সতর্ক থাকতে হবে

দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল বি জে পি শাসিত রাজস্থানের বসুন্ধরা রা‍‌জে সরকার। মন্ত্রী, সরকারি পদাধিকারী ও বিচারকদের বিরুদ্ধে কোনও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সরাসরি তদন্ত করা যাবে না। দুর্নীতির তদন্ত করা যাবে একমাত্র সরকার সায় দিলেই। অর্থাৎ একমাত্র সরকারি ছাড়পত্র মিললে তবেই তদন্ত করা যাবে। শুধু দুর্নীতির বা সরকারি পদাধিকারীদের অনাচার অনুসন্ধান বন্ধই নয়, এসংক্রান্ত কোনও খবর সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশ করা যাবে না। একমাত্র সরকার যদি মনে করে তদন্তের প্রয়োজন তাহলেই তদন্তে সায় মিলতে পারে। অর্থাৎ রাজস্থানে সরকারি আধিকারিকরা ঘুষ নিলে, যথেচ্ছ অনাচারে যুক্ত থাকলে, ঘোটালায় আকণ্ঠ ডুবে থাকলেও সরকারের অনুমতি বিনা কোনও খবর প্রকাশ করা যাবে না। কার্যত সরকারি অনুমতি ব্যতিরেকে রাজস্থানে কোনও দুর্নীতিবাজকে স্পর্শ করা যাবে না। দুর্নীতিতে জড়িত সরকারি কর্মচারী, বিচারপতি কিংবা পদস্থ আধিকারিকের বিরুদ্ধে আগাম অনুমতি বিনা সংবাদ প্রকাশ তো নয়ই, এমনকি আদালতেও যাওয়া যাবে না বিচার চাইতে। সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনও কথা বলার অধিকার কেড়ে নিতে এবং ঘোটালা আড়াল করতে বসুন্ধরা রাজে নতুন আইন প্রণয়নের পদক্ষেপ নেন। অর্থাৎ দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আদালতের শরণাপন্ন হবার যে অধিকার মানুষের রয়েছে আইন করে তা বন্ধ করার পথে হাঁটেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমে সরকার আচমকাই এক অর্ডিন্যান্স জারি করে প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেয়। দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতে ‘ক্রিমিনাল ল (রাজস্থান অ্যামেন্ডমেন্ট)’ নামে একটি দানবীয় অর্ডিন্যান্স জারি করে সরকার দুর্নীতিবাজদের বরাভয় দেয় এখন থেকে তারা যা ইচ্ছে খুশি করতে পারবে। অর্ডিন্যান্সটি আইনে রূপ দিতে সরকার ২৩শে অক্টোবর বিধানসভায় পেশ করে। কিন্তু বিরোধী সদস্যদের প্রবল প্রতিবাদের মুখে অর্ডিন্যান্সটি বিবেচনার জন্য সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হয়। ইতিমধ্যে সারা দেশে সংবাদমাধ্যম, শিল্পী, সাহিত্যিক, বিদ্বজ্জন এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ কণ্ঠরোধকারী অর্ডিন্যান্সের প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠেন। সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন এমনকি প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়াও আসরে নামে অর্ডিন্যান্সটি আটকানোর জন্য। যতটা তৎপরতা নিয়ে আটঘাট বেঁধে নেমেছিল সরকার চারদিকের প্রতিবাদের দরুন হঠাৎই কেমন যেন গুটিয়ে যায়।

দুর্নীতি, কেলেঙ্কারির দায়ে বসুন্ধরা রাজে সরকার এতটাই জড়িয়ে পড়েছে যে সরকারের মন্ত্রী কিংবা বি জে পি নেতারা যেখানেই যাচ্ছেন মানুষের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। ৪৫ হাজার কোটি টাকার খনি কেলেঙ্কারিতে জড়িত বি জে পি নেতা, মন্ত্রী, সরকারি অফিসাররা। খনির জন্য বিপুল পরিমাণ জমি জলের দরে বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এর বিনিময়ে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও সরকারি আধিকারিকের বিরুদ্ধে উৎকোচ নেবার অভিযোগ উঠেছে। বিরোধীরা একাধিকবার তদন্তের দাবি চেয়ে বিধানসভায় লঙ্কাকাণ্ড বাধালেও সরকার নীরব থেকেছে। সরকার সমস্ত রকম উপায়ে চেষ্টা করেছে ৪৫ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারিকে আড়ালে রাখার। দুর্নীতি-কেলেঙ্কারির দায়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে সরকারকে হামেশাই নাজেহাল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছিল। তাই শুধু দুর্নীতির আড়াল নয়, এনিয়ে কেউ যাতে কোনও উচ্চবাচ্য করতে না পারে তার জন্য মুখ বন্ধ করতে আইন তৈরিতে নামেন বসুন্ধরা রাজে। আইনটি সিলেক্ট কমিটির কাছে যাবার পর আজ পর্যন্ত কমিটির কোনও বৈঠক হয়নি। ইতিমধ্যে ৪২ দিন কেটে গেছে, নিয়ম অনুসারে স্বাভাবিকভাবেই অর্ডিন্যান্সটি বৈধতা হারিয়েছে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুলাবচাঁদ কাটারিয়াও মনে করেন আইনগতভাবেই ৪ঠা ডিসেম্বরের পর থেকে অর্ডিন্যান্সটির বৈধতা এখন নেই। কিন্তু সরকার কি পুনরায় বিধানসভার অধিবেশনে অর্ডিন্যান্সটি আনবে? এই প্রশ্নের কোনও জবাব অবশ্য মেলেনি। মনে করা হচ্ছে, কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিভিন্ন অংশের মানুষের প্রতিবাদ ওঠায় সরকার অর্ডিন্যান্স নিয়ে আর এগতে সাহস পায়নি। কার্যত নীরবেই অর্ডিন্যান্সটি যাতে চাপা পড়ে যায় তার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু তাই বলে এটা মনে করার কোনও কারণ নেই যে, সরকার ভবিষ্যতে এই পথে পা বাড়াবে না। দেশব্যাপী মানুষের প্রতিবাদের মুখে সরকার পিছু হটেছে ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যতে আবার এই পথে যাবে না, তার কোনও গ্যারান্টি নেই। সুতরাং সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

Featured Posts

Advertisement