মৃত্যুতে পুলিশের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে বারাকপুর কমিশনারেট এলাকার তালবান্দা এবং কলকাতার মেটিয়াবুরুজ থানায় আটকদের অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে উত্তেজনা ছড়ালো।

মেটিয়াবুরুজ থানার ভিতরে পুলিশের ভাষায় আত্মহত্যা করা কিশোরের নাম রাকিবুল ইসলাম মোল্লা। পুলিশ নিহতের বয়স ১৮বলে দাবি করলেও, পরিবারের লোকজন জানিয়েছেন, রাকিবুলের বয়স মাত্র ১৬বছর। রাকিবুলের মতোই নিউ বারাকপুর থানার লক আপে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় চোর সন্দেহে আটক করা সুদর্শন সরকার (২৪) নামে এক যুবককে। মেটিয়াবুরুজের ঘটনায় রাকিবুলের পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে বুধবার রাত পর্যন্ত কোনও অভিযোগ দায়ের না করলেও মঙ্গলবার রাতেই ঘোলা থানায় নিউ বারাকপুর থানার পুলিশের বিরুদ্ধে নৃশংসতার অভিযোগ এনেছে নিহত সুদর্শন সরকারের বাড়ির লোকজন।

মেটিয়াবুরুজ থানা সূত্রে জানা গিয়েছে, নিহত রাকিবুলের বাড়ি নাদিয়ালের কাঁঠালবেড়িয়ায়। ওই কিশোর ড্রাগের নেশায় আসক্ত বলে পুলিশ দাবি করেছে। কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (বন্দর) সৈয়দ ওয়াকার রেজা দাবি করেছেন, গত ১৩ই অক্টোবর মেটিয়াবুরুজ থানা এলাকার কারবালা লেনের এক বাড়ি থেকে সোনার গয়না চুরির ঘটনায় রাকিবুল ইসলামকে সন্দেহ করা হয়েছিল। বাড়ির সামনে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পুলিশের সন্দেহ হয়, রাকিবুল ওই চুরির ঘটনায় জড়িত। সেই সন্দেহেই মঙ্গলবার দুপুর ১১-৪৫মিনিট নাগাদ রাকিবুলকে মেটিয়াবুরুজ থানায় নিয়ে আসা হয়।

চুরির ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানার পাশের একটি ঘরে নিয়ে যাওয় হয়। কিন্তু মঙ্গলবার দুপুর ১২-৫০নাগাদ দেওয়ালের মধ্যে লাগানো একটি পাখার সঙ্গে বেল্ট আর জুতোর ফিতে দিয়ে তাকে ঝুলতে দেখা যায়। দ্রুত তাকে কলকাতার এস এস কে এম হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। ডেপুটি কমিশনার দুপুরের ঘটনা বললেও পুলিশের তরফে তা পরিবারকে জানানো হয়েছে অনেক রাতে। তা নিয়েই বিভ্রান্তি শুরু হয়।

প্রাথমিকভাবে পুলিশ মনে করছে জেরার ভয় আর মাদকদ্রব্য না পাওয়ার জন্য রাকিবুল আত্মহত্যা করেছে। মৃতের পরিবারের তরফে কোনও অভিযোগ দায়ের করা না হলেও পুলিশ একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা করে গোটা বিষয়ের তদন্ত শুরু করেছে। ওয়াকার রেজা দাবি করেছেন, কারও কোনও গাফিলতির অভিযোগ প্রমাণিত হয় তাহলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, মঙ্গলবার রাতে কিশোরের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর জানাজানির পর থেকেই গার্ডেনরিচ ও মেটিয়াবুরুজ এলাকায় রীতিমতো উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি যাতে কোনমতেই হাতের বাইরে না যায়, তারজন্য থানার সামনে আগে থেকেই বিশাল পুলিশ বাহিনী মজুত রাখা হয়েছিল। রাতে নামানো হয়েছিল র‌্যাফ। অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় খবর পেয়েই থানায় ছুটে আসেন ডেপুটি কমিশনার ওয়াকার রেজা। তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে তখন থানার সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখা দেন। তিনি গভীর রাত পর্যন্ত থানায় থাকেন। ডেপুটি কমিশনার জানিয়েছেন, রাকিবুলের ময়নাতদন্তের পর তদন্তকে আরও জোরদার করা হবে। ময়নাতদন্তেই পরিষ্কার হয়ে যাবে গোটা ঘটনা।

অন্যদিকে, নিউ বারাকপুর থানার লক আপে মৃত সুদর্শন সরকারের বাড়ি ঘোলা থানা এলাকার তালবান্দায়। গত ২০শে নভেম্বর দক্ষিণ তালবান্দা ঠাকুরবাড়ি এলাকায় একটি বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে সে নাকি হাতেনাতে ধরা পরে। স্থানীয়রা সুদর্শনকে মারধর করে ঘোলা থানার পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এরপর ওই দুষ্কৃতীকে নিউব্যারাকপুর থানার লক আপে রাখা হয়। নিউব্যারাকপুর থানার পুলিশের দাবি, মঙ্গলবার বিকাল চারটে নাগাদ গলায় কম্বলের ফাঁস লাগিয়ে লক আপের ভেতরেই সে আত্মহত্যা করেছে। থানার লক আপে গতকাল নাকি সুদর্শন একাই ছিল।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখে পুলিশ এই তথ্য জানতে পারে বলে দাবি করেছে থানার আধিকারিকরা। তবে কেন লক আপের ভিতরে একজন অভিযুক্ত আত্মহত্যা করলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের দাবি, নিহত সুদর্শন সরকারের নামে নাকি একাধিক অভিযোগ ছিল বারাকপুর কমিশনারেটের বিভিন্ন থানা এলাকায়। বারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের কোনও আধিকারিকের অবশ্য লক আপে অভিযুক্তের অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি। রাতে থানার পুলিশ আটকের বাড়িতে গিয়ে মৃত্যুর খবর জানায়। পুলিশ জানিয়েছে, থানায় কম্বল ছিঁড়ে আত্মহত্যা করেছে সুদর্শন সরকার।

এই ঘটনার জেরে মঙ্গলবার রাতেই সুদর্শন সরকারের মা ঘোলা থানায় পুলিশের বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন। পরিবারের লোকেদের একটাই কথা, যেখানে লক আপে কিছু নিয়ে যাওয়া যায় না সেখানে ফ্যান থেকে কম্বল বেঁধে কী করে একজন বন্দি আত্মহত্যা করতে পারে? ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সুদর্শন সরকারের পাড়ার বাসিন্দারাও। পুলিশের অত্যাচারের জেরেই সুদর্শন মারা গিয়েছে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন।

Featured Posts

Advertisement