রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রির চক্রান্ত
রোখার ডাক বিমাকর্মীদের

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১২ই জানুয়ারি— বিমাক্ষেত্র সহ দেশের লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে বিক্রির চক্রান্ত রোখার ডাক দিলেন বিমা কর্মচারীরা। সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিমা প্রিমিয়ামের ওপর থেকে জি এস টি প্রত্যাহারের দাবিও জানালেন তাঁরা। শুক্রবার থেকে শুরু হলো পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সাধারণ বিমা কর্মচারী সমিতির ত্রয়োদশ সম্মেলন। সম্মেলন থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে শামিল হওয়ার শপথ নিলেন বিমা কর্মচারীরা। সম্মেলন উদ্বোধন করে সি আই টি ইউ সর্বভারতীয় নেতা শ্যামল চক্রবর্তী বলেন, শুধু বিমা কর্মচারীদের ওপরেই নয়, আক্রমণ নেমেছে প্রতিটি আর্থিক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রেই। দেশের সাধারণ মানুষই এতে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ লুটপাট হয়ে যাচ্ছে, কাজ হারাচ্ছেন বহু শ্রমিক কর্মচারী, বিরোধিতা করলেই জুটছে নিগ্রহ। এর বিরুদ্ধে গোটা দেশে বাম গণতান্ত্রিক জোটকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এভাবেই প্রতিরোধ বাড়াতে হবে আমাদের।

কলকাতার মৌলালি যুবকেন্দ্রে আয়োজিত এই সম্মেলনে পতাকা উত্তোলন করেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সাধারণ বিমা কর্মচারী সমিতির রাজ্য সভাপতি মৃণাল মিত্র। তিনিই এদিন সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য রাখেন বিমা কর্মচারী আন্দোলনের প্রবীণ নেতা চন্দ্রশেখর বসু, ১২ই জুলাই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক তপন দাশগুপ্ত, ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জয়দেব দাশগুপ্ত, জীবনবিমা পূর্বাঞ্চল জোন সম্পাদক জয়ন্ত মুখার্জি, সারা ভারত বিমা কর্মচারী সমিতির যুগ্ম সম্পাদক শ্রীকান্ত মিশ্র প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন সঞ্জয় ঝা, ভি ভি এস রাজু,অনুপ চক্রবর্তী,সতীনাথ সিনহাসহ অন্যান্যরা। সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদন পেশ করেন সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক তপন মিত্র। সম্মেলন চলবে রবিবার পর্যন্ত। শনিবার বক্তব্য রাখবেন সারা ভারত বিমা কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ভি রমেশ। সম্মেলন স্থলের নাম হয়েছে কমরেড সুকোমল সেন নগর। মঞ্চ হয়েছে কমরেড বিনয়ভূষণ আইচের নামে।

দেশ জুড়ে লড়াই আন্দোলনের আহ্বান জানিয়ে শ্যামল চক্রবর্তী এদিন বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের থাবার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। বিমা কর্মচারীরা সেই আন্দোলনেই রয়েছেন। আমাদের রাজ্যে বি পি এম ও জোরদার আন্দোলনে নেমেছে। সারা ভারতেই শ্রমিক কর্মচারীরা তাঁদের দাবি দাওয়ার ভিত্তিতে আন্দোলন করছেন। বহু মানুষ এসেছেন আমাদের সংগঠনের শরিক হয়ে। বামপন্থীরা মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু তাই নয়, আজ কৃষক, দলিত, আদিবাসীরাও গোটা দেশে জোটবদ্ধ হচ্ছেন। এভাবেই সংগঠনকে যত শক্তিশালী করা যাবে, ততই মানুষকে পাশে পাওয়া যাবে। এফ আর ডি আই বিল থেকে জি এস টি, নোটবন্দি- মোদি সরকার সবই করছে পুঁজিপতিদের স্বার্থে। শিল্পপতিরা টাকা ঋণ করবেন ব্যাঙ্ক থেকে, তা শোধ দেবেন না। সাধারণ মানুষকে সেই টাকা শোধ করতে হবে। শুধু তাই বি জে পি- তৃণমূলের মিলিত খেলায় সাম্প্রদায়িকতার নামে নানাভাবে লুন্ঠন প্রক্রিয়া জারি রয়েছে দেশ ও রাজ্যে। তৈরি করা হচ্ছে অশান্তি। এসবের প্রতিবাদেই আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।

সম্মেলনে চন্দ্রশেখর বসু বলেন, শুরু হয়েছিল স্বল্প পরিসরে। বিমা কর্মচারীদের এই আন্দোলন এখন যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সরকারের নানা চক্রান্তমূলক নীতির সঙ্গে লড়াইয়ে কোনও আপস নয়, আমরা বুক চিতিয়ে এগিয়ে যাব। তপন দাশগুপ্ত বলেন, একটা সর্বগ্রাসী আক্রমণ চলছে চারদিক থেকে। মূল উদ্দেশ্য সম্পদ লুট করা। সাধারণ মানুষের টাকা, মাটির ওপরের সম্পদ, প্রাকৃতিক- খনিজ সম্পদ- সব চলে যাচ্ছে আম্বানি- আদানিদের দখলে। পুঁজিপতিদের দখলে। ফলে মানুষ আরও বেশি করে কাজ হারাবেন ভবিষ্যতে, শুধু মুনাফা লুটবে পুঁজিপতিরা, বিদেশিরা। আর তা করতে গেলে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা জরুরি। ফলে সাম্প্রদায়িকতাকে আরও বেশি করে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা চলেছে। বিরোধীতা করলেই খুন হতে হচ্ছে। এরই বিরুদ্ধে বামপন্থী শক্তিগুলি লড়ছে। এই লড়াইকে আরও ছড়িয়ে দিতে হবে।

সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জয়দেব দাশগুপ্ত বলেন, সামগ্রিকভাবে ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার ওপর আঘাত আসার ফলে গ্রাহকদের অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জমানো টাকা পয়সা ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের উদ্যোগ ব্যাঙ্ক কর্মচারীদেরও সর্বনাশ ডেকে আনছে। এফ আর ডি আই বিলের তীব্র বিরোধীতা করেন তিনি। জয়ন্ত মুখার্জির বক্তব্য, সংকটকালে সবাইকে এক হয়ে এক ব্যাপক আন্দোলনে শামিল হতে হবে। সম্পাদকীয় প্রতিবেদন পেশ করে তপন মিত্র বলেন দেশের সাধারণ মানুষকে শামিল করে এক বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলাই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য। সংগঠনের নেতৃবৃন্দের প্রশ্ন, দেশের সরকার ও একই সঙ্গে রাজ্য সরকার ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেই প্রতিযোগিতার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, হিন্দুত্ববাদের নামে নিলামে চড়িয়েছে। শাসকের কর্তৃত্বই প্রধান হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সেইজন্যেই বোধ হয় স্বামী বিবেকানন্দের ছবির ওপরে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি থাকে। এসব কোন ধরনের অগ্রগতি? এই যে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেচে দেওয়া হচ্ছে- এটা কি ধরনের দেশপ্রেম? এই অনাচারের থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের। সেজন্য সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিতে হবে।

Featured Posts

Advertisement