কমরেড মহম্মদ আমিনের জীবনাবসান

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৩ই ফেব্রুয়ারি , ২০১৮

কলকাতা, ১২ই ফেব্রুয়ারি— শ্রমিক আন্দোলনের প্রবীণ নেতা, সি পি আই (এম)-র পলিট ব্যুরোর প্রাক্তন সদস্য কমরেড মহম্মদ আমিনের জীবনাবসান হয়েছে। সোমবার দুপুর ২টা ৪০মিনিটে মধ্য কলকাতায় নিজের বাসভবনেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০বছর। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য কমরেড মহম্মদ আমিন শ্রমিক আন্দোলনে, পার্টি সংগঠনে এবং পার্টির পক্ষ থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসাবে সংসদীয় ক্ষেত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে। যুক্তফ্রন্ট সরকারে এবং বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন তিনি। আবার সি আই টি ইউ-র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সি পি আই (এম)-র পলিট ব্যুরো সদস্য বিমান বসু এবং পার্টির রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র। মঙ্গলবার সকাল ১১টায় তাঁর মরদেহ সি পি আই (এম)-র রাজ্য দপ্তরে নিয়ে আসা হবে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য, পরে বিকালে বরানগরে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।

কমরেড আমিনের মৃত্যুসংবাদ পেয়েই ভারাক্রান্ত মনে তাঁর বাড়িতে যান বিমান বসু, সূর্য মিশ্র, মৃদুল দে, রবীন দেব, শ্যামল চক্রবর্তীসহ সি পি আই (এম)-র নেতৃবৃন্দ। পার্টির কলকাতা জেলার নেতৃবৃন্দও সেখানে ছিলেন। সি আই টি ইউ-র পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সভাপতি সুভাষ মুখার্জি ও সম্পাদক অনাদি সাহু এবং বিভিন্ন গণসংগঠনের নেতৃবৃন্দও এসেছিলেন। কমরেড আমিনের দুই পুত্র এবং এক কন্যা রয়েছেন। তাঁদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন পার্টি নেতৃবৃন্দ।

এদিন সন্ধ্যায় পার্টি নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে কমরেড আমিনের মরদেহ পিস হাভেনে নিয়ে যাওয়া হয়, এদিনের মতো সেখানেই মরদেহ রেখে দেওয়া হয়েছে। প্রয়াত কমরেড আমিনের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার সকাল এগারোটায় মরদেহ নিয়ে আসা হবে সি পি আই (এম)-র রাজ্য কমিটির দপ্তর মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ভবনে। সেখানে এক ঘন্টা মরদেহ শায়িত রাখা হবে পার্টির নেতা, কর্মী ও সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য। তারপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে বিধানসভায়। সেখানে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পরে সি আই টি ইউ-র রাজ্য দপ্তর শ্রমিক ভবনে নিয়ে যাওয়া হবে, সেখানে থেকে বরানগরের আলমবাজারে কমরেড মহম্মদ আমিনের পৈতৃক বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে। তারপরে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।

সংক্ষিপ্ত জীবনী: আন্দোলন সংগ্রামের বৈচিত্র্যময় ও রোমাঞ্চকর এক জীবন যাপন করে যাওয়া কমরেড মহম্মদ আমিনের জন্ম ১৯২৮ সালে কলকাতায়। কিন্তু তাঁদের আদি বাড়ি ছিল উত্তরপ্রদেশের বারাণসী জেলার গ্রামে। কমরেড আমিনের পিতা অল্পবয়সেই কলকাতায় চলে এসেছিলেন। দারিদ্রপীড়িত পরিবারের সন্তান মহম্মদ আমিন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। ঠাকুর্দার কাছে বাড়িতেই উর্দু শিক্ষার শুরু হয়েছিল। পরেও অপ্রথাগতভাবেই উর্দু বাংলা এবং ইংরেজি শিক্ষালাভ করেন। কখনও গৃহশিক্ষক, কখনও পার্টি নেতারাই তাঁকে পড়াশুনায় সাহায্য করেছেন। উর্দুতে তিনি পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন এবং উর্দু সাহিত্যেও অবদান রেখেছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় যখন জাপানী বিমান থেকে বোমা পড়ছে, আতঙ্কে বহু মানুষ অফিস কারখানা থেকে কাজকর্ম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছেন, তখন চোদ্দ বছরের কিশোর মহম্মদ আমিন এবং তাঁর বড়ভাইকে হাত ধরে চটকলে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের পিতা। মেশিনের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। ১১০০ গজ চট বোনা হলে সাত টাকা তেরো আনা মজুরিতে কৈশোরেই শ্রমিকের জীবন শুরু করেছিলেন মহম্মদ আমিন।

কিন্তু এই জীবন তাঁকে বেপথু করতে পারেনি। চটকলে কাজ করতে করতেই তিনি বেঙ্গল চটকল মজদুর ইউনিয়নের সদস্য হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে বিদেশে থাকা হাফিজ জালালউদ্দিন নামের এক সেনা ফরাসী সেনাদের কাছ থেকে রুশ বিপ্লবের কথা শুনে কমিউনিস্ট হয়ে গিয়েছিলেন। বরানগরের আলমবাজারে এসে তিনি মহম্মদ আমিনদের বাড়িতেই থাকতেন এবং ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। তাঁর কাছ থেকেই প্রথম রাজনীতিতে আকৃষ্ট হওয়ার উপাদান পান কিশোর মহম্মদ আমিন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে চটকলের কাজ ছেড়ে দেন তিনি। রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখে বিহ্বল অবস্থার মধ্যেই মাত্র ১৮বছর বয়সে ১৯৪৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। কিন্তু ১৯৫১ সালে পার্টির সিদ্ধান্তে তাঁকে পাঠানো হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের সৈয়দপুরে, পার্টি সংগঠন গড়ে তোলার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু রংপুরে সভা করার সময় পুলিশের হাতে অন্যদের সঙ্গে গ্রেপ্তার হন আমিনও। মাস ছয়েক রংপুর জেলে থাকার পরে তাঁকে পাঠানো হয় রাজশাহী জেলে, সেখানেও প্রায় দুবছর বন্দি ছিলেন তিনি। সেই সময়ে বহু কমিউনিস্ট বন্দি ছিলেন রাজশাহী জেলে। বন্দি কমিউনিস্ট মহম্মদ আমিনকে এক পুলিশ সুপার বলেছিলেন, ‘বিনাবিচারেই কুড়ি বছর আটকে রাখবো আপনাকে।’ আমিন তাঁকে বলেছিলেন, ‘কুড়ি বছর পাকিস্তানই টিকবে না।’

ভারত সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ভারতীয় নাগরিকত্বের কারণ হিসাবে ১৯৫৩সালে মোট তিরিশজন বন্দির সঙ্গে মহম্মদ আমিনও রাজশাহীর জেল থেকে মুক্তি পেয়ে এই বাংলায় ফিরে আসেন। তারপর থেকে শুরু হয় পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের নজরদারি। পার্টির কাছ থেকে দায়িত্ব পেয়ে টিটাগড়ে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে উঠে পড়ে লাগেন মহম্মদ আমিন। ১৯৬৯ সালে টিটাগড় বিধানসভা কেন্দ্র থেকে সি পি আই (এম)-র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে জয়ী হন মহম্মদ আমিন। ১৯৭০ সালে সরকার পড়ে যাওয়ার কয়েকমাস আগে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পরিবহণ মন্ত্রী হিসাবে তিনি দায়িত্বভার নেন। পরিবহণ মন্ত্রী হয়েই তিনি একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে পেট্রোলের বকেয়া মূল্য মেটানোর বদলে পরিবহণ শ্রমিকদের বকেয়া প্রাপ্য মিটিয়েছিলেন। আবার ১৯৭৭ সালে পরিবহণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে সিদ্ধার্থশংকর রায়ের ব্যবহারের জন্য পূর্বতন কংগ্রেস সরকারের কেনা একটি ৮আসনের বিমান বিক্রি করে দিয়ে গণপরিবহণের বাস কেনার ব্যবস্থা করেছিলেন।

সাতের দশকে গণআন্দোলন ও পার্টিসংগঠনের কাজ করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার আক্রান্ত হয়েও বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭২ সালের রিগিংয়ের নির্বাচনে তিনি জয়ী হতে পারেননি। কিন্তু ১৯৭১ সালের নির্বাচনে তিনি জয়ী হয়েছিলেন, তারপরে ১৯৭৭ সালে জয়ী হয়ে বামফ্রন্ট সরকারের পরিবহণ মন্ত্রী হয়েছিলেন। এরপর ১৯৮৮ সালে তিনি রাজ্যসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন সি পি আই (এম)-র সাংসদ হিসাবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে ১৯৯৬ সালে তিনি ফের বিধানসভায় নির্বাচিত হন এবং বামফ্রন্ট সরকারের নতুন তৈরি করা সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২০০১ সালে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে তিনি শ্রমমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৫৫ সালে অবিভক্ত ২৪ পরগনা জেলায় অবিভক্ত পার্টির জেলা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মহম্মদ আমিন। ১৯৭১ সালে তিনি সি পি আই (এম)-র রাজ্য কমিটির সদস্য হন। ১৯৮৫ সালে তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। ২০০৮ সালে নির্বাচিত হন পলিট ব্যুরোয়। ২০১২ সালে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিশেষ আমন্ত্রিত সদস্য হন। পার্টি সংগঠনের পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনেও দক্ষ এবং সর্বজনের আস্থাভাজন নেতা ছিলেন মহম্মদ আমিন। সি আই টি ইউ-র ১২তম সর্বভারতীয় সম্মেলনে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পরে সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। অল ইন্ডিয়া রোড ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনেরও সভাপতি ছিলেন ২০১৭ সাল পর্যন্ত। পশ্চিমবঙ্গ বস্তি উন্নয়ন সমিতির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।

রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন মার্কসীয় সাহিত্য ও কমিউনিস্ট ইশ্‌তেহারের উর্দু অনুবাদ করার কাজ করেছেন মহম্মদ আমিন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখিও করেছেন। সি পি আই (এম)-র উর্দু পত্রিকা কিষান মজদুরের সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। তাঁর লেখা উর্দু কবিতার সংকলন ‘সদাই বেদারি’, বাংলা ও হিন্দিতে তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনের ধুপছাঁও’ এবং বিভিন্ন উপন্যাসের অনুবাদ খুবই জনপ্রিয়।

Featured Posts

Advertisement