পা, ভারতবর্ষের পা

শুভময়   ১৪ই মার্চ , ২০১৮

দেশের কৃষক সংগ্রামে নতুন ইতিহাস রচিত হলো নাসিক থেকে মুম্বাই কৃষক মিছিল। এই ঐতিহাসিক মিছিল আদায় করল তাঁদের দাবি। লালঝান্ডা নিয়ে হাজার হাজার কৃষকের এই লঙ মার্চকে উপেক্ষা করতে পারলনা শাসক ও মিডিয়া। এসম্পর্কেই লেখা দুটি নিবন্ধ।

সকালে দরজা খুলতেই আমার মুখের দিকে তাকাল একটি পা। পায়ের তল। যে তল মাটি ছুঁয়ে থাকে। মাটি পাথর কংক্রিট অ্যাসফল্ট। আমার মুখের দি‍‌কে সে তাকিয়ে থাকে। পায়ের তলার চামড়ার যে আস্তরণ, একটু একটু করে খেয়ে নিয়েছে একশো আশি থেকে দুশো কিলোমিটার পথ। ৬-৭ খানা দিন এবং ৬-৭ খানা রাত্তির একটু একটু করে খেয়ে নিয়েছে পায়ের তলার খুব জরুরি চামড়ার চাদর। এখন দিব্যি দেখা যায় রক্ত রস তরমুজের শাঁসের মতো লাল টুকটুকে মাংস।

মাটি থেকে কতটা উঁচুতে অসহায় শূন্যে ঝুলে যেতে পারলেই শরীরের রক্ত, কোষ, শ্বাসনালীর বাতাস বিনা মাশুলে পাওয়া যায় বসুন্ধরার দেদার বাতাসে আর মিশতে পারে না, সেখান থেকে প্রাণবাতাস নিতে পারে না আর, বাংলার খেতমজুর কৃষকের পা ইদানীং জানে। গত ছ সাত বছরে বিলকুল জানে।

সেই বিক্ষত পা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে যখন, আমরা ভাবছিলাম — তিরিশ হাজার জোড়া পা কাঁধে লাল নিশান নিয়ে যখন মহারাষ্ট্রের থানে শহরে পৌঁছোবে প্রায়, বর্ধমানের গোঁসাইপাড়ার এক ভাগচাষি শেখ সামসুদ্দিনের পা আর নিজের উপর ভরসা রাখতে পারেনি। কীটনাশক গলায় ঢেলে হতভাগ্য সামসুদ্দিন মাটির তল থেকে তুলে নিয়েছেন পায়ের তল, শূন্যের দিকে পায়ের দশ আঙুলের মাথা।

নাসিক থেকে থানে পালঘর হয়ে মুম্বাই — তিরিশ-পঁউয়তিরিশ হাজার জোড়া পা এক সমুদ্র লাল নিশান হয়ে। আরব সমুদ্রের মহানগর বন্দরের দিকে এগিয়ে চলেছিল। পা, ভারতবর্ষের পা। পায়ের তলায় পথ। দাবি আদায়ের শপথের পথ। দাবি মেনে নেওয়ার ওয়াদা ছাড়া, ফিরব না ফিরব না কিছুতেই। সেই পথ তখন ভারতবর্ষের পথ। নালেগাঁও, চান্দেওয়াড়ে, সরগুনার মাটি অরণ্য থেকে বার হয়ে আসছে পা। দিন-রাত এক করে এগিয়ে চলেছে। দিনের গনগনে আঁচ স্নায়ুর শেষ প্রান্তগুলি পুড়িয়ে খাক করে দেয়। টানা পথ চলায় টনটন করে ওঠে পেশি, মনে হয় চামড়ার বাঁধন আর মানতে চায় না তারা। পাট কাঠির মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়ে তবে যেন রেহাই চায় দু হাঁটুর তলায় লাঙলের দাঁড়ের মতো দুখানা হাড়।

এই পা জ্যোতিবা রাও ফুলের — পা।

এই পা আশি হাজার থেকে লাখো হয়ে হেঁটেছিল প্রায় পাঁচশো মাইল জিয়াংঝি থেকে শাঙঝি — মাও জে দঙ-এর ডাকে, মাও জে দঙ-এর সঙ্গে। এই পা লড়েছিল ‍ঝিয়াঙ নদীর ধারে কৃষকের লাল ফৌজ হয়ে।

এই পা গুটিকতক মাত্র নির্ভীক গেরিলা হয়ে হেঁটে গিয়েছিল মৃত্যুঞ্জয় — সিয়েরা মায়েস্ত্রায়, গ্রানমায়। ঘুম খিদে, আর জীবন বাজি রেখে জিতছিল হারছিল আবার জিতছিল। বিরাশিজন গেরিলা। কম্পানেরো ফিদেল তখন ক্যালিব্রেট করছিলেন পঞ্চান্নটি রাইফেল। ৬০০ মিটারের নিখুঁত রেঞ্জ, জ্যামিতিক মাপজোক বক্ররেখা। রাইফেলের নল আর ইস্পাত বুলেটের বিপ্লবী সমীকরণ। টাস্ক পান নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছেন চে, সঙ্গে নেই তাঁর অ্যাসমা ইনহেলার ... খুব বেশি দূরে নয় কিউবা বিপ্লবের দিগন্ত।

এই পা সাইবেরিয়ার ধারাল বরফ পার হয়ে ছুটছে প্রাণপণ। দেশের মুক্তি চাই। দুনিয়ার মুক্তি চাই। মানবের মুক্তি চাই। তুমি কেন আমায় বেঁধে রাখবে নির্বাসনে জেলখানায়। এই পা সতেরো বয়সি সোকোলনিকভের। শেকলে বেঁধে রাখা পা। নির্জন জেলখানা। ভাঙা রুটির টুকরো। তারপর জারের জেলখানা সাইবেরিয়া ফেড়ে পার হওয়া, লেনিনের সঙ্গে যোগ, বলশেভিক পার্টি, নভেম্বর বিপ্লব।

এই পা তেলেঙ্গানার কৃষক বিদ্রোহীদের। সার বেঁধে দাঁড়িয়েছি দেখো। জনগণ তুলে নাও আজ হাতিয়ার।

এই পা তেভাগার পা। চন্দনপিঁড়ি খাঁপুর, বড়া কমলাপুর, বেড়মজুর। ধান চাই নিজ খামারে। পাঠাক লেঠেল পুলিশ রাষ্ট্র ও জোতদার। ধানের জন্যে যোদ্ধা যখন অজুত, কজনকে কয়েদ করে বাঁধতে পারে!

এই পা কাইয়ুরের কৃষক শহীদের। যে লড়াইদার ফাঁসিতে যাবেন তাঁর সামনে বসে আছেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির তরুণ সম্পাদক। সম্পাদক বললেন, পার্টি আপনাকে ভুলবে না, আপনাদের ভুলব না। পার্টি আপনার পরিবারের পাশে আছে। আগামীকালের শহীদ বলছেন, ঘরে আমার ভাই আছে, সে তৈয়ার পার্টির জন্যে। কাইয়ুরের কৃষক বন্ধুদের নিয়ে গান বেঁধেছিলেন বাংলার গণগায়ক — ‘দে, দে, ফিরাইয়া দে মোর কাইয়ুর বন্ধুরে....’। মহারাষ্ট্রের কৃষকদের নিয়ে গান বাঁধা হবে না বিনয় রায়-সলিল চৌধুরিদের বাংলায়! কবিতা লেখা হবে না! আমরা পথ চেয়ে আছি।

দাবিতে কোনও ফারাক নেই। দফার অঙ্কে খানিক ফারাক থাক‍‌তে পারে।

মহারাষ্ট্রের কৃষকদের দাবিসনদের অনুপুঙ্খে আমরা যাচ্ছি না। পাঠক আঁতিপাঁতি জানেন। কৃষিঋণের মকুব চাই, বয়স্ক কৃষকের অবসর ভাতা চাই, বনভূমির অধিকার চাই।

মাটির আর খিদের অক্ষর — সারা দুনিয়ায় ফারাক নেই ব‍‌ড়ো।

বঞ্চনা, শোষণ আর মৃত্যু থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা পৃথিবীর সব ভাষায় এক স্বরে গলা ফেড়ে কথা বলে।

দাবির জন্যে পথ চলা মানবের সংহতি সারা দুনিয়ায় বহন করে, একটিই নিশান, — লালে লাল ভেদাভেদ ভুলে চলমান।

সেই সব নিশান, সেই সব পায়ে পায়ে শুদ্ধ হলো আরব সাগরের তীরে মুম্বাই। সেনসেক্স-শেয়ার বাজারের কতসব জটিল কারসাজি, পুঁজির মহাপ্রভুদের দুর্ধর্ষ আখড়ার আকাশ বিদ্ধ করা ঔদ্ধত্য, টিনসেল টাউনের রকমারি বেলেল্লাপনার কুহক ছিঁড়ে ফেলে শুদ্ধ হলো মুম্বাই রক্তাক্ত ক্ষুধার্ত অথচ দৃপ্ত পঁয়ত্রিশ হাজার পায়ের পরশে।

আদর্শ গোত্রীয় সাংবাদিক পি সাইনাথ লিখেছেন এমন কখনো ঘটেনি মুম্বাইয়ে। মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্তরাও দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার ধারে। কৃষক যাত্রীদের খাবার জোগাচ্ছেন ডাব্বাওয়ালারা। ছাত্ররা সংগ্রহ করছেন জলের বোতল আর বিস্কুট। কারা যেন হঠাৎ পথে নেমেছেন রক্তাক্ত পায়ের জন্যে চটি জুতো জোগাড় করতে।

এমন কখনো দেখেছে মুম্বাই!

দেখেছে। অন্তত আর একবার দেখেছে ১৯৪৬-এর আঠারো থেকে ২৩শে ফেব্রুয়ারি। বিদ্রোহী নাবিকদের দখল নেওয়া অবরুদ্ধ যুদ্ধজাহাজ তলওয়ারের দিকে খাবার ছুঁড়ে দিচ্ছিল মুম্বাইয়ের বস্তিবাসীরা। সারা মুম্বাইয়ে সেদিন হরতাল ডেকেছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। সমর্থন জানিয়েছিল সমগ্র জনতা। সারা মুম্বাই বুক বাঁধছিল লড়াইয়ের নাবিকদের জন্যে।

সেদিনের মহাকাব্য (মহানাটক) লেখা হয়েছিল পরে। ষাটের দশকে কলকাতাতেই। লিখেছিলেন আপাদমস্তক কমিউনিস্ট উৎপল দত্ত। কল্লোল।

আজকের মহারাষ্ট্রের জন্যে লেখা মহাকাব্যের পথ চেয়ে আমাদের অপেক্ষায় কোনও খামতি নেই।

১৯৪৬-এর সেই ফেব্রুয়ারির পর আর একবার শুদ্ধ হলো মুম্বাই। মার্চে। ২০১৮-র মার্চে।

মুম্বাইয়ের মার্চে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সিয়নের কলেজ মাঠে মাত্র দুঘণ্টা জিরেন নিয়েই সারারাত পথ হেঁটেছে পঁয়ত্রিশ হাজার জোড়া পা। আজকের মহারাষ্ট্র সে ইতিহাস খাতায় লিখছে না নিশ্চয়। বুকের মধ্যে তো লিখে রাখল। খাতায় অক্ষর পেতে কতক্ষণ!

পঁয়ত্রিশ হাজার জোড়া পা মুম্বাই-এর উষার দুয়ারে কড়া নাড়ল।

পঁয়ত্রিশ হাজার জোড়া পা ভারতবর্ষকে শোনাচ্ছে নতুন ভোরের কড়া নাড়া। কদিন আগে ভোটে হেরেছি কিনা! বাজারি উল্লাস। সেই উল্লাসও গলা নামিয়ে বলতে বাধ্য হচ্ছে, মাথা ঝুঁকিয়ে — এখনই লালঝান্ডার বিদায়গাথা লেখবার সময় আসেনি।

বিদায় গাথা! আমরাই তো পথ — ময়দানে। জনতার বিবেক ও মনে। পঁয়ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার জোড়া পা দলে যাচ্ছে হেলায় দলে যাচ্ছে ব্যালট ই‍‌ ভি এম-এর জারিজুরি জটিল হিসাব-নিকেশ। ভোটের জটিল অঙ্কের যাবতীয় চালাকি আর ছক ভেঙে দিচ্ছে পদধ্বনি।

নাসিক থেকে মুম্বাই — হেঁটে যাচ্ছে ভারতবর্ষের পা।

নাসিক থেকে মুম্বাই, এই মার্চে আঁকা হয়ে গেল ভারতবর্ষের পথ।

ভোটে হেরেছি কিনা কয়েকদিন আগে। কষ্ট তো আছেই।

আমার, আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সকালের সকল আলো টেনে নিয়ে হাসছে বিক্ষত রক্তাক্ত একজোড়া পা। আমাদের বিষাদকে বলেছি, বিভ্রমকেও বলেছি ডেকে, ধুর! তুমি আর ঘুরো না পায়ে পায়ে। দূর হও!

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement