ত্রিপুরার ভোটের জন্য কোটি টাকা
তোলা চাইলেন তৃণমূলের মেয়র

অডিও রেকর্ডিং প্রকাশ করলেন বিধাননগরের ব্যবসায়ী

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১৩ই ফেব্রুয়ারি- ত্রিপুরায় ভোটের জন্য এক কোটি টাকা তোলা চেয়ে ব্যবসায়ীকে হুমকি তৃণমূল বিধায়ক সব্যসাচী দত্তের। নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে এক কোটি টাকা দিতে না পারলে ‘ফল খারাপ হবে’ হুমকিও দিয়েছেন এই তৃণমূল নেতা। এমনকি হুমকির পাশাপাশি সদর্পে দাবি, মমতা ব্যানার্জির কাছে গেলেও কোনও লাভ নেই কেননা উনি সব জানেন।

বিধাননগরের মেয়র তৃণমূলী নেতা সব্যসাচী দত্তের বিরুদ্ধে তোলাবাজির এই মারাত্মক অভিযোগ প্রকাশ্যে আনলেন সল্টলেকের বাসিন্দা জনৈক মধুসূদন চক্রবর্তী। চাকরির খোঁজখবর সংক্রান্ত একটি পত্রিকাও চালান তিনি।

এমনকি হুমকি দেওয়া সেই ফোনের রেকর্ডিংও প্রকাশ করেন এই ব্যবসায়ী। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনায় রীতিমত চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে শাসক তৃণমূলের অন্দরেও। মমতা ব্যানার্জির নাম করেই যেভাবে ত্রিপুরার ভোটের জন্য ১কোটি টাকা তোলা চেয়ে হুমকি ফোনের অভিযোগ উঠেছে এই দাপুটে তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে তাতে রীতিমত অস্বস্তিতে তৃণমূল শিবিরও।

প্রাণনাশের আশঙ্কায় সল্টলেকের এই ব্যবসায়ী মধূসুদন চক্রবর্তী কলকাতা প্রেস ক্লাবে রীতিমত সাংবাদিক বৈঠক করে সেই হুমকি ফোনের অডিও ক্লিপিং সামনে আনলেন। সব্যসাচী দত্তের এই টাকা চেয়ে বারেবারে হুমকিতে তিনি ও তাঁর পরিবার প্রাণনাশের শঙ্কায় ভুগছেন বলেও জানিয়েছেন এই ব্যবসায়ী, প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তাও চেয়েছেন। বিধাননগর উত্তর থানায় সোমবারই স্পিড পোস্টে এফ আই আর রুজু করেছেন।

সব্যসাচী দত্ত জানিয়েছেন তিনি এখন ত্রিপুরায়। এই অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, ‘আমি তো এই লোকটাকে চিনিই না। এসব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। যদিও আমার ভয়েস রেকর্ড করা থাকে তবে তা সামনে আনা হোক’। যদিও সব্যসাচী দত্তের বলার আগেই সেই অডিও ক্লিপিংস প্রকাশ্যেই এনেছেন মধুসূদন চক্রবর্তী। রাতে তৃণমূলের একটি সূত্রের দাবি, যেভাবে রীতিমত প্রভাবশালী এই তৃণমূল বিধায়ক ও মেয়রের বিরুদ্ধে প্রেস ক্লাব ভাড়া করে সাংবাদিক বৈঠক করছেন একজন প্রোমোটার ব্যবসায়ী তাতেই বোঝা যাচ্ছে দলের অন্য একটি অংশের মদত আছে। তৃণমূলের শীর্ষস্তরের এক নেতার আবার সংযোজন, সব্যসাচী কিন্তু দলে মুকুল ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।

সব্যসাচী দত্ত ত্রিপুরায় তৃণমূলের পর্যবেক্ষক। ত্রিপুরায় যদিও তৃণমূলের সব বিধায়কই এখন বি জে পি শিবিরে। ত্রিপুরায় বিজয় রাঙ্খলের আই এন পি টি-র সঙ্গে জোট করে ভোটের বাজারে কোনমতে টিকে আছে মমতা ব্যানার্জির দল। ত্রিপুরার ভোটের নাম করে ১কোটি টাকা চাওয়ার আগেই যদিও ঐ ব্যবসায়ীর কাছ থেকেই আরও ২লক্ষ ৩০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন তিনি। ত্রিপুরায় তৃণমূলের ফ্ল্যাগ, ফেস্টুন ব্যানারের জন্যই এই টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ মধুসুদন চক্রবর্তীর। শুধু তৃণমূল নয়, ত্রিপুরায় মমতা ব্যানার্জির জোটসঙ্গী আই এন পি টি-র ফ্ল্যাগ, ফেস্টুনও এই তোলাবাজির টাকায় ত্রিপুরায় পাঠানো হয়েছে বলেই জানা গেছে অডিও ক্লিপিংস থেকে।

অভিযোগ যে উড়িয়ে দেওয়া যায় না তা স্পষ্ট অডিও ও ভিডিও ফুটেজ থেকে। এর আগে পাঞ্জাবসহ উত্তর ভারতে তৃণমূলের পতাকা, ফেস্টুনের জন্য কোটি কোটি টাকার হিসাব অডিট রিপোর্টে দেখানো হয়েছিল। যার জন্য আয়কর দপ্তরের শো-কজের মুখেও পড়তে হয় তৃণমূলকে। এবার ত্রিপুরার ভোটেও তোলাবাজির টাকায় প্রচারের অভিযোগও সামনে এলো।

প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক বৈঠকে সল্টলেকের ব্যবসায়ী মধুসূদন চক্রবর্তী অভিযোগ করেন, ‘ উনি আমার কাছে কোনও টাকা পেতেন না। ত্রিপুরায় দলের কাজের জন্য ১কোটি টাকা লাগবে বলে উনি জানিয়েছেন। আমি ওনার কাছ থেকে ১২ই ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টে পর্যন্ত সময় নিই। উনি ৭ই ফেব্রুয়ারি আমায় ফোন করে বলেন, আমি সব্যসাচী দত্ত বলছি। আমি অন্যের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিয়েছি। ১২তারিখ ৪টের সময় আমার টাকা লাগবে। আপনি যদি টাকা না দিতে পারেন তবে আমার থেকে খারাপ লোক আপনার কাছে কেউ হবে না। এবং আপনি যদি মমতা ব্যানার্জির কাছেও যান, উনিও জানেন গোটা বিষয়টা, ওনার কাছে গিয়েও কোনও লাভ নেই’।

স্পষ্ট অভিযোগ, খোদ মুখ্যমন্ত্রী এই কোটি টাকা তোলাবাজির বিষয়ে সম্পূর্ণ অবহিত। সব্যসাচী দত্তের ঘনিষ্ঠ অংশের দাবি, দাদা তো ত্রিপুরায় দায়িত্বে। ফলে ভোটের খরচের জন্যে টাকা লাগলে তা মুখ্যমন্ত্রীকে না জানিয়ে কি দাদা তুলতে পারে?’

আর এখানেই তোলাবাজির ঘটনায় একেবারে সামনে এসেছে মমতা ব্যানার্জির প্রসঙ্গই। কিছুদিন আগেই দলীয় সভায় বলেছিলেন, ‘আমাদের গরিব দল, টাকা নেই। টাকা থাকলে ত্রিপুরায় সব আসনে প্রার্থী দিতে পারতাম’। আর এবার সেই ত্রিপুরার দলের প্রচারের নামে এরাজ্যের ব্যবসায়ীকেই কোটি টাকা তোলা চেয়ে হুমকি দিচ্ছেন তাঁরই দলের বিধায়ক, এবং সেই হুমকির রক্ষাকবচও মুখ্যমন্ত্রী নিজেই।

এমনকি এদিন তিনি অভিযোগ করেন, মুখ্যমন্ত্রীর নাম করে এই তোলাবাজির ঘটনার তৃণমূল শীর্ষ নেতাদের কয়েকজনকে জানানো হলেও তাঁরা বলেন আপনি নিজেই মিটিয়ে নিন। ওঁর অনেক ক্ষমতা, আপনি পারবেন না ওঁর সঙ্গে।

মধুসূদন চক্রবর্তী ও সব্যসাচী দত্তের সেই ফোনালাপেও স্পষ্ট কতটা বেপরোয়া হয়েই এই তৃণমূল বিধায়ক মুখ্যমন্ত্রীকে জানালেও কোনও লাভ হবে না বলে নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন:

-হ্যালো সব্যসাচী বলছি। বলছি আমি একজনের থেকে লোন নিয়ে নিয়েছি, বলেছি ১২তারিখে বিকাল পাঁচটার সময় দেব।

- বস আপনি নিশ্চিত থাকুন, আমি টাকাটা আপনাকে পৌঁছে দেব দাদা।

-না না, ডেটটা যদি ফেইল করে না আমার বেইজ্জতি হয়ে যাবে। আপনাদের তো বেইজ্জতির কোনও কিছু নেই।

- দাদা এরকম বলবেন না, আমি আপনাকে পৌছে দেব।

-ডেটটা যেন ফেইল না হয়। ফেইল হলে দেখবেন আমার চেয়ে বড় খারাপ কেউ হবে না আপনার কাছে, আমি বলে দিলাম।

-দাদা আমি তো আপনাকে বলছি আমি করে দেব।

-আপনি তার জন্য যার কাছে খুশি যেতে পারেন।...আপনি মমতা ব্যানার্জিকে বললেও আমার কিছু না, কেননা তিনি জানেন ভালো করে’।

এই কথোপকথনের রেকর্ডিং মধুসূদন চক্রবর্তী এদিন সাংবাদিকদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তিনি এফ আই আর-এ অভিযোগ করেছেন ২রা ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে দশটার সময় সব্যসাচী দত্ত আমাকে ফোন করে ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের ভোটের প্রচারে বিপুল পরিমাণ ফ্ল্যাগ, ফেস্টুন বানানোর জন্য ২লক্ষ ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন। আমি আমার অফিসে ( সি এফ-১০৯/ সেক্টর-১, সল্টলেক) তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে গাঙ্গুলি প্রিন্টার্সের বিদ্যুৎ গাঙ্গুলির কাছে সেই টাকা নগদে দিই। তারপরে আবার ৩রা ফেব্রুয়ারি সব্যসাচী দত্ত ফোন করে ত্রিপুরার ভোটের জন্য টাকা দাবি করেন। ৬তারিখে আমি জানাই যে ১কোটি টাকা দিতে পারবো না। তারপরেও তিনি চাপ দিয়ে বলেন ১২তারিখ ৪টের মধ্যে টাকা দিতে হবে। ৭ই ফেব্রুয়ারি ফোন করে আবার হুমকি দেন টাকা না দিলে পরিণাম খারাপ হবে। এদিন প্রেস ক্লাবে তিনি জানান, সব্যসাচী দত্ত নাকি জানিয়েছেন যে সোনা কারবারিদের কাছ থেকে টাকা জোগাড় করেছেন সেই টাকা শোধ করতে হবে। ত্রিপুরার ভোটের জন্যই টাকা চাওয়া হয়েছে।

১২তারিখে টাকা দিতে না পারার পরিণামে রীতিমত প্রাণনাশের আশঙ্কায় ভুগছেন তিনি। যদিও সল্টলেকের স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অভিযোগকারী ব্যক্তির ভাবমূর্তিও ভালো নয়। ব্যাঙ্ক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া আছে। জেলও খেটেছেন। এমনকি একাধিক জায়গায় আবাসন প্রকল্প করে একই ফ্ল্যাট অনেকের কাছে বিক্রি করার মতো প্রতারণার ঘটনার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। শাসক তৃণমূলের একটি অংশের সঙ্গেই তাঁর ঘনিষ্ঠতা আছে।







Featured Posts

Advertisement