সম্প্রীতিরই মহামিছিল

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ৬ই ডিসেম্বর— আরো একবার কল্লোলিনীর বুক কাঁপিয়ে মহামিছিল প্রমাণ করলো দাঙ্গাকারীর তুলনায় দাঙ্গাবিরোধী মানুষের সংখ্যা বহু বহুগুণ বেশি। এরাজ্যে ঠাঁই নেই দাঙ্গাবাজদের। শীতের মরশুমে মেঘমুক্ত আকাশকে মাথায় রেখে কলকাতা প্লাবিত হলো জনস্রোতে। দিল্লি থেকে ৬টি বামপন্থী দলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কলকাতার বুকে বুধবার কালো দিন ৬ই ডিসেম্বরের ২৫বছর পূর্তিতে আরো চওড়া ঐক্য নিয়ে ১৮টি বামপন্থী ও সহযোগী দলের মহামিছিল সংগঠিত হলো।

ধর্মতলার লেনিন মূর্তির পাদদেশ থেকে রওনা হওয়া এই মহামিছিল কতটা দীর্ঘ, তাতে কত মানুষ শামিল হয়েছিলেন— সেই খুঁটিনাটি বৃত্তান্ত নেওয়া ছিল এদিন দুষ্কর। কেননা গোড়া থেকে লক্ষ্যে পৌঁছানোর শেষভাগ পর্যন্ত কোন সারিতে বিচ্ছেদ ঘটানো যায়নি এই জনস্রোতকে। মিছিলের যে কোন অংশেই পাশাপাশি ন্যূনতম ১৫/২০জন মানুষ। বিকেল ৪টে ২৫মিনিটে ধর্মতলায় জড়ো হওয়া থিকথিকে জনস্রোত এভাবেই শুরু করলো পথচলা। লেনিন সরণি বেয়ে মহামিছিল মৌলালি পৌঁছালো বটে, কিন্তু সেই সংযোগস্থল পেরতেই এই মিছিলের গোড়া থেকে শেষভাগ সময় লাগলো পাক্কা ৩৪মিনিট। এদিন বিকেল ৫টা ২২মিনিটে যখন ১৮টি দলের নেতৃবৃন্দ এক বুক সম্প্রীতি জড়ানো অ্যাপ্রন নিয়ে রাজাবাজার চৌমাথায় পৌঁছালেন, তখন জনস্রোতের শেষভাগ মৌলালির মোড় পেরিয়ে যাচ্ছে।

এদিন রাজাবাজারে পৌঁছে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু বললেন, পুলিশের কথাতেই মিছিলের শেষ প্রান্তের ঠিকানা বদল হয়েছে। কেননা যানজট হতে পারে এমন আশঙ্কা করে প্রশাসনই পার্ক সার্কাসে সভা করতে বারণ করে। সম্প্রীতির এই মহামিছিলের কর্মসূচি নিয়ে আমরা অন্তত এবার কোন বিরোধিতায় যেতে চাইনি পুলিস প্রশাসনের সঙ্গে। রাজাবাজারে সংক্ষিপ্ত সভা শুরুর মুখে তিনি বললেন, দিল্লিতে যে ৬টি বামপন্থী দল কেন্দ্রীয় উদ্যোগে রাজ্যে রাজ্যে এই আহ্বান জানিয়েছে, সেই দলগুলির নেতৃবৃন্দই এই কর্মসূচি শেষে সংক্ষিপ্ত সভায় বক্তব্য রাখবেন। যদিও ১৮টি বামপন্থী ও সহযোগী রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে উত্তাল ছিলো এদিনের কেন্দ্রীয় মহামিছিল। যে ১৮টি রাজনৈতিক দল এই মহামিছিলে শামিল হয় সেগুলি হলো সি পি আই (এম), সি পি আই, সি পি আই (এম এল-লিবারেশন), এস ইউ সি আই (সি), এ আই এফ বি, আর এস পি, আর সি পি আই, ওয়ার্কার্স পার্টি, এম এফ বি, বি বি সি, বলশেভিক পার্টি, পি ডি এস, সি আর এল আই, এন সি পি, আর জে ডি, কমিউনিস্ট পার্টি অব ভারত এবং জে ডি (ইউ)।

এদিন রাজাবাজারে সভা শুরুর মুখে বিমান বসু বলেন, একদিনের বিক্ষোভ বা সংহতি জানানোর কর্মসূচি কিংবা মহামিছিলে পা মেলানোর মধ্য দিয়েই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যেভাবে এরাজ্যের বুকেও নরম সাম্প্রদায়িকতা, কৌশলী সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে সেই বিপদ সম্পর্কে আমাদের সজাগ, সতর্ক থাকতে হবে। বললেন, কলকাতার বুকে এই কেন্দ্রীয় মহামিছিলে কলকাতা, উত্তর ২৪পরগনা, দক্ষিণ ২৪পরগনা, হাওড়া, হুগলী, নদীয়ার একটি অংশ থেকে সংগঠিতভাবে মানুষ অংশ নিয়েছেন। বিমান বসু বলেন, মন ও আদর্শের দিক থেকে মুক্ত হতে হবে। মূল্যবোধ ও আদর্শে পরিচালিত হতে হবে। নচেৎ সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবিলা করা যায় না।

এদিনের মহামিছিলে এস এফ আই-র কর্মী, সমর্থকরা যোগ দেন ওয়েলিংটন মোড়ে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ নিয়ে দেশজুড়ে সঙ্ঘ পরিবারের ফতোয়ায় শিক্ষাক্ষেত্রে গেরুয়াকরণের বিরোধিতায় ‘জোর সে বোলো আজাদী’ আওয়াজ তুলে এদিন পথে নেমেছিলেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। এদিন এ জে সি বোস রোডে দীনেশ মজুমদার ভবনের (এস এফ আই রাজ্য দপ্তর) সামনে থেকে শুরু হয় এস এফ আই-র মিছিল। সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি জি ডি বিড়লা সেন্টার ফর এডুকেশনে চার বছরের ছোট্ট শিশুর ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধেও এদিন ধিক্কার জানান মিছিলে অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীরা। মিছিলে পা মিলিয়ে এস এফ আই রাজ্য সভানেত্রী মধুজা সেনরায় এদিন বললেন, এস এফ আই ৩৬তম রাজ্য সম্মেলন সফল করার আহ্বানও জানাচ্ছে এই মিছিল।

Featured Posts

Advertisement