দূষণে, অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে
ম্যানগ্রোভ, হুঁশ নেই সরকারের

আয়লার পরও বেড়েছিল, ছ’ বছরে কমেছে ৪১ বর্গ কিমি

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৪ই মার্চ , ২০১৮

কলকাতা, ১৩ই মার্চ— কমে যাচ্ছে শুধু নয়, লাগাতার পাতলা হয়ে যাচ্ছে রাজ্যের ম্যানগ্রোভ অরণ্য। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ এগিয়ে চলেছে গুরুতর বিপর্যয়ের দিকে।

ম্যানগ্রোভকে বলা হয় ‘ভ্যানগার্ড অব সী কোস্ট’। প্রবল সামুদ্রিক ঝড়ের গতি, ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে বাদাবন বা ম্যানগ্রোভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দেশের সাম্প্রতিক ম্যানগ্রোভ সেনসাস কিংবা বাদাবন সমীক্ষা জানাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে এই লবণাক্ত মাটির বনাঞ্চল কমছে। দেশে দুবছর অন্তর সুন্দরবনসহ দেশের সব অরণ্যভূমিতে এই সমীক্ষা হয়। সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া, বাইন, কেওড়াসহ ম্যানগ্রোভ এলাকারও পৃথকভাবে সমীক্ষা হয়। ইন্ডিয়ান স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্ট এই সমীক্ষা করে। সর্বশেষ সমীক্ষা হয়েছে ২০১৭-তে। সেই রিপোর্ট বেরিয়েছে সম্প্রতি। রাজ্যের বন দপ্তরে সেই রিপোর্ট পৌঁছেছে।

সমীক্ষা রিপোর্ট জানাচ্ছে — পশ্চিমবঙ্গে বরাবরের মত দুই ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুরে বাদাবন আছে। এখন ম্যানগ্রোভ অরণ্য ক্ষেত্র ২১১৪ বর্গ কিমি। ২০০৯-এ পশ্চিমবঙ্গে ম্যানগ্রোভ ছিল ২১৫২ বর্গ কিমি। ২০১১-তে তা হয়েছিল ২১৫৫ বর্গ কিমি। অর্থাৎ আয়লার বিপর্যয়ের পরেও রাজ্যে ম্যানগ্রোভ বেড়েছিল ৩ কিমি। কিন্তু গত ছ’ বছরে ৪১ বর্গ কিমি কমেছে। রাজ্যের বন দপ্তরের এক অফিসার ইন্ডিয়ান স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্ট উল্লেখ করে মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ১৯৮৭-র পর লাগাতার রাজ্যে ম্যানগ্রোভের পরিমাণ বেড়েছিল। ১৯৮৭-তে ছিল ২০৭৬ বর্গ কিমি। কিন্তু হঠাৎই ২০১৩-র পর্যালোচনায় দেখা যায় সুন্দরবনসহ পশ্চিমবঙ্গে ম্যানগ্রোভের এলাকা কমছে।

তারপর লাগাতার ফাঁকা হচ্ছে বাদাবন। ধসছে রাজ্যের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয়।

তিন ধরনের ম্যানগ্রোভ হয়। খুব গভীর ম্যানগ্রোভ। এই ম্যানগ্রোভ দেশের তিনটি রাজ্যের উপকূলে দেখা যায়। সেগুলি হলো — পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা এবং আন্দামান এবং নিকোবর। মাঝারি গভীর ম্যানগ্রোভ। এবং খোলা জায়গার ম্যানগ্রোভ। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দুটি ক্ষেত্রের ম্যানগ্রোভ বিপুল আকারে কমেছে। রাজ্যের সমুদ্র বিজ্ঞানীদের মতে এই প্রবণতা খুবই বিপজ্জনক। শুধু তাই নয়, ‘খুব গভীর বাদাবন’ এবং মাঝারি গভীর বাদাবন’ — বিপর্যয় মোকাবিলায় সবচেয়ে শক্তিশালী এই দুই এলাকার ম্যানগ্রোভ। পশ্চিমবঙ্গে কমেছে এই দুই এলাকার ম্যানগ্রোভ। বেড়েছে যা, তা হলো অপেক্ষাকৃত পাতলা (ওপেন এরিয়া) ম্যানগ্রোভ। যার মাঝে মাঝে টাকের মত ফাঁকা এলাকা। দূরে দূরে গরান, গেঁওয়া, বাইনের ভিড়। বনদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজ্যে খুব গভীর ম্যানগ্রোভ অরণ্য অঞ্চল ২০১১-তে ছিল ১০৩৮ বর্গ কিমি। ২০১৭-তে তা নেমে এসেছে ৯৯৯ বর্গ কিমিতে। মাঝারি ম্যানগ্রোভ অঞ্চল ২০১১-তে ছিল ৮৮১ বর্গ কিমি। ছ’ বছরে তা নেমে এসেছে ৬৯২ বর্গ কিমিতে। বেড়েছে খোলা বাদাবন এলাকা — ২৩৬ বর্গ কিমি থেকে হয়েছে ৪২৩ বর্গ কিমি।

কেন মরছে বাদাবন? কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হচ্ছে প্রাথমিকভাবে। প্রথমত, জলের নুনের পরিমাণ লাগাতার বাড়ছে। বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড টেনে নেয় বাদাবন। পরিবেশে লাঘব করে দূষণের ভার। সেই কার্বন ডাই অক্সাইডকে বাদাবনের লবণাক্ত জলের উদ্ভিদ গ্লুকোজে রূপান্তরিত করে। তার প্রভাবেই বেড়ে চলে ম্যানগ্রোভ। কিন্তু একদিকে পুরানো গাছের কার্বন ডাই অক্সাইড টানার ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবে কমছে অন্যদিকে ম্যানগ্রোভের পরিমাণ কমছে, ফলে বাড়ছে দূষণ। আবার লাগাতার নুনের পরিমাণ বাড়ছে বলে ক্ষতি হচ্ছে গাছের, নতুন জন্মের। মিষ্টি জল সমতল থেকে বয়ে নিয়ে যাওয়া বিদ্যাধরীর মত নদীগুলির মুখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সুন্দরবনের নদীতে লাগাতার বাড়ছে নুনের হার। পাশাপাশি উপকূল সংলগ্ন জনপদে লাগামছাড়া নির্মাণ, বর্জ্য নিষ্কাশন, নদীতে এন্তার জ্বালানী তেল ছড়ানোর মত কাজগুলিই ক্রমশ বাদাবনের বিস্তীর্ণ এলাকা ফাঁকা করে দিচ্ছে।

রাজ্যের তিনটি জেলায় ম্যানগ্রোভের অস্তিত্ব আছে — দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুর। কিন্তু সর্বশেষ সমীক্ষায় স্পষ্ট — পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূল থেকে ম্যানগ্রোভ বিলুপ্ত হতে বসেছে। ২০১১-য় সেখানে ১১ বর্গ কিমি ম্যানগ্রোভের অস্তিত্ব মিলেছিল। তার মধ্যে খুব গভীর ম্যানগ্রোভ ছিল ৪ বর্গ কিমি, মাঝারি গভীর ম্যানগ্রোভ ছিল ২ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে। এই জেলায় গভীর ম্যানগ্রোভ অঞ্চল বিনষ্ট হয়েছে। মাঝারি ম্যানগ্রোভ এলাকা এসে ঠেকেছে ১ বর্গ কিমিতে। বাদাবনের ক্ষেত্রে পাতলা এলাকা (ওপেন এরিয়া) ম্যানগ্রোভ পূর্ব মেদিনীপুরে ২০১১-তে ছিল ৫ বর্গ কিমি এলাকায়। তা দাঁড়িয়েছে ৩ বর্গ কিমি এলাকায়। অদূর ভবিষ্যতে পূর্ব মেদিনীপুরের সমুদ্র উপকূল বাদাবনহীন হতে চলেছে এমনই আশঙ্কা করছেন রাজ্যের সমুদ্র বিজ্ঞানের ছাত্র, বিশেষজ্ঞরা।

বাদাবন রয়েছে দুই ২৪ পরগনার সুন্দরবন এলাকায়। তার মধ্যে দক্ষিণ ২৪ পরগনাই প্রধান। এই জেলায় বিপুল পরিমাণ খুব গভীর এবং মাঝারি গভীর ম্যানগ্রোভ কমেছে। দুই মিলে ২০১১-তে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ম্যানগ্রোভ ছিল ১৮৮৭ বর্গ কিমি। ২০১৫-তে তা নেমে এসেছে ১৬৬৬ বর্গ কিমিতে। উত্তর ২৪ পরগনায় ২০১১-তে গভীর ও মাঝারি ম্যানগ্রোভ ছিল ২৬ বর্গ কিমি। তা দাঁড়িয়েছে ২৪ বর্গ কিমি। যদিও এই জেলায় গভীর মানগ্রোভ ছ’ বছরে ২০ থেকে ১৩ বর্গ কিমিতে নেমে এসেছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement