গান্ধীজীর স্কুলও বন্ধ, টাকা যার শিক্ষা তার

চন্দন দে

রাজকোট,৬ই ডিসেম্বর— নিজভূমিতেই গান্ধীজী এখন তালাবন্দি।

রাজকোটের জওহর রোডের জুবিলি চকে ১৬৪বছরের পুরানো আলফ্রেড হাই স্কুল বছর দেড়েক হলো বন্ধ পড়ে রয়েছে। ১৮৮৭-তে এই স্কুল থেকে পাস করে বেরিয়েছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। আজ সেখানে তাঁর মূর্তি তালাবন্ধ লোহার গেটে। পাশেই কাদের যেন জামা-কাপড় শুকোচ্ছে।

গান্ধীজীর এই বদ্ধ দশাই এখন গুজরাটের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতীকও বটে। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার হাল খুবই খারাপ। এখন সেখানে সেল্ফ-ফিনান্স স্কুলের রমরমা বাজার। কথা হলো রাজকোটের উপকণ্ঠে এমনই দুটি স্কুল চালান সেই গোপাল মোরখডার সঙ্গে। বললেন, গত দশ-পনেরো বছর ধরে সরকার স্কুলগুলিকে শুকিয়ে মেরেছে। এক তো স্টাফ নেই, নিয়োগও নেই। সরকারের চেষ্টাই হলো, শিক্ষাক্ষেত্রে যত কম খরচ করা যায়। গত দশ বছরে গোটা রাজ্যে দুটো সরকারি স্কুলও হয়নি। শুধুই প্রাইভেট স্কুল।

শিক্ষার এই বেসরকারিকরণ আর সামাজিক ক্ষেত্র থেকে সরকারের সরে আসার মূল পরিণতি হচ্ছে সেকেন্ডারি স্তরে চড়া ড্রপআউট। বলছিলেন আমেদাবাদের এইচ কে আর্টস কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক হেমন্ত শাহ। হিসেব দিলেন, প্রাথমিক স্তরে সরকারি স্কুলে নাম লেখায় যারা, এমন একশো পড়ুয়ার ৮৫জনের তো হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করাই হয় না। ৩৫শতাংশ ক্লাস টেনে ওঠার আগেই লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। আর টেন আর টুয়েলভ-এর মাঝে পড়াশুনা ছাড়তে হয় আরো ৬০শতাংশকে।

ছবিটা শুধু রাজকোটে নয়। গোটা গুজরাটেই এমন হাল। বেশিদূর যেতে হলো না। আমেদাবাদ থেকে মাত্র তিরিশ কিলোমিটার দূরের শেরিসায় দেখা মিললো বছর ষোলোর ময়ূর ঠাকোরের। খাতরাজের গ্র্যান্ট-ইন-এইড স্কুল থেকে ৮৫পড়ুয়ার ৪৮জন টেন পাস করা ছাত্রের একজন ময়ূর। পাশ করার পর ওর ৩৬ বন্ধু আর স্কুলে ভর্তি হয়নি। আসলে পড়তে হলে যেতে হয় অনেকটা দূরের কালোলে। তাও পাবলিক বাস নেই। প্রতিদিন ২কিমি হেঁটে গিয়ে শাটল-অটো ধরে স্কুলে যায় ময়ূর। ওদের স্কুলে সবই ছিল দলিত, পিছড়ে বর্গ নয়তো মুসলিম।

বাকিদের অবস্থা তো খারাপই। এই পিছিয়ে অংশের পড়াশুনার সুযোগ ক্রমশ বাড়ার বদলে সীমিত হচ্ছে এই গুজরাটে। বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঘনশ্যাম শাহ। এমন ছবি গুজরাটে বহু মিলবে।

এনিয়ে আমেদাবাদে বি জে পি-র রাজ্য দপ্তরে গিয়ে প্রশ্ন করতে গেলে এ ওকে দেখান। অনেক ঘোরাঘুরির পর বি জে পি-র কেন্দ্রীয় নেতা সতীশ ভাইয়ের জবাব, ‘আমি এমন কিছু জানি না। তারপর বললেন, আমি তো দিল্লি থেকে এসেছি। কিছুই বলতে পারবো না।’

এ তো গেলো স্কুল না থাকার কষ্ট। আর যেখানে আছে, সেখানের অবস্থা তো আরো খারাপ। টিচার নেই, পড়াশুনা নেই। একে স্টাফ কম, তার ওপর তাঁদের অন্য কাজে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। গ্রামে বা মহল্লায় কোনো সরকারি অনুষ্ঠান থাকলে এদের ঘাড়েই দায়িত্ব আয়োজন থেকে লোক জোগাড়- যাবতীয় কিছু। তার ওপর ইলেকশন ডিউটি, কর্পোরেশনের সার্ভে কিংবা জনগণনার মতো সরকারি আরো কিছু কাজ তো রয়েছেই। রাজকোট লাগোয়া উলপেটের গ্রামের ছেলে গোপাল ভাই আর এখন নুড়াখাড়া গ্রামে থাকেন না। অথচ সেই নুড়াখাড়া গ্রাম থেকে ভোটার স্লিপ থেকে গতকাল রাজকোটে তাঁর কাছে এসেছিলেন স্থানীয় স্কুলের প্রিন্সিপাল।

ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। গান্ধীর নাম জড়ানো থাকলে কী হবে, সৌরাষ্ট্রের প্রথম ইংরেজি মাধ্যম সেই স্কুলের পড়াশোনার মান এতটাই নেমে গিয়েছিল যে বছর কয়েক আগে এই স্কুলের ৬০জন ক্লাস টেনের পরীক্ষা দিলেও একজনও পাশ করতে পারেনি।

তাই সরকারি স্কুলে আর এখন কেউ ছেলেমেয়েকে পড়াতে চান না। নিজে এমন একটা স্কুল চালিয়েও গোপালভাই মনে করেন, বেসরকারিকরণের সঙ্গে লড়তে হলে সরকারি শিক্ষার মেরুদণ্ডকে আরো মজবুত করা দরকার ছিল। ‘আসলে কী জানেন, এই মোদী আর তাঁর দলবদলের সবকিছুতেই দেখনদারি। বছর বছর সরকারি স্কুলে পড়ুয়া টানতে ‘প্রবেশ উৎসব’ আর প্রাইমারি টিচারদের মান মূল্যায়নে ‘গুণোৎসব’ তো করে। আর তামাশার আড়ালে সরকারি স্কুল ফাঁকাই পড়ে থাকে নয়তো বন্ধ হয়ে যায়।’

বললেন, ২০১২-এ লাগু হয়েছে শিক্ষার অধিকার আইন। রাজ্যের সরকার চার বছর ফেলেই রেখেছিল। চালু করলো ২০১৫-১৬-তে এসে। কিন্তু আইনে যে বলা আছে স্কুলের ২৫শতাংশ আসন থাকবে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়াদের জন্য, সে সব কথার কথা রয়ে গেছে। স্কুলগুলি জানে বাবা-মা’র অসহায়তার কথা। নিয়ম নিয়মের জায়গায় রয়ে গেছে আর বেসরকারিকরণ পড়ুয়াদের মা-বাবাকে সিস্টেমের দাস বানাচ্ছে।

কংগ্রেস এবার মা-বাবাদের এই ক্ষোভকে কাজে লাগাতে বেশ তৎপর। লাল দরওয়াজা এলাকায় কংগ্রেসের জেলা দপ্তরে বসে আমেদাবাদ জেলা সভাপতি চেতন রাওয়াত বললেন, এদের রাজে এর থেকে আর কীই বা আশা করার আছে? বলছিলেন, স্কুলস্তরেই বেশিরভাগের পড়াশোনা খতম হয়ে যাচ্ছে। স্কুল ফি’র সঙ্গে লাফিয়ে বাড়ছে কলেজ, উচ্চশিক্ষার খরচ। অধ্যাপক হেমন্ত শাহ বলছিলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যয়বহুল। মেডিক্যাল পড়াশোনা তো আকাশছোঁয়া। খরচ শুরু ৩০লক্ষ থেকে। কোনও কোনও কলেজে ১কোটিও ছাড়িয়ে যায়। এত টাকা দিয়ে যাঁরা ডাক্তার হবে তাঁদের কাছে চিকিৎসার খরচ কী দাঁড়াতে পারে আপনিই আন্দাজ করুন।

তাই পেটে দানা পড়ুক না পড়ুক, সঞ্জীব ঠাক্কর বা হেরমা নরেশ জানেন যে ক্লাস ফোর আর ক্লাস টুয়ের ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্য তাঁদের ৮০হাজার আর ৪০হাজার টাকা রাখতেই হবে। তার ওপর সারা বছরের অন্য খরচ। এমনই একজন সত্যম শর্মা তো বিস্ফোরক, ‘শিক্ষার যখন বেসরকারিকরণই হয়েছে, তখন এটাকে পণ্যের মতোই দেখা উচিত। সেমিস্টারের রেজাল্ট বেরোলে ছেলেমেয়েদের রেজাল্ট অনুযায়ী ওরা ফি চাক। এরা তো গলা কাটে। বাজারে যে দামে একটা বই পাওয়া যায় সেটাকেই ওটা দেড়গুণ দামে আমাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে।’ ঠাক্করের কথায়, কম পয়সা দিয়ে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করে কত স্কুল চালানো হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারি স্কুলগুলিকে নিয়ে বসার মাস ছয়েক আগে এখানেও এমন একটা ‘দেখনদারি কমিটি’ তৈরি হয়েছে। বাংলার সেই কমিটি এখনও হয়তো বসে উঠতে না পারলেও গুজরাটে অবশ্য স্কুলগুলিকে লাগাম পড়ানোর একটা নিয়ম-নির্দেশিকাও তৈরি হয়েছে। ৫ থেকে ১০হাজার জনসংখ্যার এলাকায় বছরে ৫০০০টাকা, আর এক লাখ বা তার বেশি জনসংখ্যার রাজকোটের মতো শহরে বছরে দশহাজার বেঁধে দেওয়া রয়েছে। সে তো কপিবুক স্টাইল, সেখানেই রয়েছে। স্কুলগুলি বীরেন্দ্র সহবাগের মতো বেলাগাম ব্যাট চালাচ্ছে। প্রথমটায় কোথায় ২৫ কোথাও তারও বেশি। আর রাজকোটে তো ১লাখ ছাড়িয়ে দেড় লাখ ছুঁয়ে যায়। তার ওপর বই-খাতা, স্কুল ড্রেস, স্কুল-বাস খরচ তো আলাদাই।

এখন দেখার স্মৃতি মন্দির তৈরির নামে স্কুলের লেখাপড়া বন্ধ করে কতদিন আর গান্ধীজীকে বন্দি রাখা যাবে। দোষারোপ আর অস্বীকারের চক্রব্যূহে আরো দামি হবে শিক্ষা। নাকি মা-বাবার ক্ষোভের কোনো বিস্ফোরণ ঘটবে!

Featured Posts

Advertisement