শিক্ষকদের পায়ে বেড়ি পড়াতে
নতুন বিধি মমতা সরকারের

ব্রিটিশ শাসনেও এমন দাসত্ব ছিল না, মত শিক্ষামহলে

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৭ই এপ্রিল , ২০১৮

কলকাতা, ১৬ই এপ্রিল— উচ্চশিক্ষাকে পুরোপুরি কবজা করতে এবং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতেই রাজ্য সরকার আদর্শ আচরণ বিধি জারি করতে চাইছে। এমন দাসত্বের বিধি যা শাসকদল জারি করতে চাইছে, তা পরাধীন দেশে ব্রিটিশ সরকার পারেনি বলে শিক্ষকমহলের মত। রাজ্য সরকার যদি এই স্বৈরাচারী পদক্ষেপ কার্যকর করে তাহলে তার বিরুদ্ধে তীব্রতর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা।

রাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় (প্রশাসন ও বিধি), ২০১৭আইন পাশ করেছে সরকার। সেই আইনকে কার্যকর করতে শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের আদর্শ আচরণ বিধির খসড়া তৈরি করেছে উচ্চশিক্ষা দপ্তর। ২২পাতার আচরণ বিধির খসড়ায় ছত্রে ছত্রে রয়েছে অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক পদক্ষেপের নমুনা। এমন ধারার বিধি যদি কার্যকর হয় তাহলে শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের গণতান্ত্রিক অধিকার বলে যেমন কিছু থাকবে না, তেমনি উচ্চশিক্ষাকে বেসরকারিকরণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে বলে শিক্ষকমহলের ধারণা।

খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে, কোনও শিক্ষক বা শিক্ষাকর্মীর বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ ওঠে তাহলে সেই শিক্ষক বা শিক্ষাকর্মী আইনজীবীর সাহায্য নিতে পারবেন না, আদালতেও যেতে পারবেন না। রাজ্য সরকার একটি ট্রাইব্যুনাল গড়বে। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একমাত্র ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে পারবেন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা। এছাড়া খসড়ায় শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের পুলিশি রেকর্ড যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে, কলেজ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের দুই বছর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের তিন বছর প্রশিক্ষণ পর্ব থাকবে। আগে, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশিক্ষণ পর্বের সময়সীমা ছিল এক বছরের। খসড়ায় বলা হয়েছে, পুলিশি রেকর্ড যাচাই করা হবে তখনই। এত দিন শিক্ষকদের কোনও পুলিশি রেকর্ড যাচাই করা হতো না। শাসকের হাতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতেই এ বার প্রশিক্ষণ পর্বে ওই রেকর্ড যাচাইয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষকরা।

এদিকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কেউ সংবাদমাধ্যমে যোগাযোগ করলে শাস্তি হতে পারে বলে জানাচ্ছে খসড়া বিধি। যদি মনে হয়, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কোনও বিষয় সরকার-বিরোধী, তখন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারবে রাজ্য। সরকার যদি মনে করে কোনও শিক্ষক বা শিক্ষাকর্মীর আচরণ তাদের পক্ষে ক্ষতিকর, সেটাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করা হবে। পদোন্নতি, বদলি নির্ভর করবে কর্তৃপক্ষের গোপন রিপোর্টের উপরে। এ নিয়ে শিক্ষকমহলের বক্তব্য, রাজনৈতিক স্বার্থে এই ধরনের বিধি ব্যবহারে প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধরনের বিধির মধ্যে দিয়ে সাংবিধানিক অধিকারের ওপর সরাসরি সরকার হস্তক্ষেপ করতে চাইছে বলে মত শিক্ষকমহলের।

শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ভয়ংকর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে শাসকদল। এমন অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে উচ্চশিক্ষা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। গণ-আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে এমন বিধি বাতিলের প্রাণপণ লড়াই শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের করতে হবে বলে তিনি মনে করেন। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ তথা বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য আনন্দদেব মুখোপাধ্যায় বলেছেন, পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ সরকারও এই ধরনের বিধি চালু করার সাহস পায়নি। যা বর্তমান শাসকদল করছে। যেসব বিধি শাসকদল শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে তা অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী পদক্ষেপ। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য শুভংকর চক্রবর্তী বলেছেন, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের আচরণ বিধির নমুনা যা কাগজে পড়লাম তা একথায় দাসত্বের বিধি। একজন শিক্ষক হিসাবে আর একজন শিক্ষকের এই অসম্মানিত বিধি প্রণয়নের চেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ করছি এবং যাঁদের আত্মসম্মান রয়েছে তাঁদেরকেও প্রতিবাদে শামিল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

আদর্শ আচরণ বিধির বিরোধিতা করে পশ্চিমবঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শ্রুতিনাথ প্রহরাজ বলেছেন, খসড়ায় উল্লেখিত বিধি যদি কার্যকর হয় তাহলে শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের চরম অসম্মানিত করা হবে। শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা-সহ গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে এই বিধি শিক্ষাদানের পরিবেশকে বিঘ্নিত করে তুলবে। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে বেসরকারিকরণে উৎসাহিত করার জন্য এমন স্বৈরতান্ত্রিক পদক্ষেপ সরকার নিতে চাইছে। এর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প কোনও পথ নেই। এর আগে স্কুল শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের এমন অগণতান্ত্রিক বিধির খসড়া সরকারের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। সেই বিধির বিরোধিতা করে একাধিক শিক্ষক সংগঠন আন্দোলন জারি রেখেছে। এবার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের একই ধারায় বেড়ি পড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার। শুধু শিক্ষক বা শিক্ষাকর্মীদের ক্ষেত্রেই নয়, রাজ্যের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় সমস্ত ধরনের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে সরকার। নতুন আইন করে স্বশাসিত শিক্ষা পর্ষদগুলির গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে সরকার পর্ষদগুলির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিয়েছে। এবার আদর্শ আচরণ বিধির মধ্যে দিয়ে শাসকদল শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের সরাসরি কর্মচারী করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

Featured Posts

Advertisement