সংহতি দিবসে আক্রমণ বামপন্থীদের
বি জে পি-কে আড়াল করলেন মমতা

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ৬ই ডিসেম্বর— তথাকথিত ‘সংহতি দিবস’ পালনেও সি পি আই (এম)-কে আক্রমণের লক্ষ্য হিসাবে বেছে নিয়ে বি জে পি-আর এস এস-এর কাছে ভালো সাজলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার আগে ৪ঠা ডিসেম্বর কলকাতায় তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও কংগ্রেস নেত্রী এই মমতা ব্যানার্জিই বলেছিলেন, ‘‘অযোধ্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে সি পি এম। বি জে পি অযোধ্যায় কিছুই করতে পারবে না। এসব সি পি এম-এর ষড়যন্ত্র।’’ আর বুধবার তিনি বললেন, ‘‘সেদিন নাকি বামফ্রন্ট সরকার ভয়ে ঘর থেকে বেরোয়নি, সে রাতে তিনি একাই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছেন।’’ তাঁর গোটা বক্তব্যের মধ্যে বারে বারেই তিনি এদিন সারদা-নারদ প্রসঙ্গ তুলে দাঙ্গাকাণ্ডে জড়িত বি জে পি এবং আর এস এস-কে আড়াল করলেন।

এদিন গোটা বক্তৃতায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসে সরাসরি বি জে পি-র ভূমিকার প্রসঙ্গ ছিল না। সেভাবে ছিল না দিনটির প্রেক্ষাপটের ব্যাখ্যাও। একসময়ে এই বি জে পি-র নেতৃত্বে ঘর আলো করে ছিলেন তিনি। এই রাজ্যে আর এস এস-কে ডেকে আনার পিছনে তাঁরই যে হাত ছিল, তা আড়াল করতে গোটা বক্তৃতায় বি জে পি-র বিরুদ্ধে লোক দেখানো দোষ দিয়েই সভা সমাপ্ত করলেন। সারদা-নারদ কাণ্ডের উল্লেখে তিনি বলেন, এক এক করে ওরা আমাদের ছেলেদের জেলে পুরেছিল, আবার ছেড়েও দিয়েছে। এরপর আবার আরও অনেককেই জেলে ঢোকানোর জন্য তৈরি হচ্ছে। কিন্তু ছেড়েও দিতে হবে।

বেলা পৌনে একটা। গান্ধীমূর্তির নিচে তখন চলছে তৃণমূল নেতা-নেত্রীদের কথার তুবড়ি। তার মধ্যেই তৃণমূলের এই সম্প্রীতি সমাবেশে আসা লোকজনও তখন এদিক এদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছেন মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতার আগেই। বেলা একটার আগেই ধর্মতলা মেট্রো স্টেশনে তখন বেশ বড় লাইন পড়েছে টিকিটের। সমাবেশে আসা অনেকেই বেশ কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে তখন পা বাড়িয়েছেন অন্যদিকে, তখনও শুরু হয়নি বক্তৃতা। বেলা একটা বেজে কুড়ি মিনিট। চলছে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতা। তার মধ্যেই পার্ক স্ট্রিটের দিকের রাস্তা ফাঁকা হতে শুরু করেছে, মেয়ো রোডের মুখের ভিড়ও কিছুটা পাতলা।

মঞ্চে তখন একমনে বলে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ‘‘আমি ৬ই ডিসেম্বর কোনোদিনও ভুলব না। বামফ্রন্ট সরকার ভয়ে ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। রাতের পর রাত, রাস্তার পর রাস্তা একা ঘুরেছি। খিদিরপুর থেকে মেটিয়াবুরুজ, গার্ডেনরিচ, তিলজলা। কাকলি আর আমি ঘুরে বেড়িয়েছি। সেন্ট জেমস স্কুলের সামনে মাদার টেরেজা ছাড়া তখন রাস্তায় কেউ ছিলেন না। মহাকরণ পর্যন্ত গিয়েছিলাম। জ্যোতি বসু-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কোনও সাহায্য লাগবে কিনা। চাল, ডাল আটা, ময়দা.... বাচ্চাদের জিনিস বানিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতাম। একদিন এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে শিয়ালদহ লরেটো স্কুলের সামনে গিয়েছিলাম। দেখেছিলাম মাদার টেরেজা দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, তুমি এখানে? আমি বললাম, আমি একাই ঘুরছি, আর কাউকে রাস্তায় দেখিনি....।’’

অথচ ১৯৯২ সালের নভেম্বর মাসে যখন করসেবক দলগুলি একদিকে জড়ো হচ্ছে, গোটাদেশের সঙ্গে এইরাজ্যেও দাঙ্গার সতর্কতা জারি হচ্ছে, তখন সেই রাতগুলিতে পথে নেমে রক্ষাকর্তার ভূমিকা নিয়েছিলেন বামফ্রন্ট কর্মীরাই। তখন মমতা ব্যানার্জি কংগ্রেসে। তিনি বলেছিলেন, ‘‘অযোধ্যায় বি জে পি কিছু করতে পারবে না, কংগ্রেসই একমাত্র পারবে। সি পি এম মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে চাইছে।’’

অথচ তারপরেই যখন বাবরি মসজিদ ভাঙা হলো, তখন তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও আশ্চর্যজনকভাবে এই প্রসঙ্গে নীরব ছিলেন। পরে তৃণমূল কংগ্রেস গড়ার পর তিনিই প্রথম বলেছিলেন ‘বি জে পি অচ্ছুৎ নয়।’ বি জে পি-র সঙ্গে জোট গড়েছিলেন ১৯৯৮ সালে। সেবারে সমর্থন করেছিলেন বি জে পি-র নেতৃত্বে এন ডি এ সরকারকে, পরে ১৯৯৯ সালে এন ডি এ মন্ত্রিসভায় প্রবেশ। এমনকি, গুজরাট দাঙ্গার পর বি জে পি, আর এস এস-এর ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছিলেন তিনি। আর এস এস অনুষ্ঠানেও গিয়েছিলেন। লক্ষ্য একটাই, এরাজ্য থেকে সি পি আই (এম)-কে উৎখাত করা। তাই কখনো বি জে পি-র এক নেতা ভালো, অন্য নেতা খারাপ, আবার কিছুদিন পর বি জে পি-র ইনি ভালো নন, কিন্তু উনি ভালো। এদিন বক্তব্যেও নরেন্দ্র মোদীর সমালোচনা করলেও বি জে পি বা আর এস এস-এর অন্যান্য নেতাদের নাম না করে ওই দলকে একরকম ক্লিনচিটই দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।

Featured Posts

Advertisement