বিনিয়োগের আহ্বান না দলের প্রচার,
বিজ্ঞাপনী ভিডিও দেখে বোঝা দায়!

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১২ই জুলাই— সেদিন কলকাতায় বন্‌ধ ডেকেছিল তৎকালীন বিরোধী দল কংগ্রেস। বন্‌ধ চলাকালীন হাজরা পার্কে মিছিল নিয়ে এসেছিলেন তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। ঐ মিছিল থেকেই উত্তেজনা ছড়ায়। আহত হন মমতা ব্যানার্জি। ঘটনার দিনই ছয়জনকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। প্রতিক্রিয়া জানান তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুও।

প্রায় আড়াই দশক আগের এই ঘটনা উল্লেখ করেই এবারের বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনের সরকারি বিজ্ঞাপন তৈরি করেছে মমতা ব্যানার্জির সরকার! সেই সরকারি বিজ্ঞাপনে রাজ্যে শিল্পের চেহারা কী, কর্মসংস্থানের চেহারা কী, কেন পশ্চিমবঙ্গ অন্য রাজ্যের তুলনায় আকর্ষণীয় গন্তব্য হবে উদ্যোগপতিদের কাছে তার কোনও ব্যাখ্যা, তথ্য উল্লেখ না থাকলেও ১৯৯০ সালের আগস্টের এই ঘটনা অনায়াসে ঠাঁই পেয়েছে বিশ্ববঙ্গ শিল্প সম্মেলনের সরকারি প্রচার ভিডিও-তে। সেই বিজ্ঞাপন বিভিন্ন চ্যানেলেও সম্প্রচারিত হচ্ছে!

১৯৯০সালের ১৬ই আগস্ট হাজরা পার্কের সেই ঘটনা। যার আগে ও পরে এই শহর, রাজ্যজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল তৎকালীন বিরোধী কংগ্রেসী বাহিনী। তবে ১৬ই আগস্টে হাজরা পার্কের ঘটনায় মমতা ব্যানার্জি ‘আক্রান্ত’ হয়েছিলেন, সেই স্থির চিত্র-ই সরকারি বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়েছে। শিল্পপতিদের কাছে বিনিয়োগের আদর্শ গন্তব্য পশ্চিমবঙ্গ কেন, তার বিবরণেই ঐ ছবি দেখিয়ে সরকারের দাবি সে সময় পশ্চিমবঙ্গ ‘আইনশৃঙ্খলাহীন রাজ্য’ ছিল। সরকারের বয়ান, ‘একদা আইনশৃঙ্খলাহীন রাজ্য ছিল যেখানে নেতা, নেত্রীদের জীবন সংশয়ে ছিল। এখন তা গোটা দেশে অন্যতম বিনিয়োগ-গন্তব্য রাজ্যে পরিণত হয়েছে। গত ছয়-বছরে ঐতিহাসিক জনরায়ে এক উদাহরণযোগ্য নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে তার পুনরুত্থান হয়েছে’। ব্যস, বিজ্ঞাপন শেষ, সরকারের দায়িত্বও! এরই মাঝে আড়াই দশক আগের হাজরা পার্কের সেই ঘটনায় মমতা ব্যানার্জির ছবি থেকে শুরু করে যাদবপুরে গত বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় মমতা ব্যানার্জির দলীয় মিছিলের ভিডিও-সবই রয়েছে এই থিম-অ্যাডে।

এই ভিডিও বা বিজ্ঞাপনকে অনায়াসে শাসক তৃণমূলের দলীয় বিজ্ঞাপন বলেও চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে ভোট প্রচারের সময়। তৃণমূলের পতাকা, তৃণমূলের মিছিল, মমতা ব্যানার্জির পদযাত্রা সবই মিলবে শিল্পপতিতের বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার জন্য তৈরি করা এই সরকারি ভিডিও-তে। তবে এই নিয়ে চতুর্থবারের জন্য বিপুল খরচে, মহা সমারোহে করা শিল্প সম্মেলন থেকে আদৌ কত বাস্তবোচিত বিনিয়োগ আসে তা নিয়ে রাজ্যের শিল্প মহলের বিশেষ কোনও যে উচ্চাশা নেই তা স্পষ্ট। এবার একধাপ এগিয়ে বলা হয়েছে, ; বেঙ্গল মিনস বিজনেস’। বাংলা মানে ব্যবসা। তবে গত ছয় বছরে রাজ্যবাসী কাছে এই ‘ব্যবসা’ মানে শাসক দলের তোলাবাজি ও ইমারতী দ্রব্যের সিন্ডিকেটের কারবার। মমতা ব্যানার্জি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আগে অর্থাৎ ২০১১ সালের মে মাসের আগে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগে প্রস্তাব এসেছিল ৩লক্ষ ২হাজার ৫১৫ কোটি টাকার। গোটা দেশের বিচারে এরাজ্যের স্থান তখন দ্বিতীয়, মোদীর গুজরাটের চেয়েও এগিয়ে তখন পশ্চিমবঙ্গ। সেখানে চতুর্থ শিল্প সম্মেলনের আগে রাজ্যের কাছে বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে মাত্র ৩৭৬৬ কোটি টাকার মতো, দেশের মোট বিনিয়োগের প্রস্তাবের মাত্র ১শতাংশ।

তবে সেসবের উল্লেখের কোনও বালাই নেই। বামফ্রন্ট সরকারের সময় পশ্চিমবঙ্গ ‘ আইনশৃঙ্খলাহীন রাজ্য’ ছিল বলে দাবি করে বোঝানো হয়েছে এখন এখানে আইনের শাসন। এন সি আর বি-র রিপোর্ট থেকে শুরু করে জাতীয় মহিলা কমিশন, মানবাধিকার কমিশনের একের পর এক পর্যবেক্ষণেই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার ভয়াবহ চিত্র কার্যত প্রতিদিনই সামনে আসছে। যদিও তা এড়িয়ে নিজের ওপর ‘হামলা’র ঘটনার ছবি দেখিয়ে যে রাজ্যে শিল্প সম্মেলন করতে হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রীকে সেখানে সেই সম্মেলন আদৌ উদ্যোগপতিদের কাছে কতটা ‘আকর্ষণীয়’ হবে তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।একই সঙ্গে হাজারো বিতর্ক, আদালতে বিচারাধীন হওয়া সত্ত্বেও ভাইপো সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির মালিকানাধীন সেই ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগোই ব্যবহৃত হয়েছে বিশ্ববঙ্গ শিল্প সম্মেলনের জন্য।

Featured Posts

Advertisement