দুষ্কৃতী হামলার শঙ্কায়
রয়েছেন খোদ মেয়রই

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৩ই মার্চ , ২০১৮

কলকাতা, ১২ই মার্চ- তিনি মেয়র। তাঁর হাতে এখনও রয়েছে তিন তিনটি দপ্তর। তিনি এখনও শাসক তৃণমূলের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সভাপতি।

রাজ্যে তৃণমূল সরকার। দাপট প্রায় সর্বত্র। তৃণমূলের সেই ভরা জমানাতেই এবার মেয়র শোভন চ্যাটার্জিকেই পুলিশের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে নিজের ওপর হামলার আশঙ্কায়। প্রাণনাশের শঙ্কায় ভুগছেন। ভয়ের কন্ঠস্বর তাঁর গলায়, ‘ আমি এখন বিপন্ন বোধ করছি। শান্তিপূর্ণ ভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আমার আছে, সেই অধিকার কেউ তো কেড়ে নিতে পারে না’।

কলকাতার মেয়র কলকাতা পুলিশের কাছে এফ আই আর করছেন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে। বিপন্নতা অনুভব করছেন তিনি!

সম্ভবত গত সাত বছরের তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা এমন নিদারুণ বিজ্ঞাপন দেখা এর আগে কখনও দেখা যায়নি। সংগত কারণেই তাই বিরোধীদের অভিযোগ, যদি মেয়র তথা রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি দপ্তরের মেয়রের এই হাল হয় তাহলে রাজ্যবাসীর নিরাপত্তার কী অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়, বিরোধীদের দলের কর্মী, সংগঠকদের কথা না হয় বাদই দেওয়া গেল।

প্রকাশ্যে এভাবে মেয়রের এই ‘বিপন্নতা’ প্রকাশ ও থানায় এফ আই আর রুজুর ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই সরকার, পুলিশ প্রশাসনও বিরক্ত।

তার মধ্যেই হাজারো গুঞ্জন উপেক্ষা করেই শোভন চ্যাটার্জি কার্যত মুখ্যমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ করেই বলেছেন, ‘আমি ইস্তফা দিচ্ছি না’।

শহর কলকাতা শুধু নয়, গোটা রাজ্যবাসীর কাছে রীতিমত একের পর এক লজ্জার উদাহরণ তৈরি হচ্ছে তৃণমূলের হাত ধরেই। তৃণমূল বোর্ডের মেয়র একাধিক থানায় সর্বমোট ছটি এফ আই আর রুজু করেছেন তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে। তাঁর স্ত্রী পালটা এফ আই আর রুজু করেছেন মেয়রের বিরুদ্ধে। মেয়র সর্বশেষ রবীন্দ্র সরোবর থানায় এফ আই আর রুজু করেছেন তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে। তাঁর নতুন ঠিকানা অর্থাৎ গোলপার্কের ফ্ল্যাট থেকে তাঁকে দুষ্কৃতীদের দিয়ে উচ্ছেদ করানোর মত গুরুতর শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। এমনকি তিনি কতটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তাও বলছেন। খাস কলকাতার মেয়রের এই কীর্তিকলাপে যে তৃণমূল পৌরবোর্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে দিয়েছে তা টের পাচ্ছে শাসক দলও। এদিকে এদিন রাতেই গোলপার্কে মেয়র যে ফ্ল্যাটে রয়েছেন সেখানে যায় রবীন্দ্র সরোবর থানার পুলিশ। তাঁর দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন পুলিশ আধিকারিকরা।

এর আগে রাজ্যের সুপারিশেই তাঁর নিরাপত্তার বহর ছাঁটাই করা হয়। তারপরেও জেড ক্যাটেগরির নিরাপত্তা পাচ্ছিলেন তিনি। তারপরেও তাঁর এই নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ প্রকাশের বহর দেখে তৃণমূলের অভ্যন্তরেই চাপানউতোর শুরু হয়েছে।

তৃণমূল সূত্রের খবর মেয়র ও মন্ত্রীত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে কয়েকদিন আগে নিজেই দলকে চিঠি দিয়েছিলেন মেয়র শোভন চ্যাটার্জি। যদিও এখন তাঁর অবস্থান, নিজে থেকে কোনও ইস্তফা দেবেন না, সব গুঞ্জন চলছে। তৃণমূলের রাজ্য স্তরের এক নেতার কথায়, ‘পরিস্থিতি যেদিকে গেছে এখন তাতে শোভন চ্যাটার্জি আসলে চাইছেন তাঁর বিরুদ্ধে দল কোনও ব্যবস্থা নিক। মানে দল যেন ওকে তাড়ায় তাহলে ও শহীদ হতে পারবে’। ইতিমধ্যে দলের কোর কমিটির বৈঠকে তিনি ডাক পাননি। দক্ষিণ ২৪পরগনা জেলা সভাপতি থাকলেও কোনও কর্মসূচিতে যাচ্ছেন না। তাহলে কি অন্য কোনও শিবির? সেই প্রসঙ্গ যদিও উড়িয়ে দিয়েছেন মেয়র।

গত ৪ঠা নভেম্বর থেকে বেহালার বাড়ি ছেড়ে মেয়র থাকছেন দক্ষিণ কলকাতার গোলপার্কের সামনে একটি বহুতলে। সেই বহুতল থেকেও তাঁকে দুষ্কৃতীদের দিয়ে উচ্ছেদ করানো হতে পারে, সেই শঙ্কাতেই রবিবার রবীন্দ্র সরোবর থানায় এফ আই আর দায়ের করেছেন শোভন চ্যাটার্জি। তাঁর কথায়, ‘একটি পারিবারিক সমস্যার মধ্যে আছি। আমার পৈতৃক বাড়ি থেকে বিতর্ক এড়াতে এক কাপড়ে অন্য জায়গায় চলে এসেছি। দক্ষিণ কলকাতার একটি জায়গায় রয়েছি। আমি এখানে প্রপার সিকিউরিটি চাইছি। শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার জন্য পুলিশের কাছে আবেদন করেছি। আমি বিপন্ন বোধ করছি। কাউকে না বিরক্ত করে এখানে নিজের মত করে বাস করার অধিকার তো কেউ আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে না’।

সরাসরি অভিযোগের তির তাঁর স্ত্রী রত্না চ্যাটার্জির বিরুদ্ধে। যদিও এদিন রত্না চ্যাটার্জি পালটা অভিযোগ করেছেন, ‘উনি যে ফ্ল্যাটে রয়েছেন সেটা আমার ভাই শুভাশিসের। ভাইয়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই তিনি ওখানে রয়েছেন। এখন হয়তো ওঁর মনে হচ্ছে, ভাই ওঁকে উঠে যেতে বলবে। আইনি নোটিস পাঠালে তিনি যদিও উঠে যেতে বাধ্য। কিন্তু, আমরা কেউই তেমন ভাবিনি। তিনি কেন ভাবলেন দুষ্কৃতী দিয়ে ফ্ল্যাট দখল করব’।

এদিকে আবার মেয়রের করা মামলাতে আগাম জামিন পেয়েছেন রত্না চ্যাটার্জি ও তাঁর বান্ধবী ঝুমা সাহা। পর্ণশ্রী থানায় রত্না চ্যাটার্জির বিরুদ্ধে হামলা, জোর করে বাড়ি দখলের অভিযোগ করেছিলেন শোভন চ্যাটার্জি। আলিপুর জেলা ও দায়রা আদালত এদিন রত্না চ্যাটার্জি সহ চারজনের আগাম জামিনের আবেদন মঞ্জুর করে।

এদিকে মেয়র ঘনিষ্ঠ শিবিরের অভিযোগ, নারদ কাণ্ডের পরেও নিশ্চিত ছিলেন যে ব্যক্তি তিনি এতটা বিপাকে পড়লেন কীভাবে এটা একটা রহস্য। এর পিছনে তৃণমূলেরই এক দাপুটে মন্ত্রীর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। অন্যদিকে যেভাবে মেয়রের ঘনিষ্ঠ মিল্লি আমিন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়কে ওয়েবকুপার কমিটির থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় মেয়র দলের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন তাতে ক্ষুব্ধ তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বও। যদিও এই অবস্থায় এখনই আবার সরাসরি মেয়রকে ঝেড়ে ফেলতেও দ্বিধায় রয়েছে তৃণমূল।

অন্যদিকে গোটা ঘটনার ওপর নজর রাখছে সি বি আই। দুই কেন্দ্রীয় সংস্থার ম্যারাথন জেরার মুখে ইতিমধ্যে পড়েছেন মেয়র। তাঁর স্ত্রী রত্না চ্যাটার্জিকে ইডি জেরা করেছে। মেয়রের বিরুদ্ধে একাধিক তথ্য মিলেছে রত্না চ্যাটার্জির বয়ানে।

সব মিলিয়ে কলকাতার মেয়র তথা মন্ত্রী শোভন চ্যাটার্জিকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে চাঞ্চল্য তৈরি হওয়ার এই ঘটনা চলতি সপ্তাহেই নতুন মোড় নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বুধবার শেষ হচ্ছে কলকাতা কর্পোরেশনের বাজেট অধিবেশন। তারপরে ঘটনা কোনদিকে গড়ায় তার দিকেই নজর সব মহলের।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement