সেনাদের চেয়ে দক্ষ সঙ্ঘ
ভাগবতের মন্তব্যে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৩ই ফেব্রুয়ারি , ২০১৮

নয়াদিল্লি, ১২ই ফেব্রুয়ারি- রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ দেশের সীমান্ত সমস্যা তিনদিনে মিটিয়ে দিতে পারে যা সেনাবাহিনীর করতে লাগে হয়তো ৬-৭মাস। এভাবেই সঙ্ঘের পেশি শক্তির দাপট জানালেন সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবত। রবিবার বিহারে সংগঠনের সভায় দীর্ঘ ভাষণে এই দাবি করেছেন ভাগবত। সঙ্ঘ সেনা বাহিনীকেই এভাবে খাটো করে সঙ্ঘের দাপট বোঝানোয় সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ভাগবত সে সভায় সম্প্রতি সীমান্তে ঘটে চলা সংঘর্ষ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, সঙ্ঘ নিজে সেনা প্রস্তুত করে তা রুখতে তিনদিনের বেশি সময় নেবে না যা দেশের সেনা বাহিনীর ৬-৭মাস লেগে যাবে। এরকমই আমাদের ক্ষমতা। তিনি আরও বলেন, দেশের জরুরি পরিস্থিতিতে দেশ রক্ষায় সংবিধান অনুমতি দিলে এই কাজে নেমে পড়তে সবসময় প্রস্তুত সঙ্ঘ। বিহারে মজঃফফরপুরে ৬দিনের শিবিরে ভাগবত তাঁর ভাষণে এভাবে উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলেছেন। তিনি জানান, সঙ্ঘ সেনা নয়, আধাসামরিক বাহিনী নয়। তবে তা একটা পারিবারিক সংগঠন। কিন্তু সঙ্ঘে শৃঙ্খলা রয়েছে যা একটা সেনা বাহিনীর মতোই। যদি দেশের প্রয়োজন হয় তার জন্য কর্মীরা খুশি মনে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। যদি সংবিধান অনুমতি দেয় তবে সীমান্তরক্ষায় নেমে পড়তে তারা প্রস্তুত।

সঙ্ঘ প্রধান ভাগবতের উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তোলা নতুন কিছু নয়। ইতিমধ্যে সঙ্ঘ দেশের সেনা বাহিনীর থেকে সেনার কাজ ভালোভাবে করতে পারে বলে যে বক্তব্য রেখেছেন তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি সেনাদের অবদান কার্যত খাটো করেই বলেছিলেন সেনার কাজ সহজেই করতে পারে সঙ্ঘ। সেনাবাহিনীকে কটাক্ষ করে তাঁর মন্তব্য, সেনারা তাদের কাজের জন্য এক পদ এক পেনশন দাবি তুলে ধরনায় বসে। কিন্থু সঙ্ঘ সেনার কাজ বিনা পয়সাতে করে দেবে। তাদের কোনও পেনশনও দিতে হবে না। এর আগে চড়া সুরে হিন্দুত্বের নানা ইস্যুতে জিগির তুলেছেন ভাগবত। এবারে উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলতে সেনা বাহিনীকে আক্রমণের নিশানা করল সঙ্ঘ। এদিকে সঙ্ঘের এই বক্তব্যে পুরো সমর্থন জানিয়েছেন কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী কিরেন রিজিজু। তিনি বলেছেন, সঙ্ঘ প্রধান ঠিকই বলেছেন। দেশের জরুরি অবস্থা হলে তাতে সেনাবাহিনীকে তার জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করতে ৬-৭মাস সময় লাগে। কিন্তু সঙ্ঘ সেই কাজ করতে তিন দিনের বেশি সময় নেবেনা। তার দাবি সঙ্ঘ দেশপ্রমিক সংগঠন বলেই তা এভাবে বলেছেন সঙ্ঘ প্রধান।

এদিকে সঙ্ঘ প্রধানের সেনাবাহিনীর ক্ষমতাকে খাটো করে দেখানোর এই মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন বিরোধীরা। সি পি আই (এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি সঙ্ঘের সমালোচনা করে টুইটারে বলেছেন, ‘এই কথা এসেছে ইউরোপ মডেলের ফ্যাসিস্তদের থেকে। যারা স্বাধীন ভারতে নিষিদ্ধ ছিল। গান্ধীজীর হত্যার ঘটনার পর প্রথম তাদের নিষিদ্ধ করেন সর্দার প্যাটেল।’ এই মন্তব্যের সমালোচনা করে কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন বলেছেন, সঙ্ঘ প্রধানের এই বক্তব্য খুবই নিম্ন মানের রুচির পরিচয় দেয়। এই মন্তব্য করার জন্য ভাগবতের ক্ষমা চাওয়া উচিত। তার এই বক্তব্যে সঙ্ঘের গোপন কর্মসূচি প্রকাশ হয়েছে। যেখানে তারা সেনাবাহিনীর সমান্তরাল বেসরকারি মিলিশিয়া বাহিনী তৈরি করতে চায়, যা দেশের ঐক্য সংহতিকে বিপন্ন করে তুলবে। তিনি বলেন, ভাগবতের এই বক্তব্য সংবিধানের মর্মবস্তু বিরোধী। আমরা সবসময় বলে আসছি সঙ্ঘ সংবিধানকে শ্রদ্ধা করে না। ভাগবতের এই মন্তব্য তাদের সংবিধানের অশ্রদ্ধার মনোভাব প্রমাণ করে দিয়েছে। সঙ্ঘ চায় ভারতকে মুসোলিনীর ইতালি এবং হিটলারের জার্মানি করে তুলতে। সঙ্ঘের হিন্দু সন্ত্রাসবাদী গড়ে তোলার যে আশঙ্কা আমরা করেছি তা সমান্তরাল বেসরকারি বাহিনী করার ঘোষণা থেকে পরিষ্কার। তিনি বলেন, ভাগবতের এজাতীয় অবমাননাকর মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্ঘ প্রধানের বক্তব্য নিয়ে সরকারের অবস্থান কী তা ব্যাখ্যা করা উচিত। এনিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তীব্র প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, এভাবে দেশের সেনা বাহিনীর দেশ রক্ষার অবদানকে খাটো করা উচিত নয়। সঙ্ঘ পরিবারের নিঃশর্তে এই মন্তব্যের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। কংগ্রেস দলের মুখপাত্র আনন্দ শর্মা সাংবাদিক সম্মেলন করেই জানিয়েছেন, সঙ্ঘ প্রধান সেনা বাহিনীর দেশের প্রতি অবদান ভুলে তার চরম অবমাননা করেছে। তা দেশের প্রতিটি নাগরিকের অপমান। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন সম্প্রতি জম্মু কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে সংঘর্ষে সেনাবাহিনীর জওয়ানদের প্রাণ হারানোর ঘটনা। তিনি বলেন, এরপরেও সেনা বাহিনী নিয়ে এই জাতীয় মন্তব্য ক্ষমাহীন অপরাধ। তিনি বলেন, দেশের বাইরের আক্রমণ মোকাবিলা করার দায়িত্ব রয়েছে সেনা ও অসামরিক বাহিনীর। আর কোনও বেসরকারি বাহিনীকে একাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি সংবিধানে। সঙ্ঘের এভাবে আগ বাড়িয়ে সেনার ক্ষমতাকে খাটো করে তার দায়িত্ব পালনের হুমকি দেওয়ায় সেনার ভূমিকাকে ছোট করা হয়েছে। এটা সেনার প্রতি চরম অবমাননাকর মন্তব্য। তিনি আরও জানান বিশ্বের ১৯০ দেশের মধ্যে খুব কম দেশ আছে যাদের দেশের মধ্যে সেনাবাহিনীর মতো বেসরকারি বাহিনী আছে। সঙ্ঘ কি এখন সেই বেসরকারি বাহিনী তৈরির কাজ করতে চলেছে।

এদিকে সমালোচনার মুখে এবারে ভোল বদল করছে সঙ্ঘ এবং বি জে পি। ত্রিপুরায় সঙ্ঘ মুখপাত্র রাম মাধব সোমবার বলেছেন, আমি জানি না উনি আসলে কি বলেছেন। তবে সঙ্ঘ দেশের সেনা বাহিনীকে শ্রদ্ধা করে এটা বলতে পারি। সেনার কাজ সঙ্ঘের তিন দিনে করা নিয়ে তাঁর মন্তব্য, এটা সঙ্ঘের তৎপরতা বোঝাতে বলা হয়েছে। বি জে পি-র সভাপতি অমিত শাহ এদিন সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, আমি এই বক্তব্য শুধু সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুনেছি। আসলে কী বলেছেন তা এখনও জানতে পারিনি। জানতে পারলে এনিয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement