কৃষি ‘জুমলা’

  ১৩ই ফেব্রুয়ারি , ২০১৮

চার বছর আ‍‌গে লোকসভা নির্বাচনের ইশ্‌তেহারে বি জে পি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য করা হবে চাষের ব্যয়ের দ্বিগুণ। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০১৪ সালের জুন মাসে দিল্লির মসনদে বসার পর সেই অর্থবর্ষের বাকি মাসগুলোর জন্য যে বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছিল তাতে অবশ্য ফসলের দাম নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য ছিল না। পরে ২০১৫-১৬ সালের বাজেটেও দেড়গুণ দাম করার বিষয়টি অন্তরালেই থে‍‌কে যায়। পরবর্তী বাজেটের আগে (২০১৬-১৭) উত্তর প্রদেশের বেরিলিতে ‘কিষান স্বাভিমান র্যানলি’-তে অনেকটা আচমকাই কৃষকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দরদ উথলে ওঠে। তিনি ঘোষণা করেন ২০২২ সালের মধ্যে তাঁর সরকার কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করার ব্যবস্থা করবে। লক্ষণীয় তাঁর সরকারের মেয়াদ ২০১৯ সাল পর্যন্ত। সেই মেয়াদের মধ্যে তিনি কি করবেন তা বলেননি। অথচ ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্ষমতায় এলে ফসলের মূল্য চাষের খরচের দেড়গুণ করবেন যাতে কৃষকরা লাভজনক দাম পান। স্পষ্টতই দায় এড়ানোর কৌশল। অর্থাৎ ঘু‍‌রিয়ে তিনি নতুন করে প্রতিশ্রুতি দিলেন ২০১৯ সালের নির্বাচনে ফের জিতলে তবেই ২০২২ সালের মধ্যে কৃষকের আয় দ্বিগুণ করবেন। প্রসঙ্গত ২০২২ সাল স্বাধীনতার ৭৫ বছর। ঘটা করে উদ্‌যাপনের লক্ষ্যে নতুন নতুন প্রতিশ্রুতির বন্যায় মানুষকে আরও কাছে টানতে চাইছেন। একাধারে ভুলিয়ে দিতে চাইছেন পাঁচ বছরে তাঁর করণীয় কাজ তথা প্রতিশ্রুতিগুলিকে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ সালের বাজেটে কৃষকের আয় বৃদ্ধি সংক্রান্ত পুনরুচ্চারিত করে। কিন্তু কার্যকরী কোনও পদক্ষেপ নেয় না। ইতিমধ্যে বিহার ও দিল্লিতে বি জে‍‌ পি-র পরাজয় ঘটে। কৃষকের দুর্দশা বাড়তে থাকে। অপর্যাপ্ত বৃষ্টির কারণে এমনিতেই উৎপাদন মার খেয়েছে। আবার ফসলের দাম না পেয়ে অসহায়তা আরও বেড়েছে। আকণ্ঠ ঋণের বোঝা নিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই কৃষকের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিক্ষোভ প্রতিবাদের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে থাকে। ১৮৪টি কৃষক সংগঠন জোট বেঁধে তৈরি করে সারা ভারত কৃষক সংঘর্ষ সমন্বয় কমিটি। রা‍‌জ্যে রাজ্যে চলতে থাকে বিক্ষোভ, লাগাতার অবরোধ। মধ্য প্রদেশে বি জে পি সরকার কৃষক বিক্ষোভ ঠেকাতে গুলি চালিয়ে আন্দোলনকারী কৃষকদের হত্যা করে। মহারাষ্ট্রে কৃষক অবরোধে অচলাবস্থা তৈরি। শেষে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন রাজ্য সরকার কৃষি ঋণ মকুবের কথা ঘোষণা করে। যদিও কার্যক্ষেত্রে সেটা নেহাতই নামমাত্র।

কৃষি‍‌তে এই দুরবস্থা আর সরকারের নীরবতা গ্রামীণ অর্থনীতি ও সমাজে বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি করে। গুজরাট নির্বাচনে তার প্রতিফলন ঘটে গ্রামে বি জে পি-র ব্যাপক হারে পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে। পরে রাজস্থানের উপনির্বাচনে তা আরও প্রকটভাবে প্রকাশ পায়। এই অবস্থায় ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে যাবার আগে মোদী সরকারের পক্ষে কৃষক দরদি হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। তা যেভাবেই হোক এবং যতরকমভাবেই হোক কৃষকদের মন পাবার চেষ্টা করতেই হ‍‌বে। তাই এবারের বাজেটে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে তেমনি অন্যান্য সামাজিক প্রকল্পেও বরাদ্দ বাড়িয়ে গরিব মানুষকে কাছে টানার জাল পাতা হয়েছে।

এবারের বাজেটেই প্রথম চাষের খরচের দেড়গুণ ফসলের দাম নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। তার জন্য বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ধন্দ তৈরি হয়েছে চাষের খরচ নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে। খরচ নির্ধারণের একাধিক পদ্ধতি আছে। মোদী সরকার সেই পদ্ধতিই গ্রহণ করেছে যাতে বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ও পরিবারের সদস্যদের আনুমানিক শ্রম ধরা হবে। কিন্তু জমির লিজ মূল্য এবং কৃষি ঋণের সুদ হিসাবে ধরা হবে না। ধাপ্পাবাজিটা লু‍কিয়ে আছে এখানে। ফলে সরকার যে খরচ নির্ধারণ করবে সেটা প্রকৃত খরচ থেকে অনেক কম। ফসলের দাম দেড়গুণ বলা হলেও বাস্তবে তা অতি সামান্যই বাড়বে। প্রচারের তোড়ে এই সত্যকে আড়াল করতে চায় মোদীরা। বস্তুত চাষের খরচ নির্ধারণের এই পদ্ধতি পূর্বতন সরকারও অনুসরণ করত। কিন্তু সমস্ত কৃষক সংগঠন দ্বিতীয় পদ্ধতিতে খরচ নির্ধারণের দাবি করছে। মোদীরা তাতে কর্ণপাত করছে না।

Featured Posts

Advertisement