ভয়ংকর খেলায় সঙ্ঘ

সীমান্ত সুরক্ষার কাজে নিরত সেনাদের কেউ না কেউ প্রায় প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছেন। বস্তুত মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটার জেরে সেনা মৃত্যুর ঘটনা খানিকটা বেড়ে গেছে। এই সেদিনও জম্মুতে সেনা ঘাঁটিতে জঙ্গি হামলায় পাঁচ জওয়ানের মৃত্যু ঘটেছে। একদিন আগে কাশ্মীরে নিহত হন এক সি আর পি এফ জওয়ান। এমন এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী যখন জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য করে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন, তখন বর্তমান শাসকদল বি জে পি-র রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত অভিভাবক আর এস এস-র প্রধান মোহন ভাগবত গোটা সেনাবাহিনীকেই শুধু অপমান করলেন না, বুঝিয়ে দিতে চাইলেন দক্ষতার নিরিখে তারা সঙ্ঘবাহিনীর কাছে অতীব নিম্নমানের। স্পষ্ট করে দিলেন যে কাজ করতে সেনাবাহিনীর ৬/৭ মাস সময় লাগে, সেই কাজ সঙ্ঘ সদস্যরা তিনদিনে করে দেখাতে সক্ষম। উগ্র-জাতীয়তাবাদের স্বরকে যথা সম্ভব চড়িয়ে ভাগবত তাদের দেশপ্রেমের বহর দেখানোর পাশাপাশি এটাও বুঝিয়ে দিতে চাইলেন, দেশ রক্ষার কাজে আর এস এস বাহিনীর ওপর নিশ্চিন্তে ভরসা করা যায়।

বিহারে সঙ্ঘের এক সভায় ভাগবত যখন দেশের সেনাবাহিনীকে খাটো করে আর এস এস বাহিনীকে গৌরবান্বিত করছেন, তখন কলকাতায় আর এস এস-এরই গড়া এক সংগঠনের সভায় বক্তৃতা করেছেন বি এস এফ-র প্রধান। এই দুটো ঘটনা পরস্পরবিরোধী মনে হলেও, এটা আসলে সঙ্ঘের দ্বিমুখী কৌশল। তার একদিকে যেমন সেনাবাহিনীর সঙ্গে সঙ্ঘের যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়িয়ে সেনাবাহিনীর ওপর সঙ্ঘের প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর সমান্তরালে একটি বেসরকারি হিন্দু মিলিশিয়া বাহিনীকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর এস এস-র এই ভাবনার উৎস ইউরোপের ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্রের মডেল। মুসোলিনির ইতালিতে এবং হিটলারের জার্মানিতে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি শাসকদলের অধীন বেসরকারি বাহিনী গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে কিছু কিছু দেশে বিশেষ করে মুসলিম রাষ্ট্রে এমন বেসরকারি মিলিশিয়া বাহিনী রয়েছে। মোদীর ভারতে আর এস এস-ও সম্ভবত এমন মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করার স্বপ্ন দেখছে। ইতিমধ্যে অবশ্য এদেরই মদতে গোরক্ষাবাহিনীর মতো একাধিক ঠেঙাড়েবাহিনী গড়ে উঠেছে, যারা বেসরকারি পুলিশবাহিনী রূপে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে। আসলে দেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ভেঙে তছনছ করে এক নৈরাজ্যবাদী ব্যবস্থা গড়তে চায়। হিন্দু রাষ্ট্রের পক্ষে এমন ব্যবস্থাই বেশি উপযোগী।

ভাগবতের এমন অবমাননাকর বক্তব্যের পর সমস্ত বিরোধীদল একবাক্যে বিরোধিতা করেছে। ভাগবতকে এর জন্য ক্ষমা চাইতেও বলা হয়ে‌ছে। অথচ বি জে পি-র কোনও নেতা বা কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তারা কেউ টুঁ-শব্দটিও করেননি। আর এস এস প্রধানের কথায় দ্বিমত প্রকাশ করার সাহস অবশ্য কোনও ‍ ‍বি জে পি নেতার নেই। তাছাড়া বি জে পি নেতারাও জানেন ভাগবত ভুল কিছু বলেননি। জম্মু থেকে আর এস এস তার সদস্যদের এমনটাই তো শিখিয়েছে। হিন্দু রাষ্ট্র গড়তে হলে হিন্দুদের সুরক্ষাবাহিনীই প্রকারান্তরে হিন্দু রাষ্ট্রের সুরক্ষার দায়িত্ব নেবে। যে রাষ্ট্রের চরিত্র হবে হিন্দু এবং যেখানে হিন্দুত্বই হবে আদর্শ আচরণবিধি, সেখানে গণতন্ত্রের বা বহুমতের কোনও ঠাঁই হতে পারে না। হিন্দুত্বের একমাত্র ঠিকাদার যেহেতু আর এস এস, তাই তারাই দায়িত্ব নেবে হিন্দু, হিন্দুত্ব ও হিন্দু রাষ্ট্রের সুরক্ষার। বিধর্মীদের শায়েস্তা করার জন্য এই হিন্দু মিলিশিয়াবাহিনী কাজ করবে, তেমনি দেশরক্ষার দায়িত্বও তারা পালন করবে। এখানে সেনাবাহিনীর বি‍‌শেষ গুরুত্ব নেই। কারণ তারা শুধু যুদ্ধের জন্য, দেশরক্ষার জন্য প্রশিক্ষিত, হিন্দু ও হিন্দুত্ব রক্ষার জন্য প্রশিক্ষিত নন। সেনাবাহিনীকে ছাড়িয়ে সেই দায়িত্ব নেবে আর এস এস বাহিনী। পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে হিন্দুত্বের আদর্শগত পাঠ দেবার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছে। আর এস এস-র ছাতার নিচে গড়ে ওঠা বেশকিছু সংগঠন সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়াচ্ছে। সেনাবাহিনীকে যতটা সম্ভব আর এস এস বাহিনীর মতাদর্শগত ছাঁচে পুনর্গঠিত করার চেষ্টা হচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে এক ভয়ংকর খেলায় নেমেছে আর এস এস।

Featured Posts

Advertisement