এক বিরল লড়াই

  ১৪ই মার্চ , ২০১৮

লড়াই কাকে বলে, কীভাবে দাবি আদায় করে আনতে হয় তা দেখিয়ে দিয়েছেন মহারাষ্ট্রের কৃষকরা। আনুষ্ঠানিক বা প্রথামাফিক কোনও মিছিল নয়, সাংগঠনিক দায়িত্ব হি‍সাবে কিছু একটা করা নয়। একেবারে জীবনযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অদম্য জেদ আর সাহসিকতায় ভর করে শেষ দেখার মরণপণই এই লড়াইয়ের উৎস। তাই আবেগ আর স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে জয় করে আনার প্রতিজ্ঞা মিলেমিশে এমন এক জঙ্গি লড়াইয়ের জন্ম দিয়েছে ভূ-ভারতে সত্যিই তা বিরল। সাতদিনের লঙ মার্চ। নাসিক থেকে মুম্বাই। খাবার অনিশ্চিত, রাত্রি যাপন বা বিশ্রামের উপযুক্ত আয়োজন নেই। নেই যেকোনও রকমে অপ্রত্যাশিত সমস্যার মোকাবিলার গ্যারান্টি। তথাপি তাঁদের মাথায় লাল টুপি আর হাতে লালঝান্ডা নিয়ে চলমান লাল জনস্রোত এগিয়ে চলেছে। সঙ্গে অনর্গল স্লোগান। গানের সুরের মূর্ছনায় লড়াইয়ের তেজটাকে একটু ঝালিয়ে নেওয়া। কৃষকের আত্মহত্যার বধ্যভূমিতে এরা সব প্রান্তিক কৃষক খেতমজুর এবং বনাঞ্চলের আশপাশের গরিব আদিবাসী। দেশের মানুষের মুখে খাবার জোগান দেওয়া এই কৃষকরা নিজেদের বাঁচার সংস্থানেই অপারগ। চাষ করে সংসার চলে না। ঋণের ভারে অসহায় অবস্থায় মৃত্যুই অনিবার্য ভবিতব্য। দেশে এবং রাজ্যে সরকার আছে কিন্তু কৃষকদের জন্য তাদের কোনও মাথা ব্যথা নেই। তারা হিন্দুত্ব, মনুবাদ, হিন্দু, মুসলিম দাঙ্গা, রাম মন্দির, ধর্ম-কর্ম, কুসংস্কার নিয়েই বেশি ব্যস্ত। কৃষকদের ক্ষোভ চড়লে একটু প্রতিশ্রুতি, তারপর আবার যে কে সেই।

ভারতের কৃষিতে সংকট নতুন কিছু নয়। উদারনীতি সেই সংকটকে ঘনীভূত করেছে। কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বৃহৎ পুঁজির যত অনুপ্রবেশ ঘটছে ততই কৃষিতে কৃষকের ভূমিকা কমে যাচ্ছে। তাদের ভূমিকা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে শ্রমদানে ও নিঃশেষিত হওয়া। বৃহৎ পুঁজির স্বার্থেই কৃষকের সংকট বৃদ্ধি জরুরি। সংকট যত বাড়বে কৃষিতে কৃষক উচ্ছেদ হয়ে মজুত শ্রমবাহিনী বাড়াবে। মজুত শ্রমবাহিনী বৃদ্ধি মানেই শ্রমের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মজুরি হ্রাস অবধারিত। কৃষির সংকট পুঁজিপতি-শিল্পপতিদের মুনাফা বৃদ্ধির অন্যতম উপাদান। তাই কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার কৃষকের সংকট নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা শিল্পপতিদের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ নির্দ্বিধায় মকুব করে দিতে পারে কিন্তু কৃষকের কয়েক হাজার টাকা ঋণ মকুবে টাকার অভাবের যুক্তি দেখায়।

সমাজে সম্পদ বৈষম্য যত বাড়ছে, বিত্তবান কিছু মানুষের ঘরে সম্পদের যত পাহাড় জমছে ততই কৃষকদের বিপন্নতা বাড়ছে কৃষকদের শ্রম নিঙড়ে উৎপাদিত ফসল বেচে মুনাফা লুটছে ব্যবসায়ীরা। আর মার খাচ্ছে কৃষক। চাষ করে চাষের খরচও ওঠে না। চাষের জন্য মেলে না সরকারি ঋণ। ঋণ করে চাষ করে ফসল ফললেও ফসল বেচে ঋণের টাকা শোধ হয় না। তাই আশু দাবি কৃষকের সমস্ত ঋণ মকুব করতে হবে। লাভজনক দামে ফসল বিক্রির নিশ্চয়তা দিতে হবে। কম সুদের সরকারি ঋণ বা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের বন্দোবস্ত করতে হবে। সার, বীজ, কীটনাশকের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বনাঞ্চল আইন অনুযায়ী বনাঞ্চলে আদিবাসীদের জমির অধিকার দিতে হবে।

এমন দাবিতে লড়াই চলছে অনেকদিন ধরে। গত দুবছর আন্দোলনের মাত্রা তীব্র হয়েছে। এমন আন্দোলনের চাপে মহারাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি রাজ্য কৃষকের ঋণ মকুবের কথা ঘোষণা করে। মোদী সরকার চাষের খরচের দেড়গুণ ফসলের দাম নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কয়েক মাস আগে মহারাষ্ট্রের বি জে পি সরকার ঋণ মকুব ঘোষণা করে। কিন্তু পরে তাতে এমন সব শর্ত চাপায় যে অধিকাংশ কৃষকই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এর বিরুদ্ধে কৃষক লঙ মার্চ সব কৃষকের ঋণ মকুবের দাবি তোলে। সাত দিন হেঁটে তাঁরা মুম্বাই পৌঁছায়। অভূতপূর্ব সাড়া মেলে শহরের শ্রমজীবীদের কাছ থেকে। তাঁরা নিজ নিজ উদ্যোগে জল, টিফিন, খাবার দিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ান। ফুল দিয়ে স্বাগত জানান, ডাক্তাররা এগিয়ে আসেন চিকিৎসার জন্য। কৃষকরা বিধানসভা ঘেরাও করে বসে থাকবে। যতদিন না দাবি আদায় হবে থাকবে সেখানেই। এই অদম্য জেদের কাছে মাথানত করে সরকার দাবি মেনে নিয়েছে। কৃষকসভার ডাকে হলেও প্রায় সমস্ত বিরোধী দল সমর্থন ও স্বাগত জানিয়েছে। ফলে এই লড়াইয়ের সার্বিক চেহারা স্পষ্ট হয়ে যায়, জেদ থাকলে দাবি আদায় সম্ভব।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement