আন্তর্জাতিকের ইতিহাস

সুদেষ্ণা চক্রবর্তী   ১৩ই জানুয়ারি , ২০১৮

অতীতের জমিতেই বর্তমানের নির্মাণ। আজ যখন বিশ্বের শ্রমিক ও বাম আন্দোলন গভীরভাবে বিপন্ন, তখন অতীত আমাদের শক্তি ও প্রেরণা জোগাতে পারে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য ‍‌William Z Foster এর ‍‌Inte

ational এর দুই খণ্ড পুনর্মুদ্রণ।

ফস্টারের নাম বাম ও শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে উজ্জ্বল। তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রমিক নেতা ও সংগঠকদের একজন। তাঁর জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাসচুসেটস্‌ রাজ্যের টনটন শহরে ১৮৮১ সালে। মৃত্যু ১৯৬১ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কোতে মাত্র দশ বছর বয়সে ফস্টার রুজি রোজগারের তাগিদে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। কত রকম কাজের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন, কাঠুরে থেকে নাবিক, তার ইয়ত্তা নেই। বহু ক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছিলেন শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে। অনেক সময় সংগঠন গড়েও তুলেছিলেন। তাঁর কলমেরও জোর ছিল। তিনি লিখেছেন একাধিক আত্মজীবনী। যা একই সাথে শ্রমিক সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। নানা দলমত পেরিয়ে ফস্টার হয়েছিলেন মার্কিন কমিউনিস্ট পার্টির এক নেতা। সেখানেও অন্যদের সাথে তাঁর বিতর্ক হয়নি‍‌ তা নয়। ত‍‌বে তিনি ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র।

এ হেন ফস্টার আন্তর্জাতিকের সুযোগ্য ঐতিহাসিক, তাতে সন্দেহ নেই। আন্তর্জাতিক অর্থ কি? এ হলো সীমান্ত পেরিয়ে শ্রমিক ঐক্যের সংগঠন। অনেক সময় মালিকরা বিদেশ থেকে সস্তা শ্রম আমদানি করে ধর্মঘট ভাঙার চেষ্টা চালাত অথবা নিজের দেশে মজুরির হার কমাতে চাইত। সব চেয়ে বড় উদাহরণ বোধহয় ব্রিটেন। বিশ্বের প্রথম শিল্পসমৃদ্ধ দেশ। দেশের মধ্যে পাওয়া যেত অপেক্ষাকৃত দক্ষ, শিক্ষিত, দামি শ্রম। আর ঘরের পাশে উপনিবেশ আয়ারল্যান্ড থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আইরিশ চ্যানেল পেরিয়ে আসত একটু কম দক্ষ ‍‌(unskilled) কম মজুরির শ্রমিকেরা। শ্রম ঐতিহাসিক ‍‌(labour historian) EP Thompson এর বক্তব্য, এই দুয়ের মিশেল ইংল্যান্ডের রমরমার কারণ। কিন্তু শ্রমিকদের পক্ষে ফল সর্বদা উপাদেয় হতো না। ঊনবিংশ শতাব্দীর এক শ্রমিক কবি লিখেছেন —

Their work grew scarce and bread grew dear/

And wages lessened too/

For Irish hoards were bidded here/

Our half-paid work to do.

আন্তর্জাতিকের কাজ ছিল ধর্মঘট ভাঙাদের বিরত করা। জোর করে নয়, বুঝিয়ে, হয়তো বিকল্প কাজ জোগাড় করে দিয়ে।

১৮৬৪ সালে যার ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ওয়ার্কিং মেন’— এই নামে প্রথম আন্তর্জাতিক চালু হয়েছিল। ক্রমে এই সংস্থার বৃহত্তর উদ্দেশ্য হলো বিশ্ব বিপ্লব। বিভিন্ন দেশে তার শাখা প্রতিষ্ঠিত হলো। বার্ষিক কংগ্রেস আয়োজিত হলো ইউরোপের নানা বড় শহরে। মার্কস ও এঙ্গেলস আন্তর্জাতিকের অন্যতম তাত্ত্বিক ও সংগঠক হলেও মার্কসবাদ আন্তর্জাতিকের একমাত্র, এমন কি অধিকাংশের মতাদর্শ ছিল না। আরও বেশ কিছু নেতার প্রভাব যথেষ্ট ছিল। জার্মানির লাজাল, ফ্রান্সের ব্ল্যাঙ্কি ও প্রুধঁ, জারিস্ট রাশিয়ার বাকুনিন। চিন্তারও প্রচুর বৈচিত্র্য ছিল। অ্যানার্কো সিন্ডিকালিজম্‌ থেকে সশস্ত্র অভ্যুত্থানবাদ বা নিছক ট্রেড ইউনিয়ন কার্যকলাপ, যাকে বলে economism।

আন্তর্জাতিক জাতীয় (national) প্রশ্নকে গুরুত্ব দিত। তার কারণও ছিল। উনবিংশ শতাব্দী‍‌তে ইউরোপের এক বড় অংশ ছিল তিনটি বৃহৎ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। জারিস্ট রুশ সাম্রাজ্য, অস্ট্রোহান গেরিয়ান সাম্রাজ্য ও অটোমান সাম্রাজ্য। আন্তর্জাতিক কি সব জাতিসত্তার স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্রের জন্য লড়বে। না কি ঐক্যবদ্ধভাবে জাতি নির্বিশেষে সব শ্রমিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। এ নিয়ে বিতর্ক চলেছিল দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সময় অবধি। তবে সবাই এক মত ছিল। শ্রমিক আন্দোলন যুদ্ধ আটকাবে। দরকার হলে সৈনিকরা বন্দুক ঘোরাবে নিজেদের অফিসারদের বিরুদ্ধে। এই পরিকল্পনা সফল হয়নি। প্রত্যেক আন্তর্জাতিক শেষ হয়েছিল যুদ্ধের দরুন। কিন্তু প্রতিবারই পরাজয়ের পর এল নতুন জয়।‍‌ ১৮৭০-র ফ্রান্স বনাম প্রাশিয়ার যুদ্ধ ফ্রান্সের বিপর্যয় ডেকে আনল। সেই সঙ্গে পরের বছর সৃষ্টি করল প্যারি কমিউন। বিশ্বের প্রথম শ্রমিক রাষ্ট্র, যদিও ক্ষণস্থায়ী। প্যারি কমিউন রক্তে ভেসে যাওয়ার পর প্রথম আন্তর্জাতিকেরও অবসান ঘটল। মার্কিন মুলুকে তার পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা খুব সফল হয়নি। ১৮৮৯-এ ফরাসি বিপ্লবের শত বার্ষিকীতে স্থাপিত হলো দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক, যা ধ্বংস হলো প্রথম মহাযুদ্ধের আঘাতে। কিন্তু সে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই রুশ বিপ্লব ঝড় তুলল। এর পর জন্ম নিল তৃতীয় আন্তর্জাতিক। যা পরিচিতি ছিল Communist Inte

ational বা Cominte

রূপে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নানা কারণে Cominte

তুলে দেওয়া হলো। কিন্তু যুদ্ধের পর সমাজবাদের গোলায় ফসল উঠল, চীন ও পূর্ব ইউরোপের।

বলা হয়, প্রথম আন্তর্জাতিকের ছিল বিরাট আত্মা আর অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র দেহ। আর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের তার বিপরীত। এ কথা সত্য যে, আয়তন, সদস্য সংখ্যা সহায় সম্বল, সব কিছুতে সেরা হয়েও দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক অতখানি জঙ্গি ছিল না। বাকুনিন ও ক্রপটকিনের তুলনা করলে সে কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফস্টার ব্যাপারটার এইভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশক থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল ইউরোপীয়ান পুঁজিবাদের অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ বিকাশের সময়। খুব বেশি গণঅভ্যুত্থান হতো না। যেমনটা হতো প্রথম আন্তর্জাতিকের কালে, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশক ধরে। জারিস্ট রাশিয়া হয়তো ব্যতিক্রম।

দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের আর এক বৈশিষ্ট্য ছিল, মার্কসবাদের প্রাধান্য। যা কি না প্রথম আন্তর্জাতিকের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। সেখানে মার্কসবাদ ছিল না তা নয়। তবে অন্যান্য মতাদর্শের গুরুত্ব ছিল আরও বেশি। প্যারি কমিউনে যেমন নেতৃত্ব দিয়েছিল ব্ল্যাঙ্কিবাদী, বাকুনিনপন্থীরা বা পুরানো আমলের জ্যাকোব্যাঁরা। মার্কস ১৮৮৩ সালেই গত হয়েছিলেন। এঙ্গেলস ১৮৯৫ সালে তাঁর মৃত্যু অবধি ‍‌দ্বিতীয় আন্তর্জাতিককে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এর পর নেতা ও অন্যতম তাত্ত্বিক রূপে স্বীকৃত হয়েছিলেন জার্মানির কাউটস্কি ও রাশিয়ার প্লেখানভ। দুইজনই নিঃসন্দেহে মার্কসবাদী। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের বিস্তারও ঘটেছিল অনেকখানি।‍‌ এই সংস্থাই বিকল্প বা ভবিষ্যৎ সরকার। এদের হাতেই রাষ্ট্র ক্ষমতা আসবে। এমন ধারণা ছিল অনেকের। কিন্তু এই শক্তির অন্তরালে লুকিয়ে ছিল দুর্বলতা। বিংশ শতাব্দীবর গোড়ায় আন্তর্জাতিকের অভ্যন্তরে মাথা চাড়া দিয়েছিল শোধনবাদী (revisionist) বিতর্ক। এর এক দিকে ছিলেন রুশ-পোলিশ নেত্রী রোজা লুকসেমবুর্গ, অন্য দিকে বার্নস্টাইন। শোধনবাদী বক্তব্য ছিল এই রকম পুঁজিবাদ উন্নতির পথে অগ্রসর হচ্ছে, সাধারণ মানুষের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। শান্তিপূর্ণ ভাবে ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা বাড়ছে। শ্রেণি সংগ্রাম এখন অনেকটাই অবান্তর। এ ব্যাপারে বার্নস্টাইনের মডেল ছিল ইংল্যান্ড। অন্য দিকে রোজা দেখালেন শ্রেণি বৈষম্য ও শ্রেণি সংগ্রাম অব্যাহত। আন্তর্জাতিকের বলতে গেলে মাথা কাউটস্কি মোটের উপর রোজার পক্ষেই সায় দেন। কারণ হয়তো শোধনবাদী থিসিসি মেনে নিলে আন্তর্জাতিকের ভিত নড়ে যায়। কিন্তু পরবর্তী ঘটনা প্রমাণ করেছিল শোধনবাদ সংস্থার গভীরে শিকড় গেড়েছিল আর কাউটস্কিও তার থেকে মুক্ত ছিলেন না।

ফস্টার বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদের যুগে পশ্চিমের শাসক শ্রেণি উপনিবেশ থেকে অর্জিত বা লুট করা অত্যুচ্চ মুনাফার ‍‌(super profit) একাংশ দিয়ে স্বদেশের শ্রমিক শ্রেণির একাংশকে তুষ্ট রেখেছিল। এই বক্তব্য অনেকটা লেনিনবাদী থিসিসের কাছাকাছি। এর আর এক‍‌ দিক, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের মধ্যে উপনিবেশের মালিকানা নিয়ে খেয়োখেয়ি। যার চরম পরিণতি বিশ্বযুদ্ধ।

রোজা মনে করতেন, under consumption (যথোপযুক্ত ভোগের ক্ষমতার অভাব) পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্য। পুঁজিবাদ ক্রমশ: প্রসারিত হয়। নিজের সীমারেখার বাইরে অর্থনৈতিক সেক্টরদের গ্রাস করে। তা সুদূর এশিয়া আফ্রিকায় হোক, বা স্বদেশের ছোট, অ-পুঁজিবাদী অংশ হোক। সব কিছু আত্মস্থ করার পর পুঁজিবাদের সংকট প্রকট হয়ে উঠতে বাধ্য।

অস্ট্রিয়ার যুবরাজ এক জাতীয়তাবাদী সার্বের হাতে প্রাণ হারালে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এটা অবশ্য উপলক্ষ মাত্র। বহুদিন থেকে বারুদ জমা হচ্ছিল। কেবল একটি দেশলাই পড়ার অপেক্ষা। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ থামাতে পারল না উলটে আন্তর্জাতিকের শেষ ঘণ্টা বাজাল যুদ্ধ। প্যারি কমিউনের সময় থেকে বা আরও আগে থেকে, বাম দলদের স্লোগান ও বাণী ছিল, সব দেশের মজুর ভাই ভাই। শত্রু মালিক পক্ষ। সাধারণ সৈনিকরা উর্দি পরা শ্রমিক কৃষক। যুদ্ধের ডাক এলে তারা বন্দুক ঘোরাবে নিজেদের সেনাপতিদের দিকে।‍‌ বাস্তবে তা ঘটে নি। একমাত্র সার্ব বাম দল ও রাশিয়ার বলশেভিকরা বাদে আন্তর্জাতিকের প্রায় সব দল যুদ্ধবাজ ও অতিরিক্ত জাতীয়তাবাদী, যাকে বলে chauvinist হয়ে উঠল। দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না। ফ্রান্স ও ব্রিটেন দাবি করল তারা লড়ছে গণতন্ত্র ও আত্মরক্ষার জন্য। রাশিয়া জানাল, স্লাভ বৃহৎ শক্তি হিসাবে ক্ষুদ্র, স্লাভিক সার্বিয়াকে রক্ষা করা তাদের কর্তব্য। বলশেভিকরা যখন গোপন চুক্তি ফাঁস করে দিল তখন দেখা গেল রাশিয়া ও ব্রিটেনের পরিকল্পনা ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের একাংশ দখল করা। অন্য দি‍‌কে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা বলতে লাগল, মার্কস ত’ বলে গেছেন, জারিস্ট রাশিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা মানে প্রগতিশীল যুদ্ধ। অথচ মার্কস এ কথা বলেছিলেন বহুদিন আগে, সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে।

ফস্টার আন্তজার্তিকের বিপর্যয় ও পুনর্জীবনের প্রচেষ্টা বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করেছেন দক্ষ হাতে। মধ্যপন্থী, তথাকথিত ‘‘আড়াই আন্তর্জাতিকের জন্ম, যুদ্ধান্তে জার্মানিতে বিভিন্ন লড়াকু গোষ্ঠীর জন্ম — রাডেক ও ‘ব্রেমেন বাম’ রা, ‘‘আলোর রেখা’’, শপ স্টুয়ার্ডের দল। সর্বোপরি রোজা ও কার্ল লিবকনেখ্‌‍‌টের নেতৃত্বে পুরানো আন্তর্জাতিকের একাংশ - এসবই আমরা দেখতে পাই। জার্মান বিপ্লব প্রচেষ্টা বিফল হয়েছিল। শহীদ হ‍‌য়েছিলেন রোজা ও কার্ল। রেখে গিয়েছিলেন সংগ্রামের ঐতিহ্য।

দুই খণ্ড ‘‘আন্তর্জাতিক’’ যেমন তথ্যসমৃদ্ধ তেমনি সুপাঠ্য। বিশ্লেষণ ও ইতিবৃত্ত বর্ণনা উভয়ের মিশেল। আমাদের বুঝতে সাহায্য করে ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় পর্ব যার প্রভাব আজও মিলিয়ে যায়নি। যা আগামী দিনের দিশারী হ‍‌তে পারে।

আর সর্বশেষে শ্রমিক কবি ইউজিন পোতিয়ের অমর সংগীত —

চরম লড়াই জেন আজ,

এস সবে মিলি এক সাথে।

‘‘আন্তর্জাতিক’’ হয়ে যাবে

সারা মানবতা কাল প্রাতে।

History of the Three Inte

ationals, Biblia Publication, Kolkata, 2016. Price Rs 300/- per volume.

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement