একই ব্যক্তি চার পরিবারের সদস্য
কাজ না করেই টাকা লুট পাহাড়পুরে

অনির্বাণ দে

ইসলামপুর : ১৩ই মার্চ— এম জি এন আর ই জি এ প্রকল্পের কাজে ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে মুর্শিদাবাদে। জেলার ইসলামপুর ব্লকে। পাহাড়পুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে। এই পঞ্চায়েতটি পরিচালনা করে তৃণমূল কংগ্রেস। এম জি এন আর ই জি এ-র ওয়েবসাইটে এলাকায় ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে কাজের হিসাব দেখতে গিয়ে অবাকই হয়েছেন এলাকার যুবকরা। সামনে তথ্য নিয়ে আসা হলে ক্ষোভ ছড়ায় গ্রামেও। প্রতিবাদে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে জেলা শাসকের দপ্তরেরও।

অভিযোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যে সমস্ত শ্রমিককে কাজ দেওয়া হয়েছে বলে তালিকায় নাম রয়েছে সেই নামের ব্যক্তিরই কোনও অস্তিত্ব নেই পাহাড়পুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কোনও গ্রামে। মাসটাররোলে ব্যবহার করা হয়েছে ভুয়ো জব কার্ড। অভিযোগ সামনে আসায় তদন্তের বদলে বিষয়টা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে প্রশাসনিক স্তরে। যে জবকার্ডগুলি ব্যবহার করা হয়েছে, জেলাশাসকের দপ্তরে অভিযোগ জমা পড়ার পর সেগুলি ‘নাকি’ সরিয়ে ফেলা হয় সার্ভার থেকেও। বিভিন্ন পেমেন্ট ডিটেলস ঘাঁটলে দেখা গেছে, একটি নামকেই বারবার বিভিন্ন পরিবারের সদস্য হিসাবে দেখানো হয়েছে।

নাহিদ হাসানের পুকুরের সংস্কারের কাজ। ২০১৬ সালের ১৪ই ডিসেম্বর থেকে ২৭শে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই কাজ হয়েছে বলে লেখা। দেখানো হয়েছে ১৫৩৮৬ শ্রমদিবস। খরচ হয়েছে সাতাশ লক্ষাধিক টাকা। এই কাজে সোহরাব শেখ, খায়ের শেখ, সোহাব শেখ, তুরাব শেখ, কাজেম আলি- এই নামগুলি আলাদা আলাদা পরিবারের সদস্য হিসাবে দেখানো হয়েছে। যা বাস্তবে অসম্ভব। একই নাম একই পরিবারে একাধিকবার ব্যবহার করেও টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

মাস্টাররোলে অসংগতি থেকেই স্পষ্ট কোনও কাজ না করেই আত্মসাৎ করা হয়েছে বরাদ্দ টাকা। পঞ্চায়েত প্রধান, সদস্যদের পাশপাশি এলাকাবাসীর অভিযোগ, রানিনগর এক নম্বর ব্লকের বি ডি ও-র বিরুদ্ধে। সি পি আই (এম) নেতৃত্বের বক্তব্য, এম জি এন আর ই জি এ-র মাস্টাররোল জেনারেট করার দায়িত্ব বি ডি ও-র। তিনিই এক্ষেত্রে নোডাল অফিসার। বি ডি ও গোবিন্দ নন্দীও এই লুটে অভিযুক্ত। সি পি আই (এম) দুর্নীতির তদন্ত করে অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে। পাহাড়পুর দশ নম্বর ওয়ার্ডে ক্যানেল খোঁড়ার কাজে পাওয়া গেছে আসাদুল শেখের নাম। যিনি ডব্লিউ বি-১২-০২১-০০৫-০১০/৬২৯ কার্ডের মালিক কামাল শেখ, ডব্লিউ বি-১২-০২১-০০৫-০১০/৭৩১এর মালিক জাবিল শেখ, ডব্লিউ বি-১২-০২১-০০৫-০১০/ ৭৪৫ কার্ডের মালিক গাজি রহমান এবং ডব্লিউ বি-১২-০২১-০০৫-০১০/ ৭৫১ সামিরুল শেখের পরিবারের সদস্য এবং কর্ম প্রার্থী হিসাবে দেখানো হয়েছে। একই সাথে চার পরিবারের সদস্য! সুকমান শেখ নামটি ব্যবহার করা হয়েছে সাতটি পরিবারের সদস্য হিসেবে। এগুলো উদাহরণ মাত্র। প্রতিটি মাস্টাররোল খুঁটিয়ে দেখলেই উঠে আসছে অসংগতি। ২৫টি বুথ ঘুরেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না জবকার্ডের মালিকদের। ওয়েবসাইটে জবকার্ড রেজিস্টার থেকে মাস্টাররোলগুলিতে থাকা সমস্ত নাম উধাও হয়ে যাওয়াই প্রমাণ করে কীভাবে টাকা লুট করা হয়েছে। এতগুলি মাস্টাররোলের সব নামই ভুয়ো! দেখে অবাক হচ্ছেন পোড় খাওয়া পঞ্চায়েত আধিকারিকরাও। তৃণমূলের আমলে এটাই সম্ভব।

২০১৬ -২০১৭ অর্থবর্ষের কাজের তালিকা অনুযায়ী বেশ কিছু রাস্তার কাজ হয়েছে পাহাড়পুরে । কিন্তু গ্রামবাসীরা জানাচ্ছেন সবটাই জালিয়াতি। পি ডব্লু ডি রোড থেকে ক্যাথাউড়ি ক্যানেল পর্যন্ত মাটির রাস্তা নির্মাণের নামে তোলা হয়েছে তের লক্ষ টাকা। ইসাবপুর তিন মাথা মোড় থেকে জাহিরুল হকের বাড়ির পর্যন্ত মাটির রাস্তা দীর্ঘদিনের। কোনও সংস্কারও হয়নি এই রাস্তায়। পড়েনি এক ভ্যান মাটিও । রাস্তায় লাগানো হয়নি কাজের সাইনবোর্ডও। তবু দেখানো হয়েছে পনেরো লক্ষ টাকার কাজ হয়েছে ওই রাস্তায়।

লুটের কাজ নির্বিঘ্নে করতে এলাকায় কায়েম করা হচ্ছে সন্ত্রাস। ভয় দেখানো হচ্ছে বি ডি ও-র অফিসে যেন অভিযোগ জমা না পড়ে। অভিযোগ জমা পড়ার পর, চাপ দিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটেছে।

মহেশপুরের তন্ময় মণ্ডল, কালীপদ মণ্ডলের ব্যক্তিগত পুকর কাটা হয়েছে জে সি বি দিয়ে। পুকুরের মাটি বিক্রি করা হয়েছে স্থানীয় ইটভাটার মালিকদের কাছে। অথচ টাকা তোলা হচ্ছে একশো দিনের কাজের প্রকল্প থেকে। ওয়েবসাইটে দেওয়া তালিকার সাথে বাস্তব মেলাতে গিয়ে তাই হিমশিম খাচ্ছেন গ্রামের মানুষ। একাধিকবার বি ডি ও অফিসে পাহাড়পুর পঞ্চায়েতের দুর্নীতি নিয়ে ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে। প্রতিবারই অভিযুক্তদের হয়েই কাজ করেছে প্রশাসন। ২৭শে ফেব্রুয়ারি জেলাশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন সি পি আই (এম) ইসলামপুর এরিয়া কমিটির সদস্য সরওয়ার্দি মণ্ডল। তালিকাতে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের ২৪টি ভুয়ো কাজের তালিকা। প্রশাসন কি পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গ্রাম।

Featured Posts

Advertisement