বাসস্ট্যান্ডের বিরোধী নন কেউ
ক্ষতিপূরণের নিশ্চিত আশ্বাস
চান মির্জাপুরের গরিবরা

রণদীপ মিত্র   ১৭ই ফেব্রুয়ারি , ২০১৮

বোলপুর : ১৩ই ফেব্রুয়ারি— বোলপুরের শিবতলা মোড় থেকে দেড় কিমি দক্ষিণে ইলামবাজার যাওয়ার মূল সড়কের উপরই রয়েছে মির্জাপুর গ্রাম। রায়পুর-সুপুর গ্রামপঞ্চায়েত কার্যালয়ের কাছেই এই মূল রাস্তা। ডানহাতে ছড়িয়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ চাষের জমি। যে জমিই পেটের ভাত জোগায় মির্জাপুরের কমবেশি ৪০টি গরিব আদিবাসী, তফসিল পরিবারের। বোলপুর-ইলামবাজার পাকা সড়কের উপর জমির দাম বেড়ে এখন আকাশছোঁয়া। সেই জমি হাতছাড়া হওয়া আর সময়ের অপেক্ষা! তাই বিনিদ্র রাত কাটছে মির্জাপুরবাসীর।

উন্নয়নের বিরোধী তাঁরা কেউই নন। কিন্তু অভিজ্ঞতাই জন্ম দিয়েছে আশঙ্কার। ‘উন্নয়নে’র জন্য সর্বস্ব দিয়ে ভাত-কাপড়ের কি সংস্থান হবে? এখন বোলপুরের মির্জাপুরজুড়ে এক কথায় বইছে আতঙ্কের চোরাস্রোত। কারণ দেড় কিলোমিটার দূরের শিবপুরের ক্ষত যে এখনও দগদগে। সেই ক্ষতই তো মির্জাপুরের চোরাস্রোতে ঢেউ তুলছে।

কারণ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ইচ্ছা বোলপুরে আন্তর্জাতিকমানের বাসস্ট্যান্ড হোক। বোলপুরের প্রশাসনিক সভায় এসে সেই ইচ্ছাকে সরকারি সিদ্ধান্তে তিনি সিলমোহর দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছাপূরণের জন্য চিহ্নিত হয়েছে মির্জাপুরের জমি। তারপরই ময়দানে নেমে পড়েছে দিদির ‘দামাল’ ভাইয়েরা। পরিণাম, ঘুম উবেছে গাঁয়ের বিধবা অন্ন বর্মণের। কাঠা পনেরো জমি তাঁর। বলেন, ‘হাল কিনে ধান পুঁতে চলে কোনোরকমে। সাথে মুনিষ খাটি। বাসস্ট্যান্ড হলে তো জমি আর থাকবে না। সরকার বলছে অন্য ব্যবস্থা করবে। কিন্তু ভরসা পাচ্ছি না। শিবপুরের যা অবস্থা’!

মির্জাপুরের ঐ পরিবারগুলির রয়েছে মোট ৩৮ বিঘা জমি। তাদের মধ্যে ১২টি পরিবার পাট্টা পেয়েছে। বাকিরা বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে জমি দখলে রেখে চাষ করছেন প্রায় ৭০-৮০ বছর। এই জমিই হতদরিদ্র মানুষগুলির সহায়। যেখানেই হবে বাসস্ট্যান্ড। মির্জাপুর গ্রাম ঘুরে একটি পরিবারেরও সন্ধান মেলেনি যারা বাসস্ট্যান্ডের বিপক্ষে। কেবল জানতে চান তাদের ভবিষ্যত কি হবে ? মির্জাপুর চাইছে এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর। এই প্রশ্নের উত্তর পেতেই দিনাতিপাত করা মানুষগুলির পাশে দাঁড়িয়েছে আদিবাসী অধিকার মঞ্চ। মঞ্চের নেতা গাঁয়ের মাস্টার মঙ্গল মুর্মু আছেন গ্রামবাসীদের সাথে। তাঁরা মহকুমাশাসককে বলেছেন। ডেপুটেশন দিয়েছেন। দাবি একটাই। বাসস্ট্যান্ড হোক, সঙ্গে হোক জমিহারাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। জমি দিয়ে মিলুক ন্যায্য ক্ষতিপূরণও। তাঁদের দাবি, ‘বিঘা প্রতি জমির বাজারমূল্য এখানে এখন কমপক্ষে ৮-১০ লাখ। আমাদের দাবি বিঘা পিছু ৫ লাখ ক্ষতিপূরণ দিক সরকার।’

শ্রীনিকেতন-শান্তিনিকেতন উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান তথা রাজ্যের মৎস্যমন্ত্রী বোলপুরের বিধায়ক চন্দ্রনাথ সিনহাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল এই বিষয়ে। তাঁর উত্তর,‘মোট ৩৮বিঘা জমি রয়েছে। তার মধ্যে যাদের পাট্টা রয়েছে তাদের জমিতে হাত দেওয়া হবে না। বাকি পড়ে থাকা পাট্টাহীন ২৬বিঘা জমি আমরা অধিগ্রহণ করব বাসস্ট্যান্ডের জন্য।’

মন্ত্রীর আশ্বাস পৌঁছেছে মির্জাপুরে। কিন্তু ভয়ের বাতাস বইছে। তার কারণ মির্জাপুরের দেড় কিলোমিটার দূরে একই রাস্তার উপর থাকা শিবপুরের ২৯৪ একর জমির হালহকিকত। সেখানেও ঘোষণা ছিল শিল্পতালুক গড়ার। কৃষকরা জমি দিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী নিজে বলেছিলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় এসে শিল্প গড়ব। বাড়তি ক্ষতিপূরণ দেব। পরিবার পিছু চাকরি দেব।’ উধাও সব প্রতিশ্রুতি। বরং সেই কৃষকরাই শিল্পের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে শাসকের রোষানলে। নাগাড়ে চলছে হামলা, শাসানি, মিথ্যা মামলা। বিপন্ন গ্রামজীবন। বহু গ্রামবাসীই নিজের গ্রামেই থাকার প্রশ্নে ‘নিষেধাজ্ঞা’র বেড়াজালে।

মির্জাপুরের বুড়ো বাস্কি, খ্যাপা হেমব্রম, দীপঙ্কর বাউরিদের চাল ফুঁড়ে বইছে আতঙ্কের চোরাস্রোত। জানালেন, এলাকার তৃণমূলীরা নেমে গিয়েছে আসরে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করছেন ভোটার কার্ড, ব্যাঙ্কের পাশবই, ছবি। প্রশ্ন করলে বলছেন, ‘ক্ষতিপূরণ পাবে। অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে যাবে।’ কত টাকা ? ক্ষতিপূরণ কে দেবে ? অন্ধকারে মির্জাপুর। মির্জাপুর হবে না তো আর একটা শিবপুর!

ক্যাপশন: মির্জাপুরের সেই জমি।

Featured Posts

Advertisement