জেলায় কয়কশো মৃত ব্যক্তির
আকাউন্টে সরকারি প্রকল্পের টাকা

পার্থ ভট্টাচার্য   ১৩ই ফেব্রুয়ারি , ২০১৮

জলপাইগুড়ি, ১২ই ফেব্রুয়ারি — মৃত ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে সরকারি প্রকল্পের টাকা জমা পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে জলপাইগুড়ি জেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায়। জেলার রাজগঞ্জ, ময়নাগুড়ি এবং ধূপগুড়ি ব্লকের ৪৪টি গ্রাম পঞ্চায়েতে সামাজিক নিরীক্ষণে কয়েকশো মৃত ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে সরকারি প্রকল্পের টাকা জমা পড়ার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পেয়েছে জেলা পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তর। এ ছাড়াও ১০০দিনের কাজের জব কার্ডের হদিশ মেলেনি বেশ কিছু গ্রামীণ এলাকায়। ঘর নির্মাণে নগদ অর্থ নিয়ম বিরুদ্ধভাবে নেওয়ার মতো অনেক অভিযোগও মিলেছে। ভুক্তভোগী গ্রামবাসীরা অনেকেই লিখিত অভিযোগ করার সাহস পাননি। তবে সামাজিক নিরীক্ষণ দলের কাছে ভিডিও ক্যামেরায় নিজেদের অভিযোগ রেকর্ড করেছেন তারা।

জেলার মাল, মাটিয়ালি, নাগরাকাটা ব্লকের গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির সামাজিক নিরীক্ষণের কাজ শারদোৎসবের আগে সম্পন্ন হলেও বাস্তব চিত্রে কোনও বদল ঘটেনি। জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের এখনও এই সামাজিক নিরীক্ষণের কাজ করেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর। রাজগঞ্জের ১২টি, ধূপগুড়ির ও ময়নাগুড়ির ১৬টি করে মোট ৪৪টি গ্রাম পঞ্চায়েতের সামাজিক নিরীক্ষণের কাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে। জেলার মোট ৮০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে মাত্র ৪৪টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় এই নিরীক্ষণের কাজ করা হলেও বাকিগুলির কাজ কবে হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমানসে।

সরকারি প্রকল্পে পঞ্চায়েত এলাকায় বিধবা ভাতা ও বার্ধক্য ভাতা (৬০বছর) এবং তার ঊর্ধ্বে মাসিক ৬০০ টাকা এবং ১ হাজার টাকা করে উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। কিন্তু সামাজিক নিরীক্ষণে পঞ্চায়েতগুলির অধিকাংশ উপভোক্তাদের বাড়ি গিয়ে মৃত ব্যক্তির তথ্য মিলেছে। কয়েকশো গ্রামবাসী বেশ কয়েকমাস আগেই মারা গিয়েছেন। কিন্তু তাদের সেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়নি। মারা যাওয়ার কয়েক মাস পরেও সেই সমস্ত মৃত ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন ভাতার সরকারি প্রকল্পের টাকা জমা হচ্ছে। অথচ অগণিত উপভোক্তা যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও এই ধরনের সামাজিক সহায়তা প্রকল্পের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য-সদস্যারা সব জেনেও ব্লক অফিসে কিছুই জানাননি। ফলে সেই অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করা হয়নি। জেলা পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তর এই বিষয়ে ব্লকগুলিকে মৃত ব্যক্তিদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলি বন্ধ করার নির্দেশ পাঠালেও তা আজও বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ।

অন্যদিকে, জলপাইগুড়ি জেলায় ১০০দিনের কাজের প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ধরা পড়েছে। উদাহরণ হিসাবে, ১০০দিনের কাজের প্রকল্পে মজুরি প্রদান করে শ্রমদিবস তৈরি করা হলেও বহু পঞ্চায়েতেই খুবই নিম্নমানের সামাজিক বনসৃজনের কাজ হয়েছে। এই কাজের টাকা কেন কীভাবে তছরুপ করা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। বহু উপভোক্তার কাছে নিজের জব কার্ড নিরীক্ষণের সময় পায়নি সমীক্ষক দলটি। মজুরি পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ উঠে এসেছে। আরও জানা গিয়েছে যে, প্রতি সপ্তাহের বুধবার প্রত্যেক গ্রাম পঞ্চায়েতে ১০০দিনের প্রকল্পের সুবিধা জানাতে গ্রাম স্বরোজগার যোজনা দিবস উদ্‌যাপন করার কর্মসুচিকেও অধিকাংশ পঞ্চায়েতই পালন করছে না। এই ছাড়া সরকারি নিয়ম মেনে পঞ্চায়েত এলাকার কাজের খতিয়ান সাইনবোর্ডে বা নোটিস করে জনসমক্ষে তুলে ধরা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ। এমনকি অভিযোগ করার জন্য যে বক্স পঞ্চায়েত অফিসগুলিতে থাকার কথা সেই বক্সও রাখা হচ্ছে না।



কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েতের অভিযোগের নমুনা তুলে ধরা হলো। ধূপগুড়ি ব্লকের ঝাড় আলতা ১নং গ্রাম পঞ্চায়েতের সরকারি কাজের ৯০শতাংশের নথিপত্র বা হিসাবের কাগজপত্র সঠিকভাবে নিরীক্ষণের সময় মেলেনি বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এক পদস্থ কর্তা জানিয়েছেন। চামুর্চি গ্রাম পঞ্চায়েত ও রাজগঞ্জের কুকুরজান গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা প্রকল্পে ঘর বানিয়ে দেবার জন্য ১০ হাজার টাকা নিয়ম বহির্ভূতভাবে নেওয়ার অভিযোগও পেয়েছে সংশ্লিষ্ট দলের আধিকারিকেরা। এদিকে পঞ্চায়েত নির্বাচন এগিয়ে আসছে। সে কারণেই গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির সামাজিক নিরীক্ষণ করে তলবিসভা ডেকে অভিযোগ মেটানোর চেষ্টা চালাচ্ছে শাসকদল। কিন্তু সরকারি প্রকল্পের অর্থে সঠিক পরিষেবা কেন সাধারণ মানুষ পাননি তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পদস্থ আধিকারিকরাই।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement