মুখ্যমন্ত্রীর নদীয়া সফরের
প্রাক্কালে তৃণমূলকর্মীসহ
তিনজন খুন, চাঞ্চল্য

নিজস্ব সংবাদদাতা   ১৩ই ফেব্রুয়ারি , ২০১৮

কল্যাণী, ১২ই ফেব্রুয়ারি — মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নদীয়ায় প্রশাসনিক বৈঠকের আগের দিনই এক তৃণমূল কর্মীসহ তিনজন খুন হলেন জেলায়। বেশ কয়েকদিন ধরেই চলছে সাজো সাজো রব। হেলিকপ্টারের ডানা ঝাপটিয়ে মহড়া। প্রশাসনের কর্তাদের ঘন ঘন বৈঠক। সাদা পোশাকের পুলিশের নিরাপত্তার বেষ্টনীতে মোড়া জেলা সদর কৃষ্ণনগর। মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রীর জেলা প্রশাসনিক বৈঠকের পর জনসভাও রয়েছে। ঠিক সেই সময়ে চাকদহে এক সাংস্কৃতিক মঞ্চে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা খুন করল এক যুবককে। মায়ের সঙ্গে চেয়ারে বসে চোখের সামনে বাবাকে খুন হতে দেখল বছর ১০এর সন্তান। গোটা ঘটনায় ফের বেআব্রু হয়ে গেল সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা।

চাকদহের খোসবাস মহল্লায় (কে ভি এম) রবিবার সকালে ছিল কলপান্ত ক্লাবের শীতকালীন বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। সন্ধ্যায় পুরস্কার বিতরণী ও এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাত তখন ১১টা ১০। মঞ্চে শিল্পী শেষপর্যায়ের গান গাইছেন। তখন সেখানে হাজির হয় তৃণমূলের আশ্রিত একদল দুষ্কৃতী। মদ্যপ অবস্থায় ওরা গালিগালাজ করে গান থামাতে বলে। ক্লাবের সম্পাদক শান্তনু শীল মঞ্চ থেকেই বলে ওঠেন আমাদের অনুষ্ঠান প্রায় শেষ, কিন্তু তোদের কথায় গান বন্ধ করতে হবে নাকি? শিল্পী গান থামিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যান। সেই সময় সটান রিভলভার দিয়ে সকলের সামনেই অমন রায় (ওরফে কালু) শান্তনুকে গুলি করে। তাঁর বুকে লাগে ওই গুলি। মঞ্চেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। মঞ্চের সামনেই চেয়ারে ছেলে নিয়ে বসেছিলেন স্ত্রী সোমা। ছুটে যান তিনি। কোনরকমে শান্তনুকে নিয়ে প্রথমে যাওয়া হয় চাকদহ স্টেট জেনারেল হাসপাতালে। সেখান থেকে কল্যাণী মেডিক্যাল হাসপাতালে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শান্তনু-র মৃত্যু হয়। এলাকায় ভালো ছেলে বলে পরিচিত ছিলেন তিনি। একরোখা শান্তনু কিছুদিন আগেই এলাকায় মদের যে কারবার চলছে তার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। শান্তনুর স্ত্রী সোমা একনাগাড়ে কেঁদে বলে চলছেন, আমার স্বামীকে কালু আর হাম্পি (সুমন) মেরে দিল।

চাকদহ পৌরসভার চেয়ারম্যান দীপক চক্রবর্তীর খুবই কাছের মানুষ দুই ভাই হাম্পি ও কালু। এলাকার মানুষজন জানাচ্ছেন, এদের বাহিনী রীতিমতো সন্ত্রস্ত করে রেখেছে সাধারণ মানুষকে। চেয়ারম্যানের নিজের ওয়ার্ডে এই খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষ মুখ খুলেছেন, তাঁরা জানিয়েছেন কিছুদিন আগেই একটি ঘটনায় এই হাম্পি, কালুর দলবল চাকদহ থানার পুলিশকে পিটিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছিল। এখন ওরা আবার সদলবলে এলাকায় ঘোরাঘুরি করছে। পুলিশ সব জেনেও নির্বিকার। কালু, হাম্পি,বিশ্বনাথ, পুঁচকে, ঝ্যাঁকা বিশু-র নামে শান্তনুর স্ত্রী এই ঘটনায় অভিযোগ জানিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। শান্তনুর চাকদহ রেলগেটের কাছে একটি মোবাইল বিক্রির দোকান রয়েছে। এলাকার মানুষের কাছে জানা গিয়েছে, শান্তনু সম্প্রতি চাকদহের বিধায়ক রত্না ঘোষ গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর হাম্পিদের বিরাগভাজন হয় এতে। তাই ওঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো। তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বলি হলো আরও এক যুবক।

জেলায় দ্বিতীয় খুনটি হয়েছে হরিণঘাটায়। বালিন্দিতে নির্মীয়মাণ এইমসের কাছে সোমবার সকালে এক পুকুর থেকে মহিলার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পুকুরের পাড়ে পড়ে রয়েছে তাজা রক্তের দাগ। অজ্ঞাতপরিচয় ওই মহিলাকে (৩৫) গলার নলি কেটে খুন করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে অনুমান। তৃতীয়জনের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে হাঁসখালিতে। এখানকার চিত্রশালীতেও এক যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। নদীয়া জেলায় গত এক বছরে খুন, মহিলাদের শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ উত্তরোত্তর বেড়েছে। রাজ্যের আইনমন্ত্রী জেলার পুলিশসুপারকে ধমক দিয়ে তার কারণ জানতে চেয়ে দায় সেরেছেন সোমবারে কৃষ্ণনগরে রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক বৈঠকে। সোমবার প্রশাসনিক বৈঠকেরপর মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী জনসভা করবেন। তার সঙ্গে কিছু উদ্বোধন,আর কিছু ঘোষণা করার কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।

এদিন প্রশাসনিক বৈঠকে জেলায় ফি বছর ভাগীরথীর ভাঙনে স্যানালচরসহ বেশ কিছু এলাকার ক্ষতির কথা তুলতেই নিজের আসনে বসে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিধায়ককে তিনি বলেছেন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন তিনি করতে পারবেন না। বরঞ্চ তাঁকে একটি ‘খাল কাটার’ পরামর্শ দিয়েছেন। গরিব মানুষের সমস্যার নিরসনের উপায় না বাতলে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এই মশকরা করেছেন!

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement