কেন আন্ত্রিক, জানা যায়নি এখনও

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৪ই ফেব্রুয়ারি , ২০১৮

কলকাতা, ১৩ই ফেব্রুয়ারি — ডেঙ্গুর ঢঙ্গে আন্ত্রিকের মোকাবিলা শুরু করল রাজ্য সরকার। নিজেদের খামতি ঢাকতে ডাকাই হলো না কলকাতার জাতীয় কলেরা গবেষণা কেন্দ্রকে। রাজ্যের স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের তরফে দক্ষিণ কলকাতায় একটি দল পাঠানো হলেও তেমন করে মঙ্গলবার নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি। সব মিলিয়ে কলকাতার শহরতলির আন্ত্রিকের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিলেও রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর যা করেছিল ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে, তথ্য চেপে দেওয়ার সেই রাস্তাতেই যাচ্ছে কলকাতা কর্পোরেশনও। আর তাতে যা হবার তাই হচ্ছে, আন্ত্রিক ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যাদবপুর অঞ্চলে।

চার দিন পার হয়ে যাওয়ার পরেও শহরতলির আন্ত্রিকের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে অপরাগ কলকাতা কর্পোরেশন। রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে গিয়ে চিকিৎসায় মন দিলেও কারণ খোঁজার এতটুকুও চেষ্টা করেননি। সরকার হাত গুটিয়ে থাকলেও রুবির পর থেকেই দক্ষিণ কলকাতার ব্যাপক অংশে ছড়িয়ে পড়ছে আন্ত্রিক। বাঘাযতীন, বৈষ্ণবঘাটা, যাদবপুর, পাটুলি, রামগড় এলাকায় আন্ত্রিক আক্রান্ত রোগী ঘরে ঘরে। একই পরিবারে একাধিক এই রোগে আক্রান্ত। মঙ্গলবার নতুন করে ২২জনকে বেলেঘাটার আই ডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বাঘাযতীন হাসপাতালে এবং বিজয়গড় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন যথাক্রমে ১২০ ও ৫০জন।

কর্পোরেশনের সরবরাহ করা জল বিশুদ্ধ ও নিরাপদ বলে মেয়র শোভন চ্যাটার্জি দাবি করলেও মঙ্গলবার সকালে বাঘাযতীন হাসপাতালে রোগী দেখতে গিয়ে হাটে হাঁড়ি ভেঙেছেন রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা অজয় চক্রবর্তী। তিনি জানান, জল থেকে এই পেটের রোগ তা বোঝা যাচ্ছে। তবে তা ভাইরাস থেকে হচ্ছে না ব্যাকটেরিয়া থেকে তা বোঝা যাচ্ছে না। তাহলে সরকার কেন তা নির্ণয়ের চেষ্টা চালাচ্ছে না? স্বাস্থ্য অধিকর্তার নিস্পৃহ উত্তর – কলকাতার স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন দেখছে।

কী করছে ট্রপিক্যাল ?

মিটিংয়ে ব্যস্ত স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের অধিকর্তা অধ্যাপক নন্দিতা বসু (ঘোড়ই) জানিয়েছেন, ‘সংক্রামিত এলাকায় কাজ করছেন ট্রপিক্যালের বিশেষজ্ঞরা।’ পানীয় জলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে? অধিকর্তার উত্তর, ‘এক দফা হয়েছে, তবে নমুনা সংগ্রহ চলছে’। কবে নাগাদ জানা যাবে সেই রিপোর্ট ? অধ্যাপক বসুর জবাব — ‘সময় লাগবে। বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে। দেখা হবে ওতে ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়া আছে কিনা। জলের কালচার করতে হবে। তা করতে অন্তত দুই থেকে তিন দিন লাগবে।’ তাহলে তিন দিন পরে কী জানা যাবে কলকাতা শহরতলিতে আন্ত্রিকের কারণ জল কিনা ? ট্রপিক্যালের অধিকর্তার নিলিপ্ত জবাব — ‘দেখা যাক’।

এদিকে যারা এক দিন নয়, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পানীয় জল পরীক্ষা করে বলে দিতে পারতো সেই বেলেঘাটার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কলেরা অ্যান্ড এন্টারিক ডিজিজেজ (নাইসেড)-কে একবারের জন্য ডাকা হলো না। মঙ্গলবার সেকথা আক্ষেপের সুরেই জানিয়েছেন নাইসেডের অধিকর্তা ড. শান্তা দত্ত। চোখের সামনে আন্ত্রিকের সমস্যা দেখছেন, তবুও সেখানে গিয়ে নিজেদের আন্তর্জাতিক স্তরের ব্যবহারিক জ্ঞানকে প্রয়োগ করতে পারছেন না নাইসেডের বিশেষজ্ঞরা। অধিকর্তা ড. দত্ত জানিয়েছেন — ‘রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে চিঠি না পেলে কাজ করাটা কঠিন। আমিও বৃহত্তর কলকাতায় আন্ত্রিকের পরিস্থিতি খবরের কাগজ থেকে জানছি।’ তবে কী থেকে এতো বড় আন্ত্রিক সংক্রমণ তা খুঁজে দিতে এখনো যে নাইসেড উৎসাহী তা জানাতে ভোলেননি নাইসেড অধিকর্তা।

বেলেঘাটা আই ডি হাসপাতালে দক্ষিণ কলকাতা থেকে এদিন ২০জন রোগীকে ভর্তি করা হয়েছে। এদিন আই ডি-র তরফে সেখানকার অধ্যক্ষ ডাঃ উজ্জ্বল ভদ্র নিজের উৎসাহেই নাইসেডের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ চেয়েছিলেন। তাঁরা গিয়েছিলেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, লাগাতার অ্যান্টিবায়োটিক তাঁদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে। বেশিরভাগ রোগীই এখন সুস্থ হওয়ার পথে। এই অবস্থায় আন্ত্রিকের কারণ ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া নাকি প্রোটোজোয়া তা বোঝা কঠিন বলে জানিয়েছেন দেশের অন্যতম ব্যাকটেরিয়া বিশারদ ড. শান্তা দত্ত।

অন্যদিকে, কলকাতা স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের প্রাক্তন অধিকর্তা বিশিষ্ট জীবাণু বিশেষজ্ঞ ডাঃ অমিয়কুমার হাটি জানাচ্ছেন, ‘ব্যাপক মাত্রায় আন্ত্রিকের প্রকোপের অর্থ হলে পানীয় জলের দূষণ। এটা নিয়ে দ্বিতীয়বার চিন্তা করার কোনও জায়গা নেই। তবে তা কীসের থেকে হয়েছে সেটা পরীক্ষা করেই বের করতে হবে।’ সোমবার কলকাতা কর্পোরেশনের তরফে দাবি করা হয়েছিল কলকাতার স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন এবং নাইসেডে জলের নমুনা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ওই দাবি যে কতটা অসত্য তা মঙ্গলবারে রাজ্য ও কেন্দ্রের দুই অধিকর্তাকে জিজ্ঞাসা করে পরিষ্কার হয়ে গেছে।

কলকাতার জীবাণু বিশেষজ্ঞদের মতে ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাসের পাশপাশি প্যারাসাইট থেকেও আন্ত্রিক হয়। এই সামান্য বিষয়টি হয়ত কর্পোরেশন রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের মাথায় নেই। কেননা যাদবপুর এলাকার আক্রান্তদের পরিবারের তরফে অভিযোগ করা হয়েছিল ইদানীং তাঁরা কলের জলে ছোট ছোট পোকা দেখতে পেয়েছেন। সেটা কী তার ব্যাখ্যা এখনো পাওয়াই যায়নি। স্বভাবতই এই খবরকে মানতে চায়নি কলকাতা কর্পোরেশন। চিকিৎসক অপূর্ব ব্যানার্জি জানাচ্ছেন, কেনা জলের থেকে কর্পোরেশনের জলই ফুটিয়ে খাওয়া যেতে পারে। বড় পাত্রে আধ ঘণ্টা ফুটিয়ে তা ঠান্ডা করে খাওয়া যেতে পারে। এতে পেটের গোলমাল তো হবে না, এমনকি আক্রান্তরাও দ্রুত ভালো হয়ে উঠবেন। পাতলা পায়খানার সঙ্গে যদি বমি শুরু হয়, তাহলে বসে না থেকে সরাসরি চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন শহরের চিকিৎসকরা।

কলকাতা কর্পোরেশনের জল সরবরাহ বিভাগটি দেখেন খোদ মেয়র শোভন চ্যাটার্জি। তিনি আক্রান্ত এলাকায় গেছেন। অথচ আক্রান্ত বাসিন্দারা জানাচ্ছেন — মেয়র এলাকায় এলেও সংক্রমণ নিয়ে তেমন কিছুই বলছেন না। এমনকি আক্রান্ত এলাকায় গিয়ে মেয়র বলেছেন — ‘জলের নমুনা যা সংগ্রহ হয়েছে, তাতে সমস্যা মেলেনি। আমরা এখনও বলছি যে, জল নিরাপদ।’ তা হলে এত মানুষ অসুস্থ হচ্ছেন কী ভাবে ? মেয়রের পালটা বক্তব্য — ‘হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছ থেকে জেনেছি যে, প্রতিবার সিজন চেঞ্জের সময় এমন রোগীরা আসেন। এখন মানসিক ভাবে আতঙ্কিত হয়ে কেউ কেউ আসছেন, নাকি সত্যিই কিছু ঘটেছে, দেখা হচ্ছে।’ একটি মেট্রো শহরের মেয়রের এমন বক্তব্য শুনে কানে আঙুল দেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় পথ দেখছেন না চিকিৎসকরা।

তবে মেয়র যাই বলুন না কেন কর্পোরেশনের মেয়র পরিষদ (স্বাস্থ্য) সদস্য অতীন ঘোষ অবশ্য পরিষ্কার জানাচ্ছেন — ‘সংক্রমণ বাড়ছে। তবে অসুস্থদের বাড়ি থেকে সংগৃহীত ৯২টি নমুনায় তেমন সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।’ কোথা থেকে সংক্রমণ হচ্ছে তার হদিশ অতীন ঘোষ জানাতে না পারলেও তিনি শোভন চ্যাটার্জির মতো কর্পোরেশনের জলকে ‘নিরাপদ’ বলে সার্টিফিকেট দেননি। আন্ত্রিক ছড়াতে থাকলে জলের নমুনায় ক্যালিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার ন্যূনতম মাত্রা ১০ থাকে। শহরতলির পলতায় কর্পোরেশনের ল্যাবে নাকি ওই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহরের বিশেষজ্ঞদের মতে — এই ধরনের রিপোর্ট পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আর যদিও তা পাওয়া যায় তাহলে বুঝতে হবে পানীয় জল পরীক্ষার যথাযথ পরিকাঠামো ওই ল্যাবে নেই।

Featured Posts

Advertisement