বি জে পি-কে পরাস্ত
করাই প্রধান কর্তব্য

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৪ই ফেব্রুয়ারি , ২০১৮

পার্টির স্বাধীন শক্তির বিকাশই চাবিকাঠি, বলা হলো খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবে

-----------------------------------------------------------

নয়াদিল্লি, ১৩ই ফেব্রুয়ারি- বর্তমান সময়ের প্রধান কর্তব্য হলো সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে সমবেত করে বি জে পি এবং তার মিত্রদের পরাস্ত করা। নয়া উদারনীতির প্রভাব, জনগণের ওপরে বোঝা চাপানোর বিরুদ্ধে সংগ্রামকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের সঙ্গে একসূত্রে গ্রথিত করেই বি জে পি-আর এস এস জোটের বিরুদ্ধে লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। সি পি আই (এম)-র ২২তম কংগ্রেসের জন্য খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাবে একথা বলা হয়েছে। ১৯শে-২১শে জানুয়ারি কলকাতায় কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক থেকে এই খসড়া গ্রহণ করা হয়েছিল। মঙ্গলবার তা প্রকাশ করা হয়েছে। পার্টির সর্বস্তরে এই খসড়া নিয়ে আলোচনা হবে। ২০শে মার্চ পর্যন্ত এই খসড়া নিয়ে সংশোধনী পাঠানো যাবে। ১৮ই-২২শে এপ্রিল হায়দরাবাদে পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে।

খসড়ায় জাতীয় পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, বি জে পি রাজনৈতিক অবস্থান সংহত করেছে। মোদী সরকারের আমলে নয়া উদারনৈতিক ধনতান্ত্রিক শোষণের তীব্রতা বেড়েছে। হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচি রূপায়ণ করতে গিয়ে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক কাঠামোর অবক্ষয় ঘটছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী রণনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে ভারতকে বেঁধে ফেলছে বি জে পি সরকার। এসবই এক স্বৈরতান্ত্রিক-সাম্প্রদায়িক শাসনের সূচনা। একই সঙ্গে মোদী সরকারের নীতির বিরুদ্ধে গণ অসন্তোষ বাড়ছে। শাসক শ্রেণি ও শ্রমিক-কৃষকের মধ্যে দ্বন্দ্বের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নয়া উদারনীতির প্রভাব, জনগণের ওপরে বোঝা চাপানোর বিরুদ্ধে সংগ্রামকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের সঙ্গে একসূত্রে গ্রথিত করেই বি জে পি-আর এস এস জোটের বিরুদ্ধে লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। নয়া উদারনীতির বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অবিচ্ছেদ্য ভাবে যুক্ত।

রাজনৈতিক লাইন প্রসঙ্গে খসড়ায় বলা হয়েছে, গত চার বছরের মোদী সরকারের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যাচ্ছে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বিচ্ছিন্ন করতে ও জনবিরোধী অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তনে বি জে পি সরকারকে হারাতেই হবে। প্রধান কর্তব্য হলো সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে সমবেত করে বি জে পি ও তার মিত্রদের পরাস্ত করা। কিন্তু এই কাজ করতে হবে কংগ্রেস দলের সঙ্গে কোনও সমঝোতা বা নির্বাচনী আঁতাত না করে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, কেন্দ্রের বি জে পি সরকার এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের রাজ্য সরকার অনুসৃত নয়া উদারনীতির বিরুদ্ধে পার্টি লড়াই চালাবে। জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে গণ সংগ্রামের যৌথ মঞ্চ ও যুক্ত সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, সরকারের ভেতরে বাইরে হিন্দুত্ববাদী শক্তির গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তির ব্যাপকতম সমাবেশের লক্ষ্যে মঞ্চ তৈরি করা জরুরি। তৃণমূল স্তরে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য জনগণের ঐক্য গঠনের ওপরে জোর দেওয়া উচিত। একে রাজনৈতিক বা নির্বাচনী আঁতাত বলে দেখা যাবে না। একই ভাবে গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপরে স্বৈরতান্ত্রিক আক্রমণ রুখতে ব্যাপক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, পার্টির স্বাধীন শক্তি গড়ে তোলার ওপরেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বামপন্থী ঐক্যকে প্রসারিত ও শক্তিশালী করা হবে। সমস্ত বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে নির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করতে হবে। জাতীয় স্তরে রাজনৈতিক প্রচারেও বাম ও গণতান্ত্রিক বিকল্পকে তুলে ধরতে হবে। বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্টে আসতে পারে এমন সব শক্তিকে সমবেত করার চেষ্টা করতে হবে।

এই রাজনৈতিক লাইনের ভিত্তিতে বি জে পি-বিরোধী ভোট সর্বোচ্চ মাত্রায় এক জায়গায় জড়ো করার জন্য যথাযথ নির্বাচনী রণকৌশল নিতে হবে বলে খসড়ায় বলা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্তব্য হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে মোদী সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামকে তীব্রতর করা; কর্মসংস্থান, জমি, খাদ্য, মজুরি, জীবনজীবিকার জন্য লড়াই সংগঠিত করা। বলা হয়েছে, হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পার্টি ও গণ সংগঠনগুলিকে অগ্রভাগে থাকতে হবে। এই লড়াই হবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, মতাদর্শগত। সামাজিক ভাবে নিপীড়িত অংশের স্বার্থরক্ষায় পার্টির তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। মহিলাদের অধিকারকে তুলে ধরতে লাগাতার চেষ্টা করতে করতে হবে। বামপন্থী ও দলিতদের যুক্ত মঞ্চকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় তৎপর হতে হবে। সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় ব্যাপক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক আঁতাতের ফলে দেশে ক্রমবর্ধমান সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের বিরুদ্ধে জনগণকে সমবেত করতে হবে। ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী প্রবণতার বিরুদ্ধে, গণতন্ত্র, শিল্পীর স্বাধীনতা, শিক্ষায় স্বাধিকারের সপক্ষে ব্যাপকতম ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। শ্রেণি ও গণ সংগ্রাম গড়ে তুলে পার্টির স্বাধীন ভূমিকা, গণভিত্তির প্রসার ঘটাতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের ওপরে আক্রমণ, পার্টি ও বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে হিংসা প্রতিহত করার লড়াইয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ত্রিপুরা, কেরালার বাম সরকারকে রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। যুক্ত কর্মসূচির ভিত্তিতে বাম ঐক্যকে শক্তিশালী করতে হবে। বামপন্থী মঞ্চের এই জাতীয় তৎপরতাই হবে বাম ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচির পাশে অন্যান্য গণতান্ত্রিক সংগঠন ও শক্তিকে সমবেত করার ভিত্তি। প্রকৃত বিকল্প— বাম ও গণতান্ত্রিক বিকল্প এইভাবে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠতে পারে।

খসড়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, সি পি আই (এম)-র কর্মসূচিতেই বলা হয়েছে বি জে পি কোনও সাধারণ বুর্জোয়া দল নয়, কেননা ফ্যাসিস্তধর্মী আর এস এস তাকে পরিচালনা করে। বি জে পি সঙ্ঘ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। এখন ২৯রাজ্যের মধ্যে ১৯রাজ্যে বি জে পি একক ভাবে বা জোট করে সরকারে রয়েছে। লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, রাজ্যসভায় একক বৃহত্তম দল। এই প্রথম রাষ্ট্রপতি ও উপ রাষ্ট্রপতি উভয়েই বি জে পি-আর এস এস পরিবারের। কংগ্রেস ও বি জে পি-র শ্রেণি চরিত্র একই। বৃহৎ বুর্জোয়া-ভূস্বামী শ্রেণিগুলির স্বার্থের তারা প্রতিনিধিত্ব করে। কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংগঠনিক শক্তি কমছে। শাসক শ্রেণির প্রধান দলের জায়গা নিয়ে নিয়েছে বি জে পি। কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতার অবস্থান ঘোষণা করলেও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রামে অক্ষমতা দেখিয়েছে। কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীন নয়া উদারনীতি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক আঁতাতের সূচনা করেছে। প্রধান বিরোধী দল হিসাবেও এই নীতিগুলির পক্ষেই তারা সওয়াল করছে। বৃহৎ বুর্জোয়ার রাজনৈতিক প্রতিনিধি বি জে পি ও কংগ্রেস। এমন কোনও রণকৌশলগত লাইন আমরা গ্রহণ করতে পারি না যা কংগ্রেসকে যুক্ত ফ্রন্টের শরিক বা মিত্র হিসাবে বিবেচনা করবে। কিন্তু এখন ক্ষমতায় রয়েছে বি জে পি, আর এস এস-র সঙ্গে তাদের মৌলিক সম্পর্ক, তারাই এখন প্রধান বিপদ। বি জে পি এবং কংগ্রেস উভয়কেই সমান বিপদ বলে বিবেচনা করা যায় না।

খসড়ায় বলা হয়েছে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো নির্দিষ্ট বিষয়ে সংসদে কংগ্রেস ও অন্যান্য ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী দলের সঙ্গে সহযোগিতা করা। সংসদের বাইরে সাম্প্রদায়িক বিপদের বিরুদ্ধে জনগণের ব্যাপত সমাবেশের জন্য সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী দলের সঙ্গে আমরা সহযোগিতা করব। বি জে পি-র সঙ্গী হয়নি এমন আঞ্চলিক দল রয়েছে। জনগণের দাবিদাওয়া নিয়ে, সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরতান্ত্রিক আক্রমণের বিরুদ্ধে যেখানে সম্ভব এই দলগুলির সঙ্গে যুক্ত কর্মসূচি নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কোনও রাজ্যে নির্দিষ্ট আঞ্চলিক দলের ভূমিকা ও রাজনীতি বিচার করেই রণকৌশলগত অবস্থান স্থির করতে হবে। আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে জাতীয় স্তরে আঁতাতের কোনও সুযোগ নেই।

খসড়ায় বলা হয়েছে, পার্টির স্বাধীন শক্তির বিকাশই হলো পার্টির অগ্রগতি ও বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনের চাবিকাঠি।

Featured Posts

Advertisement