কাউন্সিল না ইউনিয়ন
আপস না সংগ্রাম

সৃজন ভট্টাচার্য   ১৩ই ফেব্রুয়ারি , ২০১৮

আগামী ১৫ই ফেব্রুয়ারি ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃত্বে রাজভবন অভিযান। দাবি, মনোনীত কাউন্সিল নয়। চাই নির্বাচিত ছাত্র সংসদ। শাসকদলের তোলাবাজির ছাত্র সংসদ নয়। ছাত্র স্বার্থে লড়াই করার ছাত্র সংসদ। সেই সম্পর্কেই এই লেখা।

২৯শে জানুয়ারি ২০১৮। সোমবারের দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলেছে। ট্রামরাস্তার ওপারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সামনে তখন প্রায় সাতশো ছাত্রছাত্রীর ভিড়। শতাব্দী প্রাচীন প্রতিষ্ঠানে ৫৭% ফেল, ছাত্র-শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী কাউকে না জানিয়ে পাশের নিয়মশর্ত পালটে ফেলা হলো — বিশ বাঁও জলে আটকে পড়া ভবিষ্যতের শংকা চোখেমুখে ছাত্রছাত্রীর। প্রস্তুতি নিচ্ছে দীর্ঘ আন্দোলনের। রাস্তার এপারে, কলেজ স্কোয়ারের ঠিক বাইরেটাতেও ইতস্তত জটলা। ওপার থেকে মুহুর্মুহু স্লোগানের সাথেই পিছন থেকে ভেসে এল করুণ একটা গলা, ‘‘এত ইমপরট্যান্ট নিয়ম বদল অথচ ছাত্রদের আগে থেকে কিছু জানানো হবে না?’’ ‘‘কি করে হবে?’’ ঝাঁঝাঁলো গলায় উত্তর দিল সঙ্গী, ‘‘এরা তো ছাত্রদের কথা শুনতেই চায় না। এখন বলছে ইউনিয়নও নাকি তুলে দেবে! আর এই টি এম সি পি-রও বলিহারি বটে! সবেতে আছে, ছাত্রদের সমস্যায় পাশে দাঁড়ানো ছাড়া!’’

কলকাতার ছাত্রনেতা, সুহৃদ অর্জুনের ডাকে সম্বিৎ ফিরল। কেউ টের না পায় এমনভাবেই অল্প ঘাড় ঘোরালাম পিছনে। দুটি ছেলেমেয়ে, তখনও মৃদু স্বরে গজরে চলেছে এই অভূতপূর্ব অব্যবস্থার বিরুদ্ধে। মন বলল, স্ফুলিঙ্গ আছে, সর্বত্র। আগুন নেভেনি কোথাও, অপেক্ষায় আছে, দাবানল হয়ে ওঠার প্রথম সুযোগের।

কয়েকদিন পর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট আঁকড়ে পড়ে থেকে লাগাতার ছাত্র বিক্ষোভের সামনে অবশেষে নতিস্বীকার করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ব্যর্থ হবে তৃণমূলের ‘কানকাটা নেতাদের হুমকি, ব্যর্থ হবে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে ভাঙার জন্য এ বি ভি পি-র যাবতীয় ছক, ব্যর্থ হবে মিডিয়ার অক্লান্ত টানা কুৎসা, ‘ফেল করাদের পাশ করানোর দাবিতে’ নাকি আন্দোলন। ছেলেমেয়েরা কোথাও বলেনি ফেল করাদের পাশ করানোর কথা। তারা বলেছিল, আরেকবার পরীক্ষা নেওয়া হোক, যেহেতু নতুন নিয়ম সম্পর্কে অন্ধকারে ছিলেন ছাত্ররা থেকে অধ্যক্ষরা—সকলেই। সুবিচারের জন্য নাছোড়বান্দা ছাত্রছাত্রীদের দাবি মেনে নিয়ে কর্তৃপক্ষ, বকলমে সরকার আসলে স্বীকারই করে নিল, একা একা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় চালানো যায় না। প্রতিষ্ঠানের ভালোমন্দে ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণটাই আসলে একান্তই গুরুত্বপূর্ণ।



ধরুন, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়। স্নাতকোত্তর ভর্তির প্রবেশিকায় ব্যাপক দুর্নীতি, ও এম আর শিট পরীক্ষার্থীদের হাতে গেলে ভালো হয়। বা কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে গড়ে না ওঠায় লাইব্রেরি-ল্যাবরেটরি থে‍‌কে যোগাযোগ ব্যবস্থা ন্যূনতম পরিকাঠামোয় ফাঁক প্রচুর। অথবা উত্তরের পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়। ‘বোর্ড অব স্টাডিজ’ অকেজো হচ্ছে একটু একটু করে, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বাড়ছে অনিয়ম, ছাত্রছাত্রীরা পড়ছে সমস্যায়। শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ থেকে হস্টেল আবাসিকদের সুযোগসুবিধা, আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা থেকে বেলাগাম ফি বৃদ্ধি, স্কলারশিপ - ফেলোশিপে কোপ থেকে এইড ফান্ডে টানাটানি— রাজ্যের ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্রছাত্রী‍‌‍‌দের অভাব অভিযোগ প্রচুর। অন্যায্য নয় কোনও দাবিই, কিন্তু শুনবে কে? শোনাবেই বা কে?

সমস্যা একমুখী নয়। একাধিক। নতুন শিক্ষানীতি, বাজেটে বরাদ্দ হ্রাস, সিলেবাস পরিবর্তন এবং ইতিহাস বিকৃতি — সামগ্রিকতার ভিত্তিতে ধরলে ছাত্র সমাজের ক্ষতি হয়, এমন অনেক পদক্ষেপ বিগত কিছুদিনে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার উভয়েই। সরাসরি অর্থবরাদ্দ কমার পাশাপাশিই বেড়েছে লাগামছাড়া ফি, সেল্ফ ফিনান্সিং কোর্সের রমরমা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে মুনাফালোভী পুঁজির অবাধ আনাগোনা। অপর্যাপ্ত পরিকাঠামো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে ছাত্র সমাজের বৃহদাংশকে। জানি না, এই অব্যবস্থা ও নৈরাজ্যের সঠিক প্রকাশ কোন শব্দে হয়। ইংরেজি ভাষায় Pandemonium বলে একটি শব্দ আছে। রাজ্যের অভ্যন্তরে একমাত্র কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বভারতী, খোদ উপাচার্য চলে গেলেন নতুন কারও হাতে দায়িত্বভার তুলে না দিয়েই, ভাবা যায়?

আসলে শিক্ষাক্ষেত্রকে বিপর্যস্ত করে রাখতে পারলে শাসকের লাভ। নখদন্তহীন পঙ্গু শিক্ষাক্ষেত্র আগামীর মানুষ বানাবে না, রোবট বানানো কারখানা হিসাবে কাজ করবে। রোবট তো আর অমলকান্তি নয়, সে রোদ্দুর হতে চাইবে না! সে ভাবতে চাইবে না, কল্পনা করতে চাইবে না, স্বপ্ন দেখতে চাইবে না। সে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার ওই শিশুটির মতো সরল স্পর্ধায় প্রশ্ন করতে চাইবে না—রাজা, তোর কাপড় কোথায়? ছাত্রদের তাই রোবট বানিয়ে রাখতে হবে। তাদের শেখাতে হবে, কর্ম করিয়া যাও, ফলের আশা করিও না। বেশি গোলযোগ করলে ভগবানের নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটে। ছাত্রদের তাই, কথা বলতে দেওয়া যাবে না।



ইউনিয়ন মূলগত অধিকারের প্রশ্ন। ১৮ বছর বয়সে যে ছেলে‍‌টি বা মেয়েটি ঠিক করে দেশের প্রধানমন্ত্রী কে হবে, নিজের ক্লাসের ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ কে হবে সেটা ঠিক করার অধিকারও তার বিলক্ষণ আছে। ইউনিয়ন মানে আমাদের কাছে গণতন্ত্রের আধার, মুক্তচিন্তার চাষ জমি। ইউনিয়ন মানে আমাদের কাছে অ্যাডমিশন প্রক্রিয়ায় কোটি টাকার মালিক হয়ে যাওয়া নয়। ইউনিয়ন ভুল হাতে গেলে কি ভয়ংকর তার চেহারা হতে পারে, জানেন চারুচন্দ্র কলেজের অধ্যাপকরা। জানে রিষড়া কলেজের ওই ছাত্রী, তৃণমূলী ছাত্রনেতার কুপ্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় যার উপর অত্যাচারের ছবি দেখে শিউরে উঠেছিল গোটা রাজ্য। আমাদের লড়াইয়ের ইউনিয়ন ওটা নয়। যে ইউনিয়নের অধিকার রক্ষা করতে রাস্তায় নেমেছি আমরা, সেই ইউনিয়ন প্রশ্ন করতে শেখায়, তর্ক করতে শেখায়, ভাবতে এবং ভাবাতে শেখায়। ইউনিয়নের অধিকার, কেউ র্যা পিং পেপারে মুড়ে হঠাৎ একদিন উপহার দেয়নি। যুক্তির ভিতে দাঁড়িয়ে লড়াই করে ছিনিয়ে আনতে হয়েছে ওই অধিকার। পৃথিবীর যে কোনও ক্যাম্পাসে শিক্ষক আধিকারিক, শিক্ষাকর্মী, সবার থেকে সংখ্যায় বেশি যে অংশটি থা‍‌কে তা হলো ছাত্ররা। তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে কোনোরকম আপস করা চলবে না। সমালোচনা থাক — ইউনিয়ন করার মৌলিক অধিকারের বিপক্ষে নয়, তৃণমূল ইউনিয়নকে যেভাবে ব্যবহার করছে তার বিরুদ্ধে।

মাননীয়া এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ কাউন্সিলের গল্প ফেঁদেছেন। সভাপতি, সহসভাপতি, কোষাধ্যক্ষ — সবাই হবেন কর্তৃপক্ষের দ্বারা মনোনীত অছাত্র। মাইনেটা যখন পার্থবাবুই দেন, এই ‘মনোনীত’ অছাত্ররা ছাত্রস্বার্থবাহী যে কোনও দাবিকে উৎসাহিত করার বদলে সরকারি পক্ষ নিয়ে ছাত্রদের কণ্ঠস্বরের ধার ভোঁতা করে দেবেন না, গ্যারান্টি আছে কোনও? ছাত্ররা ইউনিয়নের টাকায় ফ্রেশার্স করবে, না বৃক্ষরোপণ করবে, না অভাবী ছাত্রছাত্রীদের সাহায্য করবে সেটুকু ঠিক করার অধিকারও তাদের হাতে থাকবে না? টি এম সি পি-র নেতাদের চৌর্যবৃত্তির দায় গোটা বাংলার ছাত্রসমাজের ঘাড়ে আসবে কেন? কলেজে কলেজে তৃণমূলী দুর্নীতি আর গুন্ডামি সামাল দিতে পারছেন না (বা চাইছেন না) বলে ইউনিয়ন ব্যাপারটাকেই তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করবেন? এই কাউন্সিল ছাত্রদের হয়ে কথা বলবে আদৌ?

গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ এখানেই সম্পূর্ণ নয়। প্রস্তাবিত ছাত্র কাউন্সিলের নির্দেশিকা বলছে, ক্লাসপিছু একজনের বেশি শ্রেণি প্রতিনিধির দরকার নেই। অর্থাৎ ৫০জনের ক্লাসেও যা, ১৫০জনের ক্লাসেও তাই। ছাত্রছাত্রীরা অসুবিধায় পড়বে কিনা, বুঝতে গেলে ইস্ট ভার্জিনিয়া থেকে ডক্টরেট হতে হয় না। জেভিয়ার্স মডেল-এর কুমিরছানা সামনে রেখে সরকার আসলে চাইছে ছাত্রছাত্রীদের কথা বলার অধিকার ধাপে ধাপে কেড়ে নিতে। প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১১-তে ক্ষমতায় এসেই যখন অর্ডিন্যান্স করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালন সমিতি থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ছাত্রছাত্রীদের মতামত গুরুত্ব পেলে হয়তো এবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এতবড় বিপর্যয়টা ঘটতো না। সেই ২০১১-তেই সিঁদুরে মেঘ দে‍‌খেছিলাম আমরা। এরপর বিভিন্ন অজুহাতে একাধিকবার বন্ধ ছাত্র সংসদ নির্বাচন ‍‌যে ইস্যুতে সুদীপ্ত গুপ্তের শহীদীবরণ। অবশে‍ষে জানানো, নির্বাচন হোক, ‘আংশিক’ গণতন্ত্র প্রয়োগের সুযোগ থাকুক ছাত্রছাত্রীদের — তবে তা ইউনিয়ন নয়, কাউন্সিলের জন্য।

কাউন্সিল হলে অরাজনীতির মুখোশের আড়ালে তৃণমূলের আধিপত্য বাড়বে বই কমবে না। মাঝখান থেকে আরও বেশি করে সংকুচিত হয়ে আসবে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মতামত জানানোর পরিসর। যেটাকে ওরা ভয় পায় বলেই এত চক্রান্ত। প্রয়োজন তাই ধৈর্য ধরে চক্রান্তের জাল মানুষের সামনে স্পষ্ট করা। গোটা রাজ্যজুড়ে জনমত সংগ্রহ করছে বাংলার বামছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা। ছাত্রছাত্রীদের কাছে, সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে আমরা তুলে ধরছি শিক্ষাক্ষেত্রের উপর নজিরবিহীন আক্রমণের দৃষ্টান্ত। বোঝাচ্ছি ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা। বলছি, কেন শাসক শ্রেণির আক্রমণের মুখে কাউন্সিলের থেকে অনেক বেশি ধারালো, পরীক্ষিত অস্ত্র হলো আমাদের ইউনিয়ন। মানুষ সায় দিচ্ছেন, বুঝছেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের প্রয়োজনীয়তা।

ক্যাম্পাসে চাই খোলা হাওয়া। কাউন্সিল প্রণয়নের কালা নির্দেশিকা প্রত্যাহার করতে হবে। শুধু ইউনিয়ন চাই বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায় কথাটা। চাই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ছাত্র ইউনিয়ন। গত একমাস ধরে কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ নিবিড় প্রচার চালিয়ে স্বাক্ষরসংগ্রহ করেছেন কমরেডরা। আগামী ১৫ই ফেব্রুয়ারি, বেলা ১টায় শিয়ালদহ স্টেশন। সারা বাংলাজুড়ে সংগৃহীত হাজার হাজার স্বাক্ষর নিয়ে রাজভবন অভিযানে রওনা দেব আমরা। কলকাতার রাস্তায় সেদিন আরেকবার গণতন্ত্রের দাবিতে ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের লাল তারা সাদা পতাকাটা হাতে পাশাপাশি হাঁটবে সুদীপ্ত আর সাইফুদ্দিন। যোগ দেওয়ার জন্য আহ্বান রইল সবার উদ্দেশে — কারণ ইতিহাস সাক্ষী আছে, স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল হতে গেলে, অরণ্যের সব গাছকেই প্রয়োজন হয়!

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement