বিদ্রোহ শীর্ষ আদালতে

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৩ই জানুয়ারি , ২০১৮

নয়াদিল্লি, ১২ই জানুয়ারি— শীর্ষ আদালতেই বিদ্রোহ।

দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনায় শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের কাজের ধারা নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করলেন শীর্ষ আদালতের চার বরিষ্ঠ বিচারপতি। একদিকে যখন সুপ্রিম কোর্টের শুনানি চলছে, তখনই বিচারপতি জে চেলমেশ্বরের বাসভবনে চার বিচারপতি বললেন, শীর্ষ আদালতে সবকিছু যথাযথভাবে চলছে না। গত কয়েক মাসে এমন অনেক কিছু ঘটেছে যা বিচারব্যবস্থার পক্ষে ভালো নয়। প্রধান বিচারপতির কাজের ধারায় অবাঞ্ছিত প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশ ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই মুখ খুলতে আমরা বাধ্য হচ্ছি। ‘গণতন্ত্র বিপন্ন’, এই স্পষ্ট হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা।

জে চেলমেশ্বর ছাড়াও ছিলেন বিচারপতি রঞ্জন গোগই, মদন বি লোকুর, কুরিয়ান যোশেফ। প্রধান বিচারপতিকে লেখা তাঁদের ক্ষোভের চিঠিও তাঁরা সংবাদমাধ্যমকে দিয়েছেন। অভিযোগের মূল তির প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের বিরুদ্ধেই। অভিযোগ, এমনভাবে মামলার বণ্টন হচ্ছে যা শীর্ষ আদালতের কর্মপদ্ধতির বিরোধী। তবে, চার বিচারপতির অভিযোগের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলী থেকে ইঙ্গিত, সরকারের তরফে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষে হস্তক্ষেপ হচ্ছে বলে তাঁরা মনে করছেন। চেলমেশ্বরের মন্তব্য ‘স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ছাড়া গণতন্ত্র টিকবে না’। কোথায় স্বাধীনতা বিপন্ন হচ্ছে, তা স্পষ্ট না করলেও এই বিচারপতিরা বলেছেন, দেশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ মামলাও এমন বেঞ্চে পাঠানো হচ্ছে যা অনভিপ্রেত। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এমন একটি মামলার কথা উল্লেখও করেছেন বিচারপতি গোগই। সোহরাবুদ্দিন ভুয়ো সংঘর্ষ মামলায় সি বি আই আদালতের বিচারপতি বি এইচ লোয়ার মৃত্যু যে তাঁদের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহের অন্যতম কারণ, তা বলেছেন তিনি।

এই চার বিচারপতিই প্রধান বিচারপতির পরে সুপ্রিম কোর্টের সবচেয়ে বরিষ্ঠ চারজন। আদালতের কাঠামোয় জে চেলমেশ্বর প্রধান বিচারপতির পরেই। তিনিই এদিন বলেন, ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এমন নজিরবিহীন ঘটনা কখনও ঘটেনি। এভাবে প্রকাশ্যে কথা বলা বেদনাদায়ক হলেও দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি। গত কয়েক মাসে অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটছে শীর্ষ আদালতে। আমরা প্রধান বিচারপতিকে চার মাস আগেই চিঠি দিয়েছিলাম। বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম সংশোধনাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হোক। কিন্তু আমাদের সেই প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টকে তার নিজের অবস্থান বজায় রাখতে হবে। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা না থাকলে গণতন্ত্রই বিপন্ন হবে। আজ সকালেও একটি নির্দিষ্ট অনুরোধ নিয়ে আমরা প্রধান বিচারপতির কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা প্রত্যাখ্যাত হয়েছি। তারপরে দেশবাসীর সামনে সমস্ত কথা জানানো ছাড়া আমাদের উপায় নেই। না হলে বলতে হয় আমাদের কোনও দায়ই নেই। চার মাস আগে একটি নির্দিষ্ট বিষয় নির্দিষ্টভাবে করার অনুরোধ নিয়ে আমরা চারজন প্রধান বিচারপতির কাছে গিয়েছিলাম। তা এমনভাবে করা হলো যার ফলে প্রতিষ্ঠানের সততা নিয়েই আরও প্রশ্ন উঠে গেছে।

বিচারপতিরা তাঁদের চিঠিতে বিশেষ করে প্রশ্ন তুলেছেন মামলা বণ্টন নিয়ে। তাঁরা বলেছেন, প্রধান বিচারপতি সমানদের মধ্যে প্রথম। কিন্তু সব গুরুত্বপূর্ণ মামলাই তাঁর নেতৃত্বাধীন বা তাঁর পছন্দের নির্দিষ্ট কিছু বেঞ্চে চলে যাচ্ছে, যা অনভিপ্রেত। কীভাবে এই দায়িত্ব বণ্টন হচ্ছে, তার কোনও যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। চিঠিতে তাঁরা লিখেছেন, বিড়ম্বনার হাত থেকে আদালতকে বাঁচাতেই তাঁরা কোনও মামলার উল্লেখ রাখছেন না। কোন স্তরের আদালতে কোন মামলা হবে, তারও কিছু নিয়ম রয়েছে, যা লঙ্ঘিত হচ্ছে। ইঙ্গিত, হাইকোর্ট বা নিম্ন আদালতের বিচারাধীন মামলাও সুপ্রিম কোর্টে টেনে এনে, বিশেষ বেঞ্চে নিয়ে গিয়ে নিষ্পত্তি করানো হচ্ছে।

এই সূত্রেই আবার এদিন সি বি আই আদালতের বিচারপতি লোয়ার মৃত্যুরহস্যের কথা সামনে এসেছে। তাঁর পরিবার কিছুদিন আগেই অভিযোগ করেছে, সোহরাবুদ্দিন মামলায় অভিযুক্তদের ছাড় দিতে তাঁকে প্রথমে উৎকোচের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করার পরে নাগপুরে গিয়ে মুম্বাইয়ের এই বিচারপতির মৃত্যু হয়। হৃদরোগকে কারণ হিসাবে দেখানো হলেও পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যু অস্বাভাবিক। এই অভিযোগ সামনে আসার পরে বোম্বে হাইকোর্টে তদন্ত চেয়ে আবেদন জমা পড়ে। সেই মামলা চলতে চলতেই সুপ্রিম কোর্ট এ সংক্রান্ত আরেকটি আবেদন নিয়ে শুনানি শুরু করেছে। বস্তুত শুক্রবার সেই মামলার শুনানিতে লোয়ার মৃত্যুকে ‘গুরুতর ব্যাপার’ বলে চিহ্নিত করা হলেও আইনজীবীদের আশঙ্কা, হাইকোর্টের বিচারপ্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করার জন্যই এই মামলা সর্বোচ্চ আদালতে টেনে আনা হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চে সেই মামলাও পাঠানো হয়েছে। সোহরাবুদ্দিন মামলায় অভিযুক্তদের অন্যতম বি জে পি সভাপতি অমিত শাহ নিজেই।

বিদ্রোহী চার বিচারপতি বলেছেন, আমরা কোনও রাজনীতি করছি না। সরাসরি সরকারের হস্তক্ষেপের কথাও তাঁরা বলেননি। কিন্তু ‘স্বাধীন’ বিচারব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেই তাঁরা ইঙ্গিত দিয়েছেন শীর্ষ আদালতের ভেতরে চাপ তৈরি করা হচ্ছে। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, প্রধান বিচারপতিকে ‘ইমপিচ’ করার কথা বলছেন কীনা। চেলমেশ্বর বলেন, ‘আমার মুখে কথা বসাবেন না’।

এই সাংবাদিক সম্মেলনের পরে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রথমে শোনা গিয়েছিল তিনিও সাংবাদিক সম্মেলন করে উত্তর দেবেন, তা অবশ্য এদিন হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আইন মন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন। শুক্রবার রাত পর্যন্ত সরকারি প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে অ্যাটর্নি জেনারেল কে ভেনুগোপাল সংবাদসংস্থা পি টি আই-কে বলেছেন, এই পরিস্থিতি এড়িয়ে গেলেই ভালো হতো। এখন বিচারপতিদের দেখতে হবে সর্বোচ্চ আদালতে কোনও ফাটল যেন না থাকে।

চার বিচারপতির ক্ষোভের এই বিস্ফোরণে বারংবার উঠে এসেছে ‘গণতন্ত্রের বিপদের’ কথা। মোদী সরকারের আমলে সর্বত্রই শাসকদল, সঙ্ঘ পরিবার, সরকারের সর্বোচ্চ স্তরের মুষ্টিমেয়ের ক্ষমতা প্রয়োগের অভিযোগ উঠছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক সংস্থা, গণমাধ্যমে এই ক্ষমতার চাপ ক্রমশ বাড়ছে বলে অভিযোগ। এরই মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অভিযোগে ইঙ্গিত মিলেছে সেখানেও চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement