শপথ ইস্পাতের মতো

ঈশান লাল

তামাটে রঙের নিরেট রাস্তার উপর পড়ে ছিল হীরু লেটের শরীর।

রামপুরহাট সংলগ্ন কোনও পঞ্চায়েত সমিতির অফিসের সামনে। খানিক দূরে হীরু লেটের গাঁ — ভগবতীপুর, পঞ্চায়েত হরিদাসপুর। রামপুরহাট থেকে বড় জোর ১৩/১৪ কিলোমিটার হবে। তার বেশি কিছুতেই নয়।

হীরু লেটের নিজের কোনও জমি নেই। হীরু লেট ভাগচাষি। ভাগচাষি আর খেতমজুর — এই দুই বৃত্তির মাঝের সীমান্তটা প্রায়শই মুছে যায়। গাঁ-গঞ্জের মাড় ভাত শাক দিনমান জানে। খিদে, রোগবালাই মজুরি জানে।

বামফ্রন্ট সরকার এ রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল ৪১ বছর আগে। ভাগচাষিরা পেয়েছিলেন মাটির উপর হক আর মহব্বতের স্বীকৃতি। খেতমজুররা পেয়েছিলেন মজুরির উপর অধিকারের জবান। হরেকৃষ্ণ কোঙার, প্রমোদ দাশগুপ্ত, জ্যোতি বসু আর প্রায় অগণন এক ঝাঁক প্রবাদগোত্রীয় বামপন্থী কৃষক নেতার দিন রাত এককরা লড়াইয়ের, জান আর স্বপ্ন এককরা লড়াইয়ের ফলন। হীরু লেটের শৈশব হয়তো দেখেছে সেসবের কিছু কিছু। হীরু লেটের কৈশোর হয়তো শুনেছে সেসবের অনেককিছু। হীরু লেটের আজীবনের খেটে-খাওয়া অভিজ্ঞতা জানে, বিলক্ষণ জানে লালঝান্ডা ছাড়া মাটির মানুষের জন্যে এগিয়ে যাবার অন্য কোনও ঠিকানা নেই।

হীরু লেট পড়ে আছেন তামাটে রঙের নিরেট রাস্তার উপর। চেক লুঙ্গি, হাফ হাতা সাদা গেঞ্জি। গেঞ্জির ওপর দিকটায় রক্তের পুরু টানা লাল জমিন, কখনও রঙের ভারী বৃষ্টির ফোঁটা। হীরু লেট মনোয়নপত্র জমা দিতে এসেছিলেন। ‘উন্নয়ন বাহিনী’ প্রথমে তাকে তুলে নিয়ে যায়। তাঁর হদিশ পাওয়া যায় না। উন্নয়ন বাহিনী অনেক পরে তাঁকে ফেলে রেখে যায়। পথের উপর। হয়তো ভেবেছিল লালঝান্ডা ধরা মানুষটা মরেই গেছে বিলকুল। মড়ার আবার কী মনোনয়ন! কেষ্ট-কালীঘাট সবার পক্ষেই নিশ্চিন্তি। মারের চোটে মরে গেছে ছাড়া অন্য কিছু তো নয়। ‘কিস্যু হয়নি’।

হীরু লেটের মুখের ডান দিকটা বীভৎসভাবে খাবলানো। মনে হয় মাংসের লোভেই কারা যেন খুবলে নিয়েছে ভাগচাষির মুখের ডান ভাগ। হীরু লেটের সারা মাথাটা থ্যাঁতলানো। মাথার তলায় লালপতাকা। যেন লালপতাকা ছাড়া মাথা রাখার কোনও আস্তরণই থাকতে পারে না মাটির দুনিয়ায়। হীরু লেটের রক্তাক্ত মাথার নিচে লাল পতাকা। শত শহীদের রক্তে শ্রমিক-কৃষকের লালপতাকার রঙিন জেল্লা নাকি সহস্র গুণ বেড়ে যায়, কমরেড লেনিনের নামে গান গাইতে গাইতে, একথা কতবার ভেবেছি। এমন করে অনুভব করিনি কোনোদিন। আশ্চর্য! কাস্তে হাতুড়ির সাদা ফলাটা কিন্তু রক্তে ভিজে চুঁইয়ে রং হারায়নি। বিদ্যুৎফালির আলোর মতো অতিপ্রভ হয়ে আছে তামাটে রঙের রাস্তার উপর।

হীরু লেটের রক্তের সোঁতা পড়ে আছে রাস্তার উপর। রাস্তা শুষে নিচ্ছে খেতমজুর লালঝান্ডাওয়ালার রক্ত। চুঁইয়ে নিতে নিতে শুকিয়ে যাচ্ছে, মরে যাচ্ছে, শেষ হয়ে যাচ্ছে একটা পুরানো বছর। হীরু লেটদের রক্তের সোঁতা ডিঙিয়ে‌ এল একটা নতুন বছর।

আমাদের কোনও সুখের নববর্ষ নেই। আমাদের কোনও সুখ-শান্তির নববর্ষ থাকতে নেই। আমাদের নববর্ষে কোনও কলাপাতা, পঞ্চব্যঞ্জন, মণ্ডা-মেঠাই নেই। আমাদের নববর্ষে যদি কোনও প্রভাতফেরি পদযাত্রা থেকে থাকে, তার প্রতিটি পদধ্বনি চাইছে হীরু লেটের, হীরু লেটদের প্রতি রক্তের ফোঁটার হিসাব, কড়ায়গণ্ডায় সুদে আসলে।

গরিব মানুষের রক্তের এইসব ফোঁটা ব্যর্থ হতে পারে না। এ হিসাব বুঝে নিতেই হবে। আমাদের প্রতিটি পদযাত্রা, প্রভাতফেরি, মিছিলের শপথ। বেঁচে থাকা আমাদের প্রতি অস্তিত্বের শপথ।

২.

অঞ্চল ভগবতীপুর, গ্রাম পঞ্চায়েত হরিদাসপুর, মহকুমা রামপুরহাট, জেলা বীরভূম। এই স্থায়ী ঠিকানা পার হয়ে হীরু লেটের লড়াকু চেতন-অবচেতন জানত তাঁর শেষ ঠিকানা লাল নিশান। পথের উপর অচেতন মাথারতলায় লাল নিশান।

হীরু লেট জানেন না, একটুও জানেন না, কখন তাঁর ঠিকানা বদল হয়েছে। কখন তাঁকে কলকাতায় আনা হয়েছে। তাঁর সেই এখনকার ঠিকানা খুঁজতে হাজির হয়ে গিয়েছিলাম সল্টলেকের এক বেসরকারি হাসপাতালের আটতলার বেডের পাশে।

সিউড়ি হাসপাতাল থেকে কলকাতার সরকারি হাসপাতাল। ক্ষমতা বললে সরকারি হাসপাতালে কুকুরের ডায়ালিসিস হয়ে যাবে, ক্ষমতা বললে, মন্ত্রীর পাঞ্জাবি পরা দাগী মাতাল লম্পট ঠগবাজের উডবার্ন ওয়ার্ডে ঠান্ডা ঘর হয়ে যাবে ঘাপটি মেরে থাকার জন্যে। গাঁয়ের মানুষের চিকিৎসা জোটানোর মুরুব্বি কে আছে? তাও আবার যে মানুষের শরীর খুবলে খেয়েছে উন্নয়ন, উন্নয়নের জন্যেই যার শরীর খুবলে খাওয়ার বড় প্রয়োজন, তার জন্য সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা! পাগল!

সুতরাং বেসরকারি হাসপাতাল, পার্টির ব্যয়ভারে।

বাংলা বছরের শেষ দিনের শেষ আলো শেষ হয়ে আসছে দ্রুত। এখনই শেষ হয়ে যাবে ভিজিটিং আওয়ার্স। উঠতে থাকা লিফটে মুখোমুখি হীরু লেটের বড় ছেলে প্রভাত। তলায় দাঁড়িয়ে আছেন সাথীরা। ‘বাবা খুব খাটতে পারত, আমাদের তো নিজের জমি নেই, ভাগে যেটুকু জমি পাওয়া যায়, বাবা জান দিয়ে খাটে... খেটে আমাদের মানুষ করেছে, সংসার টেনেছে... কথা বলতে বলতে আটতলা, দরজা পার হয়ে হীরু লেটের বেডের পাশে। সাদা বোর্ডে লেখা তাঁর নাম। তলায় চিকিৎসকের নাম।

লিফটের ভেতরেই প্রভাতকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বাবার মনোনয়ন জমা পড়েনি তো!

— না, প্রভাতের উত্তর।

— আর কেউ? আমার জিজ্ঞাসা।

— দুজন দিতে গিয়েছিল, ভয় দেখিয়ে... প্রভাতের কথা ক্রমশ নিবে যায়।

আমি হীরু লেটের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। মুখের সেই, ছবিতে দেখা, ডান দিকে। বীভৎস খোবলানো। নতুন করে নির্মাণ করেছেন ডাক্তাররা। সে দিকটা ফুলে আছে বর্তুলাকার। সেলাইয়ের নির্মাণ দাগ। যেন পোস্ট ইম্প্রেশনিস্ট পটে মানুষের মুখপট। হীরু লেট হাসলেন কী নিশ্চিন্ত আরামে।

যন্ত্রণা আছে? আমার জিজ্ঞাসা

এখনও আছে। খুব। টনটনে।

চোখ বুজিয়ে নিলেন হীরু লেট।

যেন চোখ বুজিয়ে তিনি দেখছেন তাঁর গাঁ হরিদাসপুর লালঝান্ডার ডানায়, লাল ঝান্ডার আলোয়। চোখ বুজিয়ে বলে যাচ্ছেন হীরু লেট, পঞ্চায়েতের সেই শুরু থেকে আমরা কখনও আমাদের গাঁয়ে হারিনি। ৪৫ বছর।

৪৫ বছর, নিখুঁত হিসাব দিচ্ছেন হীরু লেট। বামফ্রন্ট চলে যাওয়ার পরও এই ক-বছর কোনও ভোটে হারেনি হরিদাসপুর।

—এবছরও হারব না।

হীরু লেটের ঠোঁটের পাশেও সেলাইয়ের সু‍‌তো। সব কথা সেই সুতো কাঁপিয়ে তবে বার হচ্ছে।

এবারও হারব না। আ‍‌মি পারিনি। অন্যরা জমা দিয়েছে, এবারও হারব নে।

আমি প্রভাতের মুখের দিকে তাকাই। সে যেন সত্যিটা বলে না ফেলে ঘাগুলো কাঁচা। মনটাও এসময় বড্ড কাঁচা থাকে, নরম। মানুষটা মনের ঘা সইতে পারবে!

প্রভাত আমার মুখের দিকে চেয়ে। সে বড় হয়েছে, সে জানে। লিফটে নামার পথে আমায় বলেছিল, না বাবাকে কিছু জানানো হয়নি। মনোনয়ন জমা দিতে পারিনি, বাবাকে জানানো হয়নি।

হীরু লেট বললেন, ডান চোখটায় এখনও কিছু দেখতে পারছি না।

আমি বললাম, পারবেন। ডাক্তার দেখবেন। চোয়ালে অপারেশন হয়েছে। মুখের ঘাটা খানিক শুকিয়ে আসুক।

হীরু বললেন, পারব।

তারপর চোখ বুজলেন আবার। চোখ বুজিয়েই বললেন, এবারও আমরা হারব না।

আমরা যারা পার্টি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করি, নেতৃত্বের পথ মত নীতি কৌশল নিয়ে বিতর্ক গড়ি, বিশ্লেষণ করি, তারা এবং হীরু লেটরা খানিক আলাদা।

আমাদের বিতর্ক, বিশ্লেষণ, এমনকি সংশয়েও হয়তো নিরর্থক নয়। মার্কসবাদী পার্টিতে বিতর্ক থাকবে না, প্রশ্ন থাকবে না, তাই হয় নাকি!

হীরু লেটের, হীরু লেটদের বিক্ষত শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে, আপনি পাবেন মার্কসবাদী পার্টির, মার্কসবাদী পার্টি সংগঠনের আরেকটি পাঠ — পার্টির প্রতি অবিচল বিশ্বাস। সেটাও জরুরি, ভীষণ জরুরি। আবশ্যিক জরুরি।

আমাদের বিতর্ক আছে, বিশ্লেষণ আছে, পাঁচটা খবরের কাগজ পড়া, টিভি চ্যানেল দেখার সংক্রমিত হতাশাও আছে কখনও কখনও। হীরু লেটদের আছে বিশ্বাস। পার্টি তাঁদের কাছে পথের ঝরানো রক্ত, মাংসের আরেক নাম। জীবনের প্রতিশব্দ। সত্তার সমার্থক।

হীরুর কাছ থেকে মার্কসবাদী পার্টির সেই পাঠ নিয়ে নেমে আসতে যাব, হঠাৎ হাত রাখলাম তাঁর মাথায়। সারা মাথায় সেলাইয়ের সু‍‌তোগুলো আমার ডান হাতের আঁজলায় খরখর করে উঠল। মনে পড়ে না বুকের গভীর থেকে এমনভাবে কোনও স্থান ছুঁয়েছি কখনও!

নেমে আসছি।

এই ছোঁয়ার পর আমাদের সকল অক্ষর, সংগ্রাম, হীরুদের জন্য ছাড়া অন্য কোনও ঠিকানায় যাবে না কোনোদিন। লালনিশান ছাড়া অন্য কোনও নিশানায় যেতে পারে না কোনোদিন।

এবারের নববর্ষে আমাদের পারস্পরিক শুভেচ্ছার প্রয়োজন নেই তত। প্রয়োজন শপথের। ইস্পাতের মতো।

INTRO

এবারের নববর্ষে শুভেচ্ছার থেকে বেশি প্রয়োজন শপথের। কারণ হীরু লেটের মতো মানুষগুলি আজ আক্রান্ত, রক্তাক্ত। শাসকের আঘাতে ভয় না করে তারা বহন করছে লালঝান্ডা। এরাজ্যের মানুষের বাঁচার জন্য। এইসব সাহসী মানুষদের নিয়েই এই লেখা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement