বিচারপতিদের বিদ্রোহে উঠে
এল লোয়ার হত্যারহস্যও

সংবাদসংস্থা

নয়াদিল্লি, ১২ই জানুয়ারি — সুপ্রিম কোর্টের চার বরিষ্ঠ বিচারপতির বিদ্রোহের সঙ্গেই প্রকাশ্যে চলে এল সি বি আই-র বিশেষ বিচারপতি বি এইচ লোয়ার হত্যা রহস্যের বিষয়টি। শুক্রবার দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে চার বিচারপতি দেশের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের বিরুদ্ধে যে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন তারমধ্যে বিচারপতি লোয়ার ‘রহস্যজনক’ মৃত্যুর প্রসঙ্গও আছে। বিচারপতি লোয়ার মৃত্যুর তদন্ত চেয়ে যে জনস্বার্থবাহী মামলা দায়ের হয়েছে তার শুনানি ঠেলে দেওয়া হয়েছে ১০নম্বর এজলাসে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ তো নয়ই, প্রথম সারির চার বেঞ্চেও রাখা হয়নি মামলাটি। আবার এদিনই সুপ্রিম কোর্টে শুরু হয়েছে লোয়ার মৃত্যুর তদন্ত সম্পর্কিত মামলার শুনানি। সেই শুনানিতে অন্যতম আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং স্পষ্টই সুপ্রিম কোর্টে এই মামলা চলার বিরোধিতা করেন। সরাসরি না বললেও ইন্দিরা জয়সিং অথবা আইনজীবী দুষ্মন্ত দাভের আশঙ্কা, মামলাটি বোম্বে হাইকোর্ট থেকে স্থানান্তরের কৌশলেই এদিন সুপ্রিম কোর্ট ‘বিচারপতি লোয়ার মৃত্যু অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা’ বলে মন্তব্য করেছে। বি জে পি সভাপতি অমিত শাহকে ফের আড়ালের উদ্যোগ বলেই অভিমত আইনজীবীদের একাংশের।

এদিন দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক ডাকেন সুপ্রিম কোর্টের চার বিচারপতি জে চেলমেশ্বর, বিচারপতি কুরিয়ান যোসেফ, বিচারপতি রঞ্জন গোগই এবং বিচারপতি মদন লোকুর। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, প্রধান বিচারপতির নিজের যে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ, এই চারজনই তার সদস্য। তাঁরা প্রকাশ্যেই আঙুল তুলেছেন দেশের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের বিরুদ্ধে। শীর্ষ আদালতে মামলা বণ্টন সংক্রান্ত বিষয়ে গরমিলের অভিযোগও তুলেছেন। মুখ খুলেছেন ‘বিচারবিভাগের ভিতরে অনিয়ম’ নিয়েও। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো লোয়ার মৃত্যু সংক্রান্ত মামলা সম্পর্কেও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাঁরা ওই প্রশ্ন তুলতে দ্বিধা করেননি।

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের ২৬শে নভেম্বর সোহরাবুদ্দিন শেখ এবং ২৮শে নভেম্বর তাঁর স্ত্রী কৌসরবাঈকে গুজরাটের পুলিশ ভুয়ো সংঘর্ষের নামে গুলি চালিয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ। সোহরাবুদ্দিনের সঙ্গী তুলসী প্রজাপতি একবছর পরে খুন হন। অমিত শাহ তখন ছিলেন গুজরাটের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০১০সালে এই ভুয়ো সংঘর্ষের মামলায় সুপ্রিম কোর্টই সি বি আই তদন্তের নির্দেশ দেয়। ২০১০-র জুলাইয়ে সি বি আই চার্জশিটে অমিত শাহকে অভিযুক্ত করে, তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়। তিন মাস পরে গুজরাট হাইকোর্ট শাহকে জামিন দেয়। ২০১২সালে সুপ্রিম কোর্ট এই মামলা বোম্বে হাইকোর্টে স্থানান্তর করে। ২০১৪সালে বি জে পি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পরেই এই মামলাকে ঘিরে একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে। বিশেষ সি বি আই আদালতে বারবার সমন সত্ত্বেও হাজির হচ্ছিলেন না অমিত শাহ। বিচারপতি জে টি উতপত ২০১৪-র ২৬শে জুন শাহকে আদালতে হাজির হবার নির্দেশ দেন। ২৫শে জুন বিচারপতি উতপত বদলি হয়ে যান। তাঁর বদলেই বিচারপতি নিয়োগ হন বিচারপতি লোয়া। প্রায় ছমাস এই মামলা শুনছিলেন তিনি। ৩০শে নভেম্বর এক সহবিচারপতির কন্যার বিবাহ উপলক্ষে লোয়া নাগপুরে যান। ১লা ডিসেম্বর সকালেই তাঁর পরিবারের কাছে তাঁর মৃত্যুসংবাদ আসে।

এই মৃত্যু ঘিরেই এখন প্রশ্ন প্রকাশ্যে এনেছেন লোয়ার পরিবার। বিচারপতি লোয়ার পরিবার অভিযোগ করেছেন, নাগপুরে তাঁর অসুস্থতার কোনও খবর পরিবারকে দেওয়া হয়নি। ১লা ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুসংবাদ টেলিফোনে জানানো হয়। আত্মীয়দের সম্মতি ছাড়াই ময়নাতদন্ত করা হয়। দেহ পাঠিয়ে দেওয়া হয় বিচারপতির গ্রামের বাড়িতে। দেহে আঘাত ও রক্তের দাগ ছিল। আর এস এস-র এক কর্মী পরিবারকে আগেই মৃতদেহ আসা ও সব ব্যবস্থা করার কথা জানান। যে বিচারপতিদের সঙ্গে তিনি নাগপুরে গিয়েছিলেন তাঁরা বা কোনও পুলিশকর্মী বিচারপতির মরদেহের সঙ্গে আসেননি।

লোয়ার মৃত্যুর পরে বিচারপতি হন এম বি গোসাভি। ২০১৪-র ১৫ই ডিসেম্বর শাহের ছাড় দেবার আবেদনের শুনানি শুরু করে দুদিনের মধ্যেই শাহকে মামলা থেকে রেহাই দিয়ে দেন বিচারপতি। সি বি আই এই রায়ের বিরুদ্ধে কোনও আবেদনও করেনি। যদিও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সি বি আই তদন্ত করছিল, কিন্তু শীর্ষ আদালতে যায়নি সি বি আই। কালক্রমে এই মামলায় অভিযুক্ত গুজরাটের পুলিশ অফিসাররাও একে একে ছাড় পেয়ে যান।

তবে শুক্রবার লোয়া মৃত্যুরহস্যের মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মহারাষ্ট্র সরকারকে যুক্ত করতে চেয়েছে। বলা হয়েছে, ওই সরকারের বক্তব্য এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টসহ অন্যান্য নথি ১৫ই জানুয়ারির মধ্যে দাখিল করতে হবে আদালতে। তবে মামলার শুনানিতে ইন্দিরা জয়সিং বোম্বে বার অ্যাসোসিয়েশনের আবেদনের কথা জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান। মামলাটি বোম্বে হাইকোর্টেও চলছে রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্ত চেয়ে। ইন্দিরা বলেছেন, ‘‘এই মামলার দুটি নির্দেশ ইতিমধ্যে দিয়েছে হাইকোর্ট। একটি নির্দেশে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে নোটিস পাঠাতে বলা হয়েছে । আর একটি নির্দেশে মামলার শুনানির দিন ২৩শে জানুয়ারি ধার্য করা হয়েছে। ফলে সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানি চলা উচিত নয়।’’ তা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্টের দুই সদস্যের বেঞ্চ ‘বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর’। জয়সিংয়ের আবেদন বিবেচনা করে দেখারও আশ্বাস দেয় বেঞ্চ।

এদিকে, বোম্বাই আইনজীবী অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী দুষ্মন্ত দাভের যুক্তি হলো মামলাটি যখন বোম্বে হাইকোর্টে চলছে তখন সুপ্রিম কোর্টে শুনানি চলার দরকার নেই। এর প্রভাব হাইকোর্টের ওপর পড়তে বাধ্য।

দাভে অথবা ইন্দিরা যে আশঙ্কাপ্রকাশ করেছেন, তাতে সহমত পোষণ করেছেন দেশের প্রথমসারির বহু আইনজীবী। তাঁদের ধারণা, মামলা সুপ্রিম কোর্টে স্থানান্তর ঘটিয়ে গোটা অভিযোগ থেকে বি জে পি সভাপতি অমিত শাহকে বেকসুর মুক্তি দেওয়ার ছক কষা চলছে সুনিপুণভাবে।

Featured Posts

Advertisement