দায় মোদীর

গত কয়েক বছর ধরে দেশজুড়ে হিংসা-বিদ্বেষের মানসিকতা যেভাবে বাড়ছে, গোরক্ষার নামে সংখ্যালঘু ও দলিত নির্যাতন যেভাবে বাড়ছে এবং মনুবাদী সংস্কৃতির বাতাবরণে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ যেভাবে বাড়ছে তাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দায় এড়াবার কোনও উপায় নেই। যতই তিনি চমকপ্রদ ইস্যু খাড়া করে মূল ইস্যু ও বিতর্কগুলিকে আড়াল করার চেষ্টা করুন না কেন, গরম গরম কিছু মন্তব্য করে যতই ভাল মানুষ সাজার চেষ্টা করুন না কেন তাঁর ছলনা ক্রমশই মানুষের চোখে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তি‍‌নি নীরবতার আড়াল নিয়ে অভিযুক্ত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করলেও অথবা চাপে পড়ে কিছু মন ভোলানো কড়া মন্তব্য করলেও সেসব যে নিতান্তই অন্তঃসারশূন্য তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না সেটাও মানুষ বুঝতে শুরু করেছেন।

মোদী ও তাঁর সরকার হিন্দুত্ববাদের উত্তাপ বাড়িয়ে হিংসা ও বিদ্বেষের আগুন জ্বালানোর কুশীলবদের যে মদত ও নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে তার সর্বশেষ উদাহরণ জম্মুর কাঠুয়ার ঘটনা। এটা বিরল ঘটনার মধ্যে বিরলতম। তেমনি উল্লেখ করা যায় উন্নাও-র ঘটনাও। এরপর যুক্ত হয়েছে গুজরাটের সুরাট। ১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। ছোট শরীরে মিলেছে ৮০টি আঘাতের চিহ্ন। দেশজুড়ে বেড়েই চলেছে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ। তেমনি অপরাধগুলি আর মামুলি অপরাধে আটকে নেই। একের পর এক বীভৎসতার রেকর্ড তৈরি করে চলেছে। লক্ষণীয় এইসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জড়িয়ে থাকে আর এস এস-বি জে পি-র কর্মী সমর্থকরা। সরকার ও দলের কাজ হয়ে ওঠে অপরাধীদের আড়াল করা। পাশাপাশি অপরাধের ঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করে এমন বিকৃত প্রচার শুরু করে যাতে তাকে সাম্প্রদায়িকতা বা হিন্দু মুসলিম বিভাজনের পথে ঠেলে দেওয়া যায়। উন্নাওতে ধর্ষণের মূল অভিযুক্ত বি জে পি বিধায়ক হলেও গত প্রায় একবছর ধরে তার বিরুদ্ধে এফ আই আর নেওয়া হয়নি। উলটে ধর্ষিতা ও তার পরিবারকে ভয় হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। কাঠুয়াতে ধর্ষকদের রক্ষা করতে হিন্দুত্ববাদীরা প্রকাশ্যে রাস্তায় নেমে মিছিল করে। তাতে যোগ দেয় দুই মন্ত্রী এক বিধায়ক। জাতীয় পতাকা নিয়ে সেই মিছিলে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি তোলা হয়। বেকায়দায় পড়ে মন্ত্রীদের পদত্যাগ করার পর জানা যায় দলের নির্দেশেই মন্ত্রীরা মিছিলে যোগ দিয়েছিল।

এইভাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির স্বার্থে দলিতদের বিরুদ্ধে, মহিলাদের বিরুদ্ধে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে আক্রমণ বাড়ছে। এর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কোনও পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। বছরের পর বছর তদন্ত চলে কিন্তু চার্জশিট তৈরি হয় না। তেমনি তদন্তের আড়ালে প্রমাণ নষ্ট, সাক্ষী বিরূপ করার প্রক্রিয়াও চলে। চারদিকে ভয়ের আতঙ্কের পরিবেশ বাড়ছে। ফলে অপরাধীদের পোয়াবারো। দ্বিগুণ উৎসাহে তারা আরও বেশি বেশি অপরাধ সংগঠিত করে। হিন্দুত্ববাদীদের এই ক্রিয়াকলাপে নীরব থাকেন মোদী। নীরবতার মধ্য দিয়েই তিনি ইতিবাচক বার্তা দেন হিন্দুত্ববাদী দুষ্কৃতীদের। ফলে আক্রান্ত নির্যাতিতারা বিচার পাওয়া থেকে দূরে সরে যান। যদি কোনও ঘটনায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে তখন প্রধানমন্ত্রী মুখ খুলে শুকনো প্রতিশ্রুতি দেন, অপরাধী শাস্তি পাবেই। বাস্তবে আখলাকের খুনিরা শাস্তি পায়নি। ‘গোরক্ষক’ খুনিরা বহাল তবিয়তে অপরাধ করে চলেছে। এটাই আর এস এস-বি জে পি-র রাজনৈতিক রণকৌশল। হিন্দুত্ববাদীদের দিয়ে অপরাধ সংগঠিত করিয়ে হিন্দুত্বের সুর চড়াবে যাতে বিভাজন সহজতর হয়। পরে নেতারা বা সর্বশেষে মোদী ভালো কথা বলে মানুষের মন ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা করেন। চার বছর ধরে এমন দেখতে দেখতে শয়তানিটা ধরা পড়ে যাচ্ছে। তাই প্রতিবাদের পরিসর বাড়ছে। মোদীর কথায় আস্থা কমছে। প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। মানুষ বুঝে গেছেন তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের উদ্বেগ আতঙ্ক বাড়ছে। দেশকে পরিকল্পিতভাবে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবার বিরুদ্ধে জনমত বাড়তে শুরু করেছে। এই পর্বে বড়সড় ধাক্কা এসেছে প্রাক্তন আমলাদের কাছ থেকে। দেশের এই দুঃসহ অবনমনে তাঁরা সরাসরি কাঠগড়ায় তুলেছেন মোদীকে। মোদী শুধু সরকারের প্রধান নন, দলেরও প্রধান নিয়ন্ত্রক তিনি। আবার ইদানীং আর এস এস-র ওপরও তাঁর প্রভাব বেড়েছে। ফলে তিনি চাইলে এসব বন্ধ করা সহজ ব্যাপার। কিন্তু তিনিই এসবের হোতা। দায় তাঁরই।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement