বিচার ব্যবস্থায় অশনিসংকেত

যে কোনও প্রতিষ্ঠান, তা সেটা সাধারণ হোক বা সাংবিধানিক, তার অভ্যন্তরে কাঠামোগত বা পরিচালনগত কিছু সমস্যা থাকে। অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সেইসব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা হয়। অনেক সমস্যা মিটে যায় আর কিছু কিছু থেকেও যায়। কিন্তু যদি কোনও কারণে সমাধানের সদিচ্ছার অভাব থাকে তাহলে সমাধান তো দূরের কথা উলটে সমস্যা জটিল থে‍‌কে জটিলতর রূপ নিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে তেমন অবস্থাই হয়েছে। শীর্ষ আদালতের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা নিয়ে মতবিরোধ এমনভাবে প্রকাশ্যে চলে এসেছে যে, যা স্বাধীন ভারতের ইতিহা‍‌সে একেবারেই অভূতপূর্ব। প্রধান বিচারপতির পরে সবচেয়ে বরিষ্ঠ ও অভিজ্ঞ চার বিচারপতি রীতিমতো সাংবাদিক সম্মেলন করে শীর্ষ আদালত পরিচালনায় প্রধান বিচারপতির ভূমিকার প্রতি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতির কাজের ধারা‍‌কে তাঁরা কার্যত রীতি বহির্ভূত ও অনৈতিক বলে আখ্যা দিতেও দ্বিধা করেননি। এই ঘটনা বিশ্বের ‘বৃহত্তম’ গণতন্ত্রের শীর্ষ আদালতের মান-মর্যাদার পক্ষে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং আদালতের ওপর দেশবাসীর আস্থা ও বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। মানুষ ন্যায়বিচার ও সত্যের জয়ের জন্য শেষপর্যন্ত শীর্ষ আদালতের ওপরই নির্ভর করেন। সেই শীর্ষ আদালতের অভ্যন্তরের অনভিপ্রেত বিষয়গুলি জনসমক্ষে আসায় মানুষের আস্থা কতটা অটুট থাকবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়।

চার বরিষ্ঠ বিচারপতির অভিযোগ মামলা বণ্টনের ক্ষেত্রে বরাবরের প্রতিষ্ঠিত রীতিকে অস্বীকার করে পছন্দমতো বা খুশিমতো বণ্টন করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ মামলা বিশেষ করে যেসব মামলায় শাসকদলের বা সরকারের লোকজন জড়িত সেইসব মামলাগুলি চলে যাচ্ছে বাছাই করা কয়েকজন বিচারপতির কাছে। এমনকি প্রধান বিচারপতি নিজেও সেইসব বেঞ্চে অনেক ক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছেন। তেমনি বিচারপতি নিয়োগের প্রশ্নেও নিয়মনীতি অনুসরণ হচ্ছে না বলে তারা অভিযোগ করেন। পাশাপাশি তাঁরা এটাও জানিয়েছেন এভাবে প্রকাশ্যে বলতে তাঁরা চাননি। অনেক আগেই তাঁরা লিখিতভাবে সবকিছু প্রধান বিচারপতিকে জানিয়েছিলেন। মৌখিকভাবেও বিভিন্ন সময় তাদের ভিন্নমতের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু তাতে আমল দেওয়া হয়নি। তাঁরা মনে করেন যেভাবে শীর্ষ আদালত চলছে এবং চালানো হচ্ছে তাদের দেশের সাংবিধানিক গণতন্ত্র বিপদের মুখে। গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ বিচার ব্যবস্থা। সেটাই যদি পথভ্রষ্ট হয় তাহলে গণতন্ত্রের বিপন্নতা অনিবার্য। এই ভাবনা থেকেই বিচারপতিরা প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন ব‍‌লে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন। তাঁদের মতে দেশবাসীর কাছে এটা তাঁদের দায় বলে মনে হয়েছে।

শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির প্রতি বরিষ্ঠ বিচারপতিদের এই অনাস্থা যে পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে তাতে অবিলম্বে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সমাধানের রাস্তা খোঁজা জরুরি হয়ে পড়েছে। এটাও ঠিক প্রধান বিচারপতির সব কাজ অন্য বিচারপতিরা সমর্থন করবেন এমনটা নাও হতে পারে। কিন্তু বর্তমান প্রধান বিচারপতির কাজের সঙ্গে মতানৈক্য এতটা বেশি যে, তা কার্যত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিয়েছে। এরই সঙ্গে এমন অভিযোগও সূক্ষ্মভাবে উঠে এসেছে যে, আদালতের কর্মধারার ওপর সরকারের চাপ বাড়ছে। এই চাপের কারণেই কি প্রধান বিচারপতির কাজের ধারা বদলে যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। আদালতের সঙ্গে সরকারের বিরোধ অতীতে বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে। সরকার যেমন বিচার ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে তেমনি আদালতের বিরুদ্ধে অতি সক্রিয়তার অভিযোগও উঠেছে। কিন্তু সে সব এতদূর পর্যন্ত গড়ায়নি। মোদী সরকার গঠনের পরই সমস্যাগুলি নতুন মাত্রা পাচ্ছে। এই সরকার তাদের হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সর্বত্র সঙ্ঘ পরিবারের লোকজনদের বসাচ্ছে। উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগের কর্তৃত্বও নিজেদের হাতে নিতে চাইছে। এই অবস্থায় বিচার ব্যবস্থার স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা বিপন্ন হবার আশঙ্কা প্রকট। বর্তমান সংকট তারই বহিঃপ্রকাশ নয় কি?

Featured Posts

Advertisement