তৃণমূল দল ও সরকার কৃষকদরদির মুখোশ পরতে চাইছে

মদন ঘোষ

শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ‘ভোট বড় বালাই’। খসড়া সংরক্ষণ তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে রাজ্যে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনের ভোটের ঢাকে কাঠি পড়েছে। আর তাই রাজ্যের শাসকদলটি কৃষকের মন জয়ের জন্য পসরার ডালি নিয়ে হাজির হয়েছে। সবকটা কৃষিপণ্যের দর নিয়ে নানা কথা শুরু হয়েছে। আমন ধান ওঠার আগেই ধান কেনার জন্য ঢাক-ঢোল পেটানো শুরু করেছে। পুরানো প্রবাদের অনুকরণে বলতে হয়, পঞ্চায়েত নির্বাচনের সামনে রাজ্য সরকার যেন বলতে চাইছে, ‘ভাইরে ভাই মোর মতো ‘‘কৃষক’’প্রেমী নেই’।



পাটচাষিদের সম্পর্কে

রাজ্যবাসী প্রত্যক্ষভাবে কৃষকের ফসল সংগ্রহ সম্পর্কে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন সরকারের ভূমিকা দেখার সুযোগ পেতে থাকেন ২০১১-১২ পাট ওঠার মরশুম‍‌ থেকে। পাট চাষ, জাঁক দেওয়া ও কাচার সাথে রাজ্যের প্রায় ৪০ লক্ষ কৃষি পরিবার যুক্ত। পাট শিল্পের সাথে যুক্ত কমবেশি দেড় লক্ষ স্থায়ী, ঠিকা ও বদলি শ্রমিক। তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের ছটা বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ শাসকদল ও সরকারের পাটচাষি ও অন্যান্য কৃষকদের সম্পর্কে সরকার ও দলের দরদ উথলে উঠেছে। জুট কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (জে সি আই)-র ক্রয় কেন্দ্র কমে যাওয়া (১৯১ কেন্দ্রের মাত্র ২৭টি চালু) জে সি আই দপ্তরের সামনে নাকি বিক্ষোভ দেখিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। বাস্তবত, ঐ কেন্দ্রগুলোতে ‘গ্রুপ ডি’ পর্যায়ের কর্মী ছাড়া আর কেউ নেই। যখন থেকে এই পাট ক্রয় কেন্দ্রগুলোতে কর্মী কমানোর নীতি চালু হয় সে সময় রাজ্যে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার সদস্যা ছিলেন। তখন কেন প্রতিবাদ করেননি তিনি? রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে আসার পর এতগুলো বছর তাঁর ও দলের কেন্দ্রীয় নীতির কোনও প্রতিবাদ শোনা যায়নি কেন?

ফসলের সহায়কমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সারা ভারত কৃষকসভা ও খেতমজুর ইউনিয়নসহ বামপন্থী সংগঠনগুলি ড. স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ (ফসল উৎপাদন খরচের দেড়গুণ) কার্যকর করার দাবি করে আসছিল। এই সময়েই স্বাধীন ভারতে এই প্রথম ১৮৪টি কৃষক, খেতমজুর সংগঠন এবং এন জি ও মিলে সারা দেশে ড. স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ লাগু করা এবং সব ধরনের ঋণ মকুবের দাবিতে আন্দোলন করছে। সম্প্রতি এই সংগঠনগুলি নিয়ে গঠিত ‘কৃষক সংঘর্ষ সমন্বয় সমিতি’র উদ্যোগে দিল্লিতে‍‌ কৃষক সংসদ অনুষ্ঠিত হলো।

গত ১২ই সেপ্টেম্বর, কলকাতায় জুট কমিশনের দপ্তরে ২০১৮ সালে পাটের সর্বনিম্ন সহায়কমূল্য কি হওয়া উচিত, তার জন্য সভা ডেকেছিল কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন কমিশন ফর এগ্রিকালচারাল প্রাইস অ্যান্ড কস্ট বিভাগ। ঐ সভায় সারা ভারত কৃষকসভার প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন যে, চলতি সময়ে পাটের বাজার পূর্বে ঘোষিত সহায়কমূল্য কুইন্টাল-প্রতি ৩,৩৫০ টাকার নিচে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। সেজন্য পাট উৎপাদক জেলাগুলোতে কমপক্ষে প্রতি ব্লকে একটি ক্রয় কেন্দ্র খোলা ও ২০১৬-১৭ সালে উৎপাদন ব্যয়কে বিবেচনায় রেখে ন্যূনতম সহায়কমূল্য কুইন্টাল-প্রতি ৬,০০০ টাকা ধার্য করার দাবি জানায়। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী কি জবাব দেবেন, কেন আপনার কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা ঐ সভায় নীরব ছিলেন? ঐ সভায় কেন রাজ্যের সরকারি অফিসার উৎপাদন ব্যয়ের ওপর মাত্র ১০% মূল্যবৃদ্ধির দাবি জানিয়েছিলেন?

ধান কেনা সম্পর্কে

ধান কেনা নিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছে রাজ্য সরকার। চাল সংগ্রহ করবে ৫২ লক্ষ মেট্রিক টন। এর জন্য সাজো সাজো রব উঠেছে। সরকারি ক্রয় কেন্দ্রগুলিতে এখনও ‘গ্রুপ ডি’ স্টাফেরা মাছি তাড়াচ্ছেন।‍‌ ব্লকের এক কোণে ফাঁকা মাঠে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র। সেখানে নিয়ে গেলে সরকারি সহায়কমূল্য থেকে কুইন্টাল-প্রতি ২০ টাকা পরিবহণ খরচ দেবে সরকার। কিন্তু ভিজে ধানের কথা তুলে শুকতি কত বাদ যাবে? এক্ষেত্রে সরকার ও ফড়েদের ফারাক সামান্যই। কুইন্টাল প্রতি ৫ থেকে ৭ কেজি ধানের দাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। মিল মালিকরা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থেই ধান কিনতে গড়িমসি করছে। ধানের দামকে ফেলে দিতে চাইছে। সরকারকে ধান দিলে ব্যাঙ্কের চেক পাঠাবে। গত কয়েক বছরে সরকার বা তাদের নিয়োজিত এজেন্ট রাইস মিল বা সমবায় সম্পর্কে কি কোনও অভিজ্ঞতা হয়নি কৃষকের? কি অভিজ্ঞতা কয়েকটা সমবায় সমিতির? ধান সংগ্রহের আ‍‌‍‌গে সরকার গত বছরের বকেয়া মেটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু সুদ কে মেটাবে? গত মরশুমে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছিল সরকার। কিন্তু গ্রামে গিয়ে কোনও সাংবাদিক ১০০ জন মানুষকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন, কতজন চাষির কাছ থেকে সরকার ধান কিনেছিল? এবারও হয়তো লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। কিন্তু কৃষকের কোনও কল্যাণ হবে কি? অন লাইনে টাকা নিতে আপত্তি কৃষকদের। তাঁরা নগদ টাকা চান। কারণ ২-১০ জন মজুর নিয়োগ করলে নগদ টাকা দিতে হয়। বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হয়। পরের চাষের জন্যও‍‌ কিছু‍‌ নগদ রাখতে হয়। তাই কম দাম পেলেও বাজারেই ধান বিক্রি করতে আগ্রহী তাঁরা। ধানের দাম কমলেও চালের দাম কিন্তু বেড়েই চলছে।

আলুচাষিরা মার খেয়েছে। আলু ওঠার মুখে কাঁচা আলুর কিছুটা দাম পেলেও পুরোমাত্রায় আলু উঠতে শুরু হওয়ার সময় থেকেই দাম পড়েছে। রাজ্য সরকার কবছর আগে নিজেদের অপদার্থতা আড়াল করতে প্রতিবেশী রাজ্যগু‍‌লোতে আলু পাঠানো আটকেছিল। সরকারের এই অপদার্থতার ফল ভোগ করছেন আলুচাষিরা। এখন বাজারে ‘ফ্রি-বন্ড’-এ এক বস্তা (৫০কেজি) আলুর দাম ১৭০ টাকা। বস্তাপ্রতি স্টোর ভাড়া ১২০ টাকা। তাই আত্মঘাতী হয়েছেন বেশকিছু আলুচাষি। চাষি মার খেলেও ক্রেতারা কিন্তু লাভবান হননি। এখানেও সরকারপুষ্ট সেই ফড়ে/মধ্যব্যবসায়ীর রাজত্ব। তাই অনেক চাষি এবার আলু চাষ করবেন না স্থির করেছেন। অকাল বর্ষণের ফলে ও পোকাতে ধানের ক্ষতি হয়েছে। আলুর জমি তৈরিতেও দেরি হয়েছে। সুতরাং ভবিষ্যৎ অজানা।



প্রসঙ্গ কৃষি ঋণ ও ফসল বিমা

কিষান ক্রেডিট কার্ড নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি ছেপে যতই বিজ্ঞাপন দেওয়া হোক না কেন তথ্যাভিজ্ঞদের হিসাব মতো রাজ্যের ৬৩ শতাংশ চাষিই চাষআবাদ করেন বেসরকারি সূত্রে ঋণ নিয়ে। ২০১৬ সালের ৭ই এপ্রিল স্বাতী ভট্টাচার্যের (আনন্দবাজার পত্রিকা) লেখায় বলা হয়েছে, ‘যে শর্তে চাষ করছে রাজ্যের অধিকাংশ চাষি, তা দেখলে যে কারও ঘুম ছুটতে বাধ্য। চাষি, ব্যবসায়ীদের সাথে যে কথাটা স্পষ্ট হয় তা হলো, বন্ধক ছাড়া নগদে ধার করতে হলে সুদ অত্যন্ত চড়া — মাসে ৫-১০ শতাংশ, বছরে যা ৬০-১২০ শতাংশে দাঁড়ায়।

শস্যবিমার ক্ষেত্রে মোদী-মমতা সরকারের নীতির কোনও ফারাক নেই। দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিমাক্ষেত্রগুলোর জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। ১৮ই জুলাই ২০১৬ গণশক্তি পত্রিকা লিখেছে, ‘কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা এগ্রিকালচারাল ইনস্যুরেন্স (এ আই সি)-র সঙ্গে চেন্নাইয়ের সংস্থা চোল্লাকমণ্ডলম ও ফিউচার জনারেই ইনস্যুরেন্স (এফ জি আই) এই দুই বেসরকারি সংস্থাকে এরাজ্যে ফসল বিমার এজেন্ট হিসাবে নিয়োগ করেছে রাজ্য সরকার। আর তারপর থেকেই বিশবাঁও জলে চলে গেছে এরাজ্যের কৃষকদের ফসল বিমার প্রাপ্য সুযোগ।’ তাই রাজ্যের ৮০%-এর বেশি কৃষক ফসল বিমার আওতার বাইরে।



রাজ্যে খাদ্য সুরক্ষা

বামপন্থীদের পুরো দাবি না মানলেও তাদেরই চাপে দ্বিতীয় ইউ পি এ সরকার খাদ্য সুরক্ষা আইন পাশ করতে বাধ্য। আইন কার্যকর করার লক্ষ্যে সরকার নির্দেশ দেয় যে, গ্রামাঞ্চলে ৭০% মানুষ খাদ্য সুরক্ষা আইনের আওতায় আসবেন। তালিকা তৈরির সময় (ক) অন্ত্যোদয় প্রকল্প, মহিলা অভিভাবক পরিচালিত পরিবার, নিরাশ্রয় মানুষ এবং বি পি এল তালিকাভুক্তদের বাদ দেওয়া যাবে না। (খ) খসড়া তালিকা একমাস প্রকাশ্য স্থানে টাঙিয়ে রেখে দাবি ও আপত্তি জানানোর সু‍‌যোগ দেওয়া শুধু নয়, গ্রাম সংসদে বসে গণশুনানি করতে হবে। এসবের পরে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে। কিন্তু রাজ্য সরকার বারবার কেন্দ্রের দেওয়া তারিখ ফেল করে শেষ সময় তাড়াহুড়ো করে তালিকা প্রকাশ করায় জন্তু-জানোয়ারের মুখ বা নাম এসে যায়। মানুষের ক্ষোভকে প্রশমিত করতে গিয়ে সরকারের খাদ্যমন্ত্রীর বদলে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, সকলের পুরানো কার্ডে স্ট্যাম্প দেওয়া হবে এবং সকলেই ২টাকা কিলো দরে চাল গম পাবেন। তারপর শুরু হয় সবুজ, নীল ও সাদা ফর্মের খেলা। গত ১লা মার্চ বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয় যে, যাঁদের ডিজিটাল রেশন কার্ড নেই তাঁরা ২ টাকা কিলো দরে চাল গম পাবেন না। খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে যে, (ক) বহু বি পি এল তালিকাভুক্ত গরিব মানুষের নাম বাদ গেছে। অথচ তালিকায় নাম এসেছে তৃণমূল নেতৃত্ব ও দলের ফাইনান্সারদের। (খ) কোনও কোনও ব্লকে পুরো গ্রামবাসীর নাম রেশন তালিকায় নেই। (গ) প্রায় দেড় কোটি মানুষ এখনও ডিজিটাল রেশন কার্ড পাননি। ফলে তাঁরা রেশন দোকানে গেলে শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে। রাজ্যে রেশন কার্ড প্রাপকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯ কোটি ২৪ লক্ষ। মানুষের প্রতি সরকারের দায়িত্বশীলতার কথা বোঝা যায় গত ২৪শে নভেম্বর বিধানসভায় খাদ্যমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে। ২৫শে নভেম্বর সান্ধ্য সত্যযুগ পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ‘এই মুহূর্তে রাজ্যে পাঁচ ধরনের রেশন কার্ড চালু আছে। তারমধ্যে এ এ ওয়াই (অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা), এস পি এইচ এইচ (স্পেশাল প্রায়োরিটি হাউস হোল্ড) ও পি এইচ এইচ (প্রা‌য়োরিটি হাউস হোল্ড) — এই তিন ধরনের গ্রাহকদের রেশন কার্ড দেওয়ার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের। জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা যোজনা (এন এফ এস)-এর আওতায় ২ টাকা কেজি দরে চাল/গম মাসে পাঁচ কেজি করে এই গ্রাহকদের পাওয়ার কথা। খাদ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৫৩,৮১,৯৪০টি পরিবার বর্তমানে এ এ ওয়াই রেশন গ্রাহক। এস পি এইচ এইচ কার্ড আছে ২,৭১,৭৬,৬১২জনের। পি এইচ এইচ রেশন কার্ড গ্রাহকের সংখ্যা ২,৭৬,২৬,৮৬৪জন। সবমিলিয়ে এরাজ্যে ২ টাকা কেজি দরে চাল পাচ্ছেন ৬,০১,৮৫ হাজার রেশন কার্ড গ্রাহক। এর বাইরে আর কে এস ওয়াই-১ ও আর কে এস ওয়াই-২ এই দুই প্রকল্প চালু আছে। এর মধ্যে রেশন কার্ড গ্রাহকের সংখ্যা আর কে এস ওয়াই-১ রেশন কার্ড গ্রাহকের সংখ্যা ৯৫,৮৬,০৬২। আর কে এস ওয়াই-২ রেশন কার্ডের গ্রাহকের সংখ্যা ২,৯৪,০৯,৪৭৫জন। আর কে এস ওয়া০ই-২ কার্ডধারীরা মাসে ৯ টাকা কেজি দরে ১ কেজি গম ও ১৩ টাকা কেজি দরে এক কেজি চাল পেয়ে থাকেন।’ মন্ত্রীর কথাতে এটাও স্পষ্ট যে, ৭৫ হাজার ডিজিটাল রেশন কার্ডের গ্রাহককে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। তাই প্রশ্ন এই ভুয়ো নাম ঢোকানোর দায়িত্ব কার। সরকার কি এই দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে? অস্বীকার করতে পারে গরিব মানুষদের বি পি এল তালিকাভুক্তদের নাম বাদ যাওয়া ও গ্রামবাসীদের নাম বাদ যাওয়ার দায়িত্ব? কেন্দ্রীয় সরকার যেমন ‘খাদ্য সুরক্ষা’ প্রকল্পকে বন্ধ করতে চাইছে রাজ্য সরকারও বাগাড়ম্বের আড়ালে গরিবদের বঞ্চিত করছে।



১০০দিনের কাজের প্রকল্প

রাজ্যে গরিবদের বন্ধুর মুখোশ পরে গ্রাম-শহরের গরিবদের বিভ্রান্ত করার কৌশল নিয়ে পথে নেমেছে যে, বি জে পি সেই বি জে পি পরিচালিত তিনটি রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প বন্ধ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছে। তাঁদের চিঠির মর্মবস্তু হলো ‘এই প্রকল্প চালু থাকায় খেতমজুরদের মজুরি বাড়ছে। তাই চাষ করে কৃষকের ক্ষতি হচ্ছে।’ এই কথা কি মানবেন রাজ্যের গ্রামীণ এলাকায় কাজের কায়িক শ্রমের সাথে যুক্ত মানুষেরা?

এটা তো গেল মুদ্রার একটা পিঠ। অন্য পিঠ হচ্ছে এই প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে আমাদের রাজ্যে সরকারের নীতি। রেগা প্রকল্পের আইনে মুখ্য বিষয় মজুরদের কাজ। আইনে মেশিন ব্যবহার ও মাল কেনার জন্য ছাড়া ঠিকাদার নিয়োগ — এদুটোই নিষিদ্ধ। রাজ্যে প্রায় সব গ্রাম পঞ্চায়েতেই গরিবদের কাজ কমিয়ে চলছে মেশিন ও ঠিকাদার বা কন্ট্রাকটর নিয়োগ। গরিব পাড়ায় ঢালাই রাস্তা আমরাও চাই। কিন্তু ওরা মানুষের কাজ কমিয়ে বা কোথাও কোথাও কাজ না করিয়ে জবকার্ডে ২-১০টা ‘ম্যান ডে’ ঢুকিয়ে দিয়ে তাঁদের সন্তুষ্ট করতে চাইছে। অন্যদিকে অবাধে চলছে দুর্নীতি। শোনা যাচ্ছে এবার নাকি নবান্ন থেকে মৌখিক নির্দেশ এসেছে ‘যাঁদের জব কার্ডে কম দিন কাজ দেখানো আছে তাঁদের কার্ডে আর কাজের দিন না ঢুকিয়ে যাঁদের বেশি দিন ঢোকানো আছে সে‍‌ই কার্ডগুলোতে ১০০দিন করতে হবে।’ এটা হলে বঞ্চিত হবেন ব্যাপক গরিব মানুষ। ত্রিস্তর পঞ্চায়েত এখন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ভাঙতে হবে এই আখড়াগুলোকে। শিকড়সহ উপড়ে ফেলতে হবে এই চক্রকে।

সামাজিক প্রগতি

২০১১ সালে রাজ্য তৃণমূল কংগ্রেস সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রগতি বা উন্নয়ন নয়, ক্রমশ পিছিয়ে চলেছে রাজ্য। হাভার্র্ড বিজনেস স্কুলের ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড কমপিটিটিভনেস বিভাগের ভারতীয় শাখাকে উদ্ধৃত করে গত ৩১শে অক্টোবর, ২০১৭ এ‍‌ই সময় পত্রিকা লিখেছে, ‘শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, নারী সুরক্ষা থেকে ইন্টারনেট সংযোগ, বিদ্যুৎ সংযোগ, ব্যাঙ্ক পরিষেবার সুযোগ — সামাজিক প্রগতির পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের ঠাঁই হলো দেশের মধ্যে পিছনের সারিতে। দেশের প্রথম ২০টি রাজ্যের মধ্যেও থাকতে পারেনি পশ্চিমবঙ্গ।’

তৃণমূলরূপী এই রাহুর দশা থেকে মুক্ত করতেই হবে রাজ্যকে। এটাই কৃষকসভা, খেতমজুর ইউনিয়নসহ সমস্ত বামপন্থী সংগঠনগুলোর রাজ‍‌নৈতিক ও সাংগঠনিক কাজ। সেই সাথে রুখতে হবে আর এস এস/বি জে পি-র বিভেদের শক্তিকে। শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের ঐক্য ছাড়া সম্ভব নয় এই পাষাণ সরানোর কাজ।



পঞ্চায়েত ভোট সামনে। তাই তৃণমূল দল ও রাজ্য সরকার বন্ধুর মুখোশ পরে গ্রামের গরিব মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। রাজ্য সরকার ও শাসক দলের নীতি, অপদার্থতা এবং দুর্নীতির ফলে গ্রাম বাংলার মানুষের জীবনীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত। সেই ক্ষয়ক্ষতির দিক গুলিকেই তুলে ধরেছেন লেখক।

Featured Posts

Advertisement