গড়ে তুলতে হবে পরিস্থিতির
উপযোগী সংগঠন: মিশ্র

শান্তনু দে   ১৪ই জানুয়ারি , ২০১৮

জামুড়িয়া : ১৩ই জানুয়ারি— পরিস্থিতির উপযোগী সংগঠন গড়ে তোলার শপথে শেষ হলো সি পি আই (এম) পশ্চিম বর্ধমান জেলা ২৪-তম সম্মেলন। শনিবার সম্মেলনের সমাপ্তিতে পার্টির রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র বলেন, পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। সেই গতির সঙ্গে আমাদের তাল রাখতে হবে। মানুষ যতটা প্রস্তুত আছেন, পরিস্থিতির মধ্যে যেটুকু স্বতঃস্ফূর্ততা আছে, কোথাও আমরা পিছিয়ে থাকলে, গতি বাড়িয়ে তাকে ধরতে হবে। পরিস্থিতির উপযোগী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। সম্মেলনে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মদন ঘোষ বলেন, এই পরিস্থিতিতে শ্রেণি ও গণআন্দোলন বিকশিত করা ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনও রাস্তা নেই।

জামুড়িয়ার নজরুল মঞ্চে সম্মেলন শুরু হয়েছিল বৃহস্পতিবার। বিদায়ী সম্পাদকের পেশ করা খসড়া রাজনৈতিক সাংগঠনিক প্রতিবেদনের উপর ৫৬ জন প্রতিনিধি সাড়ে আট ঘণ্টার বেশি আলোচনা করেন। শেষে এদিন নতুন জেলা কমিটি নির্বাচনের শেষে ভাষণে সূর্য মিশ্র বলেন, সংকট চলছে। সর্বহারা, আধা-সর্বহারা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, আরও বাড়বে। আবার এর মধ্যে রয়েছে সম্ভাবনাও। দরকার বিষয়ীগত প্রস্তুতি। যত দ্রুত আমরা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছি, তাদের সংগঠিত করতে পারছি, ততই আমরা এই সম্ভাবনাকে সদ্ব্যবহার করতে পারব। আর তা না পারলে, আমাদের জড়তা, আমাদের আড়ষ্টতার জন্য তাকে ব্যবহার করবে ফ্যাসিবাদীরা, উগ্র প্রতিক্রিয়ার শক্তি। তিনি বলেন, আমরা চার আক্রমণের মুখোমুখি। জীবন-জীবিকার উপর আক্রমণ, গণতন্ত্রের উপর আক্রমণ, ধর্মনিরপেক্ষতা মেহনতি মানুষের ঐক্যের উপর আক্রমণ এবং সার্বভৌমত্বের উপর আক্রমণ। একে মোকাবিলা করতে হলে দরকার চার হাতিয়ার। মতাদর্শ, রাজনীতি, সংগঠন এবং সংগ্রাম। কোনও একটি হাতিয়ারকে ব্যবহার করলে হবে না। একইসঙ্গে চারটিকে শান দিতে হবে।

রাজ্যের পরিস্থিতি সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে মিশ্র বলেন, তৃণমূলকে এখান থেকে অপসারণ করতে না পারলে বি জে পি-র বিরুদ্ধে লড়াই অসম্ভব। আবার দিল্লিতে বি জে পি-কে পরাস্ত করতে না পারলে ওদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। আর এখানে কোনও হেঁয়ালি নেই। একইসঙ্গে দুইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই। যেমন লেনিন বলেছিলেন, ‘টুইন-হেডেড মনস্টার্স’, যমজ মস্তিষ্কের দৈত্য, আমরা বলতে পারি, দুমুখো সাপ। আসলে সাপ একটাই। এখানে তাই আছে রামও, আছে রামভক্ত হনুমানও। সূর্য মিশ্র এদিন কার্ল মার্কসের সময় উনিশ শতকের পুঁজিবাদ থেকে বিশ শতকের পুঁজিবাদ হয়ে আজকের পুঁজিবাদের চরিত্র বিশদে ব্যাখ্যা করেন। বলেন, আজকের পুঁজিবাদের চরিত্র হলো ধান্দার ধনতন্ত্র। উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব প্রধান চরিত্র নয়। প্রধান চরিত্র হলো বেপরোয়া লুট। স্রেফ ফাটকা। যাকে বলা হচ্ছে ক্যাসিনো ক্যাপিটালিজম। পুঁজির থেকে পুঁজি। মাঝখানে কোনও শিল্প নেই, কলকারখানা নেই। তাই ছাঁটাই, কর্মচ্যুতির বিকাশ। দুনিয়াজুড়েই চলছে এই ধান্দার ধনতন্ত্র। যেমন এখানে চিট ফান্ড। নোট বাতিল, জি এস টি-র পর এখন এফ আর ডি এ বিল। নতুন কথা শোনানো হচ্ছে, টাকা রাখলে ঝুঁকি আপনাকেও নিতে হবে। এখন আর বেইল আউট না, বেইল ইন। চুঁইয়ে পড়া অর্থনীতির তত্ত্ব ট্রিকেল ডাউন নয়, ট্রিকেল আপ। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির পরিবর্তনগুলিকে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। এর জটিলতা, এর বাস্তবতা, এর মধ্যে থাকা সম্ভাবনার উপাদানগুলিকে ধরতে না পারলে আমরা এগতে পারব না।

‘কোথায় আমাদের অগ্রাধিকার’ দেওয়া উচিত, সেকথা ব্যাখ্যা করে মদন ঘোষ বলেন, অগ্রাধিকার হবে সেখানে, যেখানে আমাদের শ্রেণির প্রতিনিধি বেশি। যেমন শহরে বস্তি এলাকা, গ্রামে গরিব এলাকা, তফসিলি জাতি-উপজাতি প্রধান তল্লাট। গুরুত্ব দিতে হবে পার্টি শিক্ষা, মতাদর্শগত চর্চায়। শাখাস্তরে বাড়ানো দরকার রাজনৈতিক আলোচনা, যৌথ পাঠের পরিবেশ। তিনি বলেন, শ্রমজীবী জনগণের ইস্যুগুলি নিয়ে আন্দোলনে আরও জোর দিতে হবে। সহজ ভাষায় বলতে হবে, আগে পেটের লড়াই, ভাতের লড়াই। এই শ্রেণি ঐক্যেই বিভেদের বিষকে আমরা পরাস্ত করতে পারব। আঘাত হানতে হবে শত্রু শিবিরের দুর্বল এলাকায়।

জবাবি ভাষণে গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জিও জঙ্গি আন্দোলনের উপর গুরুত্ব দেন। বলেন, যেখানে আমরা জঙ্গি আন্দোলন করতে পারব না, সেখানেই বাড়বে ফ্যাসিস্তসুলভ আক্রমণ। সম্মেলন পরিচালনা করেন বীরেশ মণ্ডল, বিবেক চৌধুরি, নুরুল ইসলাম, জি কে শ্রীবাস্তব, শান্তি মজুমদারকে নিয়ে গঠিত সভাপতিমণ্ডলী।

Featured Posts

Advertisement