ধার ক‍‌রে দাতা সাজা

  ১৩ই মার্চ , ২০১৮

পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে বর্তমান শাসক তৃণমূলের প্রধান অভিযোগ ছিল বামফ্রন্ট নাকি ঋণের ভারে রাজ্যকে ডুবিয়ে গেছে। আকণ্ঠ ঋণের জেরে রাজ্যকে কার্যত দেউলিয়া করে দিয়েছে বামফ্রন্ট সরকার। কীভাবে দেউলিয়া হলো রাজ্য? বা কত ঋণের বোঝা চাপানো হয়েছে রাজ্যবাসীর ওপর? ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার সময় রাজ্যে পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এই পুঞ্জীভূত ঋণের সবটার দায় বামফ্রন্ট সরকারের নয়। ১৯৭৭ সালের আগের ৩০ বছর ধরে বিভিন্ন সরকার যে ঋণ নিয়েছে সেটাও যুক্ত আছে ১ লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ক্ষমতায় এলে তারা রাজ্যকে এবং অবশ্যই রাজ্যবাসীকে এই ভার থেকে রেহাই দেবেন।

তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছে। মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। বস্তুত মুখ্যমন্ত্রীর একক নেতৃত্বেই চলছে সরকার ও দল। সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ পড়ছে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এবং অনুপ্রেরণায়। কিন্তু সমস্যা হলো ক্ষমতায় আসার আগে এবং ক্ষমতায় আসার জন্য অতীতে যা যা বলেছিলেন বা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্ষমতায় আসার পর তার সবটাই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন ডাস্টবিনে। এখন সব কিছুই নতুন কথা, নতুন ব্যাখ্যা, নতুন দাবি। এমন প্রত্যাখ্যাত বা সচেতনভাবে ভুলে যাওয়া হাজারো বিষয়ের মধ্যে সরকারের ঋণ অন্যতম একটি। আশ্চর্যজনকভাবে তিনি ক্ষমতায় এসেই ঋণ সংক্রান্ত অতীত অবস্থান গিরগিটির রং বদলের মতো পালটে ফেললেন। ক্ষমতায় এসে ঋণ নেওয়া বন্ধ করা বা কমানো তো দূরের কথা আগের সরকারের থেকেও বহরে বেশি ঋণ নিতে শুরু করেন। প্রশ্ন উঠলেই তাঁর সাফ জবাব, আগের সরকারের ঋণ শোধ করতেই তাঁকে বাধ্য হয়ে ঋণ নিতে হচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রীর এই যুক্তির মধ্যে যদি সামান্যতম সত্য থাকত তাহলে ধীরে ধীরে হলেও সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণ কমতো। কারণ ঋণ যদি শোধ করা হয় তাহলে সাধারণ নিয়মেই মোট ঋণের পরিমাণ কমে। কিন্তু তৃণমূল সরকারের সৌজন্যে কমার বদলে ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী রাজ্যের মোট পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৩ লক্ষ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। গত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আগামী বছর মার্চ মাস পর্যন্ত মোট ঋণের পরিমাণ ৩ লক্ষ ৯৪ হাজার কোটি টাকা হবে বলে জানিয়েছেন। অর্থাৎ মমতা ব্যানার্জির সরকার ঋণ কমানো তো দূরের উলটে ৮ বছরের শাসনে পুরানো ঋণের সঙ্গে অতিরিক্ত ২ লক্ষ ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর ৬৪ বছরে বিভিন্ন সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ যেখানে ১ লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকা সেখানে মমতার ৭ বছরে ২ লক্ষ ২ হাজার কোটি টাকা।

আগে মাসে একবার বা দুতিন মাসে একবার নেওয়া হলেও এখন মাসে তিনবারও ঋণ নেওয়া হচ্ছে। আগে সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া হলেও এখন নেওয়া হচ্ছে খোলা বাজার থেকে। সরকারি ঋণ হয় দীর্ঘমেয়াদি এবং কম সুদের। বাজারি ঋণ হয় স্বল্প মেয়াদি এবং বেশি সুদের। মমতা ব্যানার্জি শুধু অত্যধিক ঋণ নিচ্ছেন তা নয়, তাঁর নেওয়া ঋণ শোধ দিতে হবে তাড়াতাড়ি এবং গুনতে হবে অনেক বেশি সুদ। এইভাবে ঋণের বহর বাড়তে থাকায় যখন প্রশ্ন উঠতে থাকে তখন মুখ্যমন্ত্রী ভোল বদলে নতুন যুক্তি হাজির করেন। তিনি ঋণ নিচ্ছেন আসলে রাজ্যের উন্নয়নের জন্য। উন্নয়ন কোথায় হচ্ছে সেটা চোখে না পড়লেও মানুষ দেখছেন দরাজ হাতে সরকারি টাকায় হরিলুটে তাঁর কোনও বিরাম নেই। হাজার রকম প্রকল্প ঘোষণা করে শুধু টাকা বিলিয়ে চলেছেন। খেলা-মেলা, সম্মান-পুরস্কার আর ক্লাব খয়রাতিতে প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে শত শত কোটি টাকা। সরকারের নামে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা বাজার থেকে ধার নেওয়া হচ্ছে আর তা বিলিয়ে উন্নয়ন হচ্ছে। ফলে পুঞ্জীভূত ঋণ হু হু করে বাড়ছে। এখন তবুও কোনও রকমে ধার করে ধার শোধ করা যাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে সেটাও সম্ভব হবে না। রাজ্য সত্যি সত্যি দেউলিয়া হয়ে যাবে। মমতা জানেন তার আগেই তিনি ক্ষমতা হারাবেন। অতএব যত পার ঋণ নাও। ধার করে দাতা সাজ।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement