মোদীর হাতেই বিপন্ন কৃষি

তিন বছর ধরে নিয়ম করে কৃষকদের মনের কথা (মন কি বাত) শুনিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আর কিছু করতে না পারলেও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির হার চলতি অর্থবর্ষে ২.১ শতাংশে নামিয়ে এনেছেন। কৃষিতে বৃদ্ধির হারের দশা থেকে বুঝতে কারও অসুবিধা হবার কথা নয় যে, কৃষকরা কি অবস্থায় দিন গুজরান করছেন। ভারতের কৃষি ব্যবস্থা আজও যেহেতু প্রকৃতি নির্ভর তাই বন্যা বা খরার প্রকোপহীন সময়োপযোগী পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধানতম শর্ত। চলতি অর্থবর্ষে বন্যা বা খরার কোনও প্রকোপ ছিল না। বৃষ্টিও হয়েছে নিয়মিত এবং পর্যাপ্ত। মোদী জমানায় এমন অনুকূল আবহাওয়া আর কোনও বছর ছিল না। আগের দুটো বছরই হয় বন্যা বা খরা দেশের একটা বড় অংশের কৃষি অঞ্চলকে কৃষি উৎপাদনের পক্ষে প্রতিকূল করে দিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই চলতি অর্থবর্ষেই কৃষি উৎপাদনে সর্বোচ্চ হারে বৃদ্ধির নিশ্চিত সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তেমনটা তো হয়নি। বরং আগের প্রতিকূল পরিস্থিতির বছরগুলির থেকেও অনেক কম হারে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন এই প্রশ্ন উঠতেই পারে অনুকূল পরিবেশ সত্ত্বেও কৃষিতে এই শোচনীয় হাল কেন?

মৌনী প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এই প্রশ্নের জবাব মিলবে না। কারণ তিনি নিজের কথা বলেন, অন্যের প্রশ্ন তা সে যত প্রাসঙ্গিক বা গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, তিনি উত্তর দেন না। আসলে মিথ্যার ভিতের ওপর তার এমন এক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে যে, সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে অক্ষম। অর্থনীতিতে বিশেষ করে কৃষি ক্ষেত্রে বন্যা বা খরাজনিত প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে কোনও বছর কৃষি উৎপাদন মার খেলে পরের বছর উৎপাদন অনেকটাই বাড়ে। কারণ কৃষকরা আগের বছরের ক্ষতি সামাল দিতে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সর্বোচ্চ পরিশ্রম করে থাকেন। অথচ এবছর সেই সাধারণ নিয়মও কাজে আসেনি। অর্থাৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারি কোনও প্রয়াস তো ছিলই না উলটে সরকারের ব্যর্থতা আর অপদার্থতার নেতিবাচক প্রভাবে কৃষকদের নিজস্ব উদ্যোগও গতি হারিয়েছে। তার নিট পরিণাম কৃষি উৎপাদনে এমন ভরাডুবি অবস্থা।

মোট জাতীয় উৎপাদনে কৃষির অংশ তুলনামূলকভাবে অনেক কম হলেও মনে রাখতে হবে দেশের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যার জীবনজীবিকা পুরোপুরি নির্ভর করে কৃষির ওপর সেই কৃষিতে এমদন খারাপ অবস্থা মানে ৭০ থেকে ৮০ কোটি মানুষের আয়ে বড়সড় কোপ পড়েছে। কৃষকের আয় কমেছে। তারা ঋণ শোধ করতে পারছেন না। অসহায় অবস্থায় প‍‌ড়ে কেউ আত্মহত্যা করছেন বা কেউ কৃষি ছেড়ে অন্যত্র রুজির সন্ধানে পাড়ি দিচ্ছেন।

কৃষি বিকাশে মোদী সরকার একটি পদক্ষেপও নেয়নি। তবে ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিতে কখনও কার্পণ্য করেনি। ভোটের আগে বড়গলা করে বলা হয়েছিল কৃষকের আয়বৃদ্ধির নিশ্চিত ব্যবস্থা হবে। মোদী নিজে বার বার বলেছেন কৃষকের আয় দ্বিগুণ করা হবে বলে। এমনকি কেন্দ্রীয় বা‍‌‍‌জেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে কৃষিতে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে আরও ৫০ শতাংশ যুক্ত করে কৃষি পণ্যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ধার্য হবে। দুই প্রতিশ্রুতির একটাও পালিত হয়নি। কৃষকরা দ্বিগুণ বা দেড়গুণ দূরের কথা চাষের খরচও তুলতে পারছেন না ফসল বিক্রি করে। আজ পর্যন্ত কোনও ক্ষেত্রে স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ মেনে খরচের দেড়গুণ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষিত হয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খরচের থেকেও কম সহায়ক মূল্য। কোথাও বেশি হ‍‌লেও বাজারে কৃষকরা সেই দাম পান না ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে। সরকার থাকে নীরব দর্শক। ভারতের কৃষিতে এটাই প্রধান এবং মৌলিক সমস্যা। সরকার চাইলে সহজেই এই সমস্যার সমাধান করতে পারে কিন্তু করবে না। তার উপর সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে নোট বাতিলের পর। নগদের অভাবে গোটা কৃষি ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়েছিল। কৃষকদের অবস্থার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ী ও ঋণদাতারা তাদের সর্বস্বান্ত করেছে। তারই জ্বলন্ত প্রমাণ কৃষি উৎপাদনের এই শোচনীয় অবস্থা।

Featured Posts

Advertisement