গ্রেপ্তার সাত কর্মী, কোচবিহার
পৌরসভায় কোটি কোটি টাকা
দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি

নিজস্ব সংবাদদাতা

কোচবিহার, ১২ই ফেব্রুয়ারি — তৃণমূল পরিচালিত কোচবিহার পৌরসভার কুণ্ডু পরিবারের মৌরসিপাট্টায় এবার প্রথম আঘাত লাগল। কোটি কোটি টাকার দুর্নীতিতে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে হাইকোর্টে মামলা চলছে। ১৪ই ফেব্রুবারি আদালতে সেই মামলার শুনানি হবে। তার আগেই কোচবিহার কোতোয়ালি থানা হঠাৎই তৎপর হয়ে রবিবার গভীর রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে পৌরসভার সাত কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলে এদিন। ধৃতদের মধ্যে তিন ইঞ্জিনিয়ার ও অন্য চার কর্মচারী রয়েছেন। পুলিশের বয়ান অনুযায়ী দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত প্রাক্তন চেয়ারপার্সন রেবা কুণ্ডু তাঁর ছেলে তথা কাউন্সিলর শুভজিৎ কুণ্ডু নাকি তল্লাশির আগেই গা ঢাকা দিয়েছে। এদিন পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। দুর্নীতির মামলার মূল অভিযুক্ত প্রাক্তন চেয়ারপার্সন রেবা কুণ্ডু ও তার ছেলে শুভজিৎ কুণ্ডুসহ পৌরসভার দুই আধিকারিককে পুলিশ ইচ্ছে করেই গ্রেপ্তার করেনি বলে অভিযোগ।

কোচবিহারের জনৈক নাগরিক পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারপার্সনসহ চারজনের বিরুদ্ধে কোচবিহার জেলা আদালতে দুর্নীতির মামলা দায়ের করেন। কিন্তু পুলিশ দ্রুততার সাথে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না করায় তিনি হাইকোর্টের দারস্থ হন। একই সাথে জেলা আদালতে দুর্নীতির মামলা চলছে। এদিকে কাজ না করিয়ে কোটি কোটি টাকা তুলে নেবার অভিযোগে পৌরসভার বিরোধী বামপন্থী কাউন্সিলররা ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। আন্দোলনের চাপে জেলাশাসকের নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। যদিও সেই তদন্ত রিপোর্ট আজও প্রকাশ্যে আসেনি।

তৃণমূলের রাজ্য ও জেলা নেতৃত্ব দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত চেয়ারপার্সন ও তার কাউন্সিলর ছেলেকে বাঁচাতে চেষ্টার কোন ঘাটতি রাখেনি। কিন্তু দুর্নীতিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাওয়া চেয়ারপার্সনকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ভুষণ সিং-কে চেয়ারম্যান করা হয়। চেয়ারম্যান ক্ষমতায় এসেও তার পূর্বসূরির দুর্নীতি নিয়েও তদন্তের পথে হাঁটেননি। অথচ তৃণমূলের বর্তমান চেয়ারম্যান মানছেন কোচবিহার পৌরসভার প্রায় ৫০কোটি টাকার কোন হিসাব নেই। পৌরসভার আধিকারিকরা জানান, তছরুপের অঙ্ক আরও বাড়বে। বর্তমান চেয়ারম্যান কিন্তু অভিযোগের তীর ছুঁড়ছেন অপসারিত চেয়ারপার্সনের দিকেই। অভিযোগ গরমিলের সঙ্গে যুক্ত হিসাবরক্ষকও। বিভিন্ন খাতে আয়ের বহু টাকাই নাকি পৌরসভার তহবিলে জমা পড়েনি। অথচ যারা টাকা দিয়েছেন তাদের কাছে পৌরসভার দেওয়া রসিদ রয়েছে।

পৌরসভা সূত্রেই জানা গেছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে আয় ব্যায়ের কোন নথিপত্রই নাকি পৌরসভায় নেই। নতুন একজন হিসাবরক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। তবুও হিসাব মিলছে না। তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে টাকার অঙ্ক ঠিক কত সেটা স্পষ্ট হবে। পৌরসভার যিনি হিসাবরক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন তার নামেও হাইকোর্টে দুর্নীতির মামলায় রয়েছে। হিসাবরক্ষক কনকেন্দ্র দাস দুর্নীতি মামলা হাইকোর্টে যাবার পরেই গাঢাকা দেন। হিসাবরক্ষক দিনের পর দিন কোষাগারে জমা দেননি।

ধৃতদের এদিন কোচবিহার আদালতে তোলা হলে অভিযুক্তের পক্ষের আইনজীবী জামিনের আবেদন করেন। বিচারক জামিন না মঞ্জুর করে জেল হেপাজতের নির্দেশ দেন। আগামী ২০শে ফেব্রুয়ারি ধৃতদের ফের আদালতে তোলা হবে। এদিন বর্তমান চেয়ারম্যান ভূষণ সিং-কে আদালত চত্বরেই দেখা যায়। এদিকে দুর্নীতির মামলায় সাতজন কর্মীকে গ্রেপ্তারের পর সোমবার তৃণমূল পরিচালিত কর্মী ইউনিয়ন পৌরসভা বন্ধ করে দেয়। পৌরসভার বিরোধী দলনেতা মহানন্দ সাহা সোমবার বলেন, কোচবিহার পৌরসভা দুর্নীতির আখড়া। বছরের পর বছর ধরে পুকুর চুরিতে লাভবান হয়েছে কুণ্ডু পরিবার। এখনও দুর্নীতি চলছে। স্পেশ‌্যাল অডিট হলে দুর্নীতির প্রকৃত চেহারা প্রকাশ্যে আসবে।

জেলা বামফ্রন্টের আহ্বায়ক তারিণী রায়, সি পি আই (এম) জেলাসম্পাদক অনন্ত রায় এদিন প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির পিছনে থাকা রাঘববোয়ালদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি দিতে হবে।

Featured Posts

Advertisement