শেষে নারদকাণ্ডেই
কি মিলল রফাসূত্র!

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৪ই মার্চ , ২০১৮

কলকাতা, ১৩ই মার্চ— আপাতত যবনিকা পতন। নারদ ঘুষকাণ্ডের মামলায় ‘নিরাপদ রাস্তা’ পেয়ে গেলেন মেয়র শোভন চ্যাটার্জি। পঞ্চায়েত নির্বাচনের মুখে বিড়ম্বনাও কাটল তৃণমূলের। একইসঙ্গে, সুনিশ্চিত হলো শোভন চ্যাটার্জির হাত ধরে পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিপুল টাকার তহবিলের গ্যারান্টিও।

বেশ কয়েকদিন ধরে চলা শোভনকাণ্ডের পরিণাম দাঁড়াল এমনই। ঘুষকাণ্ড থেকে একাধিক বেনিয়ম, দুর্নীতি, কলকাতার একাধিক থানায় একাধিক এফ আই আর, সি বি আই-ইডি-র জেরাসহ হাজারো গুরুতর প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়েই চিত্রনাট্যের যবনিকা টানলেন মেয়র নিজেই, কর্পোরেশনের সদর দপ্তরে বসেই। সাংবাদিকদের কাছে বললেন, ‘মমতা ব্যানার্জি আমায় বলেছেন মেয়র ও মন্ত্রিত্ব যাতে আমি ভালোভাবে সামলাই, মিডিয়া কী বলল তা দেখার দরকার নেই। ফলে আমার ইস্তফা দেওয়ার গুজব যারা ছড়িয়েছে, তারাই বলতে পারবে আসল ঘটনা কী! আমি মেয়র আছি, মন্ত্রীসভায় যেমন দায়িত্ব পালন করেছি তেমনই করছি’।

গত কয়েকদিন ধরে চলা এই নাটকের এই শেষ দৃশ্য সাজানো হলো কীভাবে?

পুলিশ নির্ভর সরকারের তরফে দ্বৌত্যের ভূমিকায় সেই পুলিশ-ই।

মমতা ব্যানার্জির দূত হিসাবে সোমবার রাতে দক্ষিণ কলকাতায় শোভন চ্যাটার্জির নতুন ঠিকানায় হাজির হয়েছিল পুলিশ। তার আগে রবীন্দ্র সরোবর থানায় মেয়রের তরফে তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে এফ আই আর করা হয়েছিল দুষ্কৃতী হামলার আশঙ্কা করে। সেই অভিযোগের সূত্র ধরেই পুলিশ পৌঁছায় গোলপার্কে মেয়রের ফ্ল্যাটে। সেখানেই চলে এই মধ্যস্থার প্রক্রিয়া। পুলিশের একটি সূত্রেই জানা গেছে, সেই আলোচনা শেষে মেয়র নিজেও বুঝতে পারেন নিজের অবস্থানে অনড় থাকলে আইনিভাবেও ফেঁসে যেতে পারেন। তার ওপর মাথায় ঝুলছে নারদকাণ্ডের তদন্ত। মেয়র পদ ছাড়লে বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না। এরপরেই শোভন চ্যাটার্জির তরফে ফোন যায় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তুই কাজে করে যা, ভালো করে দায়িত্ব পালন কর’। মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরেই গোটা পরিস্থিতি বদলে যায়। ঝাঁকের কই ফিরে আসে ঝাঁকে। মিটে যায় যাবতীয় গুঞ্জন।

আর এরপরেই স্বাভাবিকভাবে নতুন করেই আরও বেশি প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কেন এই ‘শোভনকাণ্ড’ তৈরি হলো, আর কেনই বা তা এভাবে থমকে গেল? রহস্যের কিছুটা আভাস মিলেছে এদিন শোভন চ্যাটার্জির সাংবাদিক বৈঠক থেকে। সেখানে তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে তাঁরই আনা অভিযোগের স্বপক্ষে বলতে গিয়ে মেয়র বলে ফেলেন, ১৯৯৫সালের ডিসেম্বরে বিয়ে করেছি, তারপর ২০১৮ সালে কী কেউ আনন্দ করে ডিভোর্স দিতে যায়! আমি এমন কিছু ‘এসেন্স’ পেয়েছি বিশ্বাসঘাতকতার। তারপরেই নিজে সরে এসেছেন, সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

কীসের বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ পেয়েছেন মেয়র?

তা আবার স্পষ্ট হয়েছে মেয়র পত্নী রত্না চ্যাটার্জির কথায়। তিনি বলেছেন, আমাকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন যেতে হয়েছিল, উনি পাঠালেন, তারপরেই পেলাম ইমেলে ডিভোর্সের নোটিস। অন্যদিকে তখন ইডি আমায় ডাকছিল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য, যদি না যেতাম তো অ্যারেস্ট হয়ে যেতাম। যদিও তারপর থেকে আর কথা বলেনি ওঁ, আমার নাম্বারও ব্লক করে দিয়েছিল’।

অর্থাৎ ভরকেন্দ্রে সেই নারদ প্রসঙ্গের জেরাই চলে এসেছে।

রত্না চ্যাটার্জির জেরার পথ প্রশস্ত করেছিলেন খোদ মেয়র নিজেই। গত ১০ই আগস্ট নারদ ঘুষকাণ্ডে ইডি-র ম্যারাথন জেরার মুখে তদন্তকারী আধিকারিকের কাছে নিজেই বলেছিলেন তাঁর স্ত্রী-ই জানে টাকা পয়সার ব্যাপার, উনি সব খোঁজ রাখেন। তাঁর সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের দায় চাপিয়েছিলেন স্ত্রীর ওপর। নারদকাণ্ডে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে মেয়রের বিপুল পরিমাণ টাকার একটা অংশ মেয়র পত্নীর সংস্থাতেও বিভিন্নভাবে বিনিয়োগ হয়েছিল। রত্না চ্যাটার্জির ব্যবসা ও সম্পত্তির খোঁজে তদন্ত চালাতে গিয়ে একাধিক সন্দেহজনক লেনদেনে তথ্যও হাতে আসে গোয়েন্দাদের।তদন্তকারী আধিকারিকদের হাতে এসেছে দুটি নির্দিষ্ট সংস্থার নাম। এক তদন্তকারী আধিকারিকের কথায়, রত্না চ্যাটার্জি জেরায় যা বলেছেন তাতে স্পষ্ট মেয়রের বিপদ বেড়েছে। বেশ কিছু তথ্যও মিলেছে যাতে মেয়রের অস্বস্তি বাড়তে পারে। নারদকাণ্ডে হাত পেতে নেওয়ার ঘুষের টাকার গন্তব্যস্থলও জানতেন তাঁর স্ত্রী, তা কী জেনে ফেলেছে তদন্তকারী সংস্থাও? তাই কী রত্না চ্যাটার্জিকে বিশ্বাসঘাতক বলছেন শোভন চ্যাটার্জি। একইসঙ্গে আবার এই গোটা কাণ্ডে পিছনে কোনও এক ব্যক্তি বা চক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাজ করেছে বলেও অভিযোগ মেয়রের। সেই ব্যক্তি কী দলের কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি? উঠছে প্রশ্ন।

মেয়র ইডি-র বলেছিলেন জেরায়, আর্থিক বিষয়ে সব জানে তাঁর স্ত্রী। আর রত্না চ্যাটার্জি বলেছিলেন, ওঁর টাকা পয়সার ব্যাপারে আমি জানি না, জানে ও নিজেই। এরপরে আরও বেশ কিছু তথ্য দিয়েছিলেন তদন্তকারীদের হাতে। আর তা জানার পরেই মেয়রের সামনে চলে আসে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ সেই তত্ত্ব। নারদকাণ্ডে কার্যত গ্রেপ্তারির সম্ভাবনার সামনে পৌঁছে যান মেয়র শোভন চ্যাটার্জি।

তাৎপর্যপূর্ণভাবে তারপর থেকেই শুরু হয় এই পারিবারিক বিবাদ ও শোভনকাণ্ডের চিত্রনাট্য। দলের সঙ্গে আপাত দূরত্বের কাহিনী। মাঝের পর্বে কী হয়েছে তা এখনও রহস্য। তবে নারদকাণ্ডে বিপদের সম্ভাবনার মেঘ কেটে যাওয়ার পরেই ফের এই নাটকের সমাপ্তি হলো বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

অন্যদিকে তৃণমূলের একটি অংশের দাবি, যতই মনোমালিন্য হোক সবাই জানে, মেয়র শোভন চ্যাটার্জি দলের ফান্ডিং মেশিন। তিনটি দপ্তরের মন্ত্রী, মেয়র, আবার দলের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা সভাপতি। এত অভিযোগ ওঠার পরেও মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহের তালিকায় রয়েছেন আজও। আর তা রয়েছেন তাঁর তহবিল ভরানোর ক্ষমতার জন্যই। তৃণমূল সূত্রেই জানা গিয়েছে, গত বিধানসভা ভোটের কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ৪৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের নিবার্চনী প্রচারের খরচের সিংহভাগই সামলেছেন মেয়র শোভন চ্যাটার্জি। আবার দক্ষিণ ২৪পরগনার ডায়মন্ডহারবার বাদে বাকি চারটি লোকসভার কেন্দ্র সামলানোর দায়িত্বও তাঁর। ফলে সব বিষয় খতিয়ে দেখে শোভন চ্যাটার্জিকে স্বমহিমায় রেখে দেওয়ায় যে দলের লাভ তা বোঝেন তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বও।

এদিকে এদিন স্পষ্টভাবেই শোভন চ্যাটার্জি বলে দিয়েছেন, আপাতত এই ঘটনার রেশ কাটলেও স্ত্রী রত্না চ্যাটার্জির সঙ্গে সমস্যা মেটার কোন সম্ভাবনা নেই। এমনকি তিনি বেহালার বাড়িতেও ফিরে যাবেন না, তাঁর কথায়, ‘যেদিন শরীর নিস্পন্দ হয়ে যাবে, সেদিনও নিয়ে যেতে চাইলে বারণ করব সেখানে যাতে না নিয়ে যাওয়া হয়’। একইসঙ্গে আবারও এও জানিয়ে দিয়েছেন, মিল্লি আমিন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বিপদের দিনে পাশে থাকা বন্ধু’।

আর গোটা ঘটনার পরেই ফের এবার মেয়র পত্নী রত্না চ্যাটার্জিকে তলব করা হবে কী তাও খতিয়ে দেখছেন নারদকাণ্ডের তদন্তে থাকার ইডি-র আধিকারিকরা।







Current Affairs

Featured Posts

Advertisement