মোদী সরকার একে একে রেহাই দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থীদের

  ১৭ই এপ্রিল , ২০১৮

নয়াদিল্লি, ১৬ই এপ্রিল— মোদীর নেতৃত্বে বি জে পি সরকার আসার পর থেকেই সন্ত্রাসবাদী নাশকতার ঘটনাগুলি থেকে পরপর ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে অসীমানন্দ সহ অন্য হিন্দুত্ববাদীরা। সোমবার মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণ মামলা থেকে অসীমানন্দ সহ অন্য হিন্দুত্ববাদীদের ‘মুক্তি’ দেওয়ার পরেই ইস্তফা দিয়েছেন বিচারক। মোদী সরকারের নির্দেশেই হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসবাদীদের ছেড়ে দিচ্ছে এন আই এ- এমন বিশ্বাসই আরও জোরালো হয়েছে বিচারকের ইস্তফায়।

২০০৬-২০০৮সাল পর্যন্ত পরপর ঘটা সন্ত্রাসবাদী নাশকতার ঘটনায় নাম উঠে আসে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের। সমঝোতা এক্সপ্রেস (২০০৭), আজমেঢ় শরিফ (২০০৭) মালেগাঁও (২০০৬), মক্কা মসজিদ (২০০৬), মালেগাঁও (২০০৮) বিস্ফোরণগুলি ঘটে। প্রথমে এইগুলিকে সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের কাজ বলে বহু মুসলিম যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর দ্বিতীয় মালেগাঁও বিস্ফোরণের তদন্ত করতে গিয়ে মুম্বাই এ টি এসের প্রধান হেমন্ত কারকারের নেতৃত্বে তদন্তকারী দল হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসবাদীদের খোঁজ পান। সেই তদন্তসূত্রেই এই সবকটি সন্ত্রাসবাদী নাশকতার ঘটনায় সামনে আসতে থাকে হিন্দুত্ববাদীদের নাম। ‘মাস্টার মাইন্ড’ হিসাবে চিহ্নিত হয় নবকুমার সরকার ওরফে অসীমানন্দ। তার সঙ্গেই স্বাধী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর, ভারতীয় সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল শ্রীকান্ত পুরোহিত সহ সঙ্ঘ পরিবারের প্রায় দশ জন। পরে মুম্বাইয়ে ২৬/১১ সন্ত্রাসবাদী হামলায় নিহত হন হেমন্ত কারকারে। যদিও ততদিনে সন্ত্রাসবাদী কাজে হিন্দুত্ববাদীদের যোগসূত্রের প্রমাণ স্পষ্ট হয়েছে।

সমস্ত ঘটনার তদন্তভার যায় সি বি আইয়ের কাছে। অভিনব ভারত সহ বেশ কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের যুক্ত থাকার কথা জানায় সি বি আই। মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণের ঘটনাও তারমধ্যে ছিল। সি বি আই তিনজনের নামে চার্জশিট দাখিল করে। সকলেই বৃহত্তর সঙ্ঘ পরিবারের লোক। আর এস এস প্রচারক দেবেন্দ্র গুপ্ত, হিন্দুত্ববাদী কর্মী লোকেশ শর্মা এবং সুনীল যোশি। এরমধ্যে সুনীল যোশির নাম সমঝোতা এক্সপ্রেস বিস্ফোরণ মামলাতেও ছিল। কিন্তু পুলিশ তাকে ধরার আগেই রহস্যজনকভাবে খুন হয়ে যায় যোশি। ২০১১সালে এই সমস্ত ঘটনার তদন্তভার যায় এন আই এ-র হাতে। এন আই এ জানায় আর এস এস নেতা অসীমানন্দই মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণের মূল হোতা। সি বি আই, এন আই এ সহ সব তদন্তকারী সংস্থাই মক্কা মসজিদ সহ বাকি বিস্ফোরণগুলির মধ্যে মিল খুঁজে পায়। সবগুলিতে একই ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার হয় এবং একইভাবে সেলফোনের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সমস্ত অভিযুক্তরাই মধ্য প্রদেশ থেকে এসেছিল এবং সমস্ত ঘটনাগুলোই করা হয়েছিল ইন্দোর থেকে।

শুধু তাই নয়, ‘তেহেলকা’ প্রকাশ করেছিল অসীমানন্দের জবানবন্দি। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অসীমানন্দ জানিয়েছিল কিভাবে হিন্দুত্ববাদী নেতারা এই সন্ত্রাসবাদী নাশকতা করেছে। গুজরাটের ডাঙে অসীমানন্দের আশ্রমেও এই বিষয়ে পরিকল্পনা হয়েছিল। সুনীল যোশিকেই এইসবের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফলে তদন্তের সময়ে যখন হিন্দুত্ববাদী যোগ পাওয়া যায়, সেই সময়েই খুন করা হয় যোশিকে। সন্ত্রাসবাদী কাজে নিজের ভূমিকার কথাও স্বীকার করেছিল অসীমানন্দ। কিভাবে অসীমানন্দ আর এস এস প্রচারক এবং অন্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীদের মালেগাঁও, মক্কা মসজিদ এবং আজমেঢ় বিস্ফোরণে কাজে লাগিয়েছে, সেই স্বীকারোক্তিও আছে।

সি বি আই, এন আই এ, মহারাষ্ট্র এ টি এসের তদন্ত, অসীমানন্দের জবানবন্দি সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট, যে এই বিস্ফোরণগুলিতে যুক্ত ছিল হিন্দুত্ববাদীরাই। যদিও মোদী সরকার আসার পর থেকেই দ্রুত এই তদন্তগুলোর চরিত্র বদলে যেতে থাকে। মোদী সরকারের নির্দেশেই এন আই এ তাদের আগের বলা কথা থেকে সম্পূর্ণ উলটো দিকে ঘুরে যায়। এতদিনের তদন্তে যাদের অপরাধী হিসাবে চিহ্নিত করেছিল, তাদেরই নির্দোষ সার্টিফিকেট দিতে শুরু করে এন আই এ। বিস্ফোরণের প্রত্যেকটি ঘটনা থেকে হিন্দুত্ববাদীদের মুক্তি দেওয়ার বন্দোবস্ত হবে এমন আশঙ্কা তৈরি হয় ২০১৫সালে। মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই। দ্বিতীয় মালেগাঁও মামলার বিশেষ সরকারি আইনজীবী রোহিনী সালিয়ান অভিযোগ করেন, হিন্দু সন্ত্রাসবাদীদের সম্পর্কে এন আই এ তাকে ‘নরম মনোভাব’ দেখাতে বলেছে। খোদ সরকারি আইনজীবীর এমন বক্তব্যে আশঙ্কা ছড়ায় মোদী সরকার সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত হিন্দুত্ববাদীদের ছেড়ে দিতে চলেছে। পরে বম্বে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টেও হলফনামা দিয়ে রোহিনী সালিয়ান একই অভিযোগ জানান।

সালিয়ানের জায়গায় নিয়োগ করা হয় অবিনাশ রাসেলকে। এরপর মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলায় নতুন চার্জশিট দিয়ে এন আই এ সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করে। সেই সময় অবিনাশ রাসেলও মুখ খোলেন। তিনি জানিয়ে দেন, তাঁকে অন্ধকারে রেখেই এই চার্জশিট দাখিল করেছে এন আই এ। নিজেদের আইনজীবীকে অন্ধকারে রেখে কেন চার্জশিট দিতে হলো এন আই কে, তা সহজেই অনুমেয়। আরও গুরুতর অভিযোগ, বেশকিছু সাক্ষীর বয়ানের নথি এন আই এ-র বিশেষ আদালত থেকে ‘হারিয়ে’ গেছে। এরমধ্যে রয়েছে মালেগাঁও বিস্ফোরণের কিছুদিন আগে প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরের সঙ্গে অন্য এক অভিযুক্তের বৈঠকের বয়ান। সন্ত্রাসবাদী সংগঠন অভিনব ভারতের এক কর্মকর্তা বৈঠক করেন প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর এবং শ্রীকান্ত পুরোহিতের সঙ্গে। সেই সাক্ষীর বয়ানও খুঁজে পাওয়া যায় না। সাক্ষীদের আগের বয়ান যা তারা বিচারকেরই সামনে দিয়েছিলেন, তা যদি না থাকে তাহলে নতুন করে তাদের যে বয়ান নেওয়া হবে তার সঙ্গে আগের বয়ান মিলিয়ে দেখার কোনও সুযোগ থাকে না। আগের বয়ান লোপাট করে দিয়ে এন আই এ এখন সাক্ষীদের তাদের মত বলিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ। ফলে প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর, কর্নেল পুরোহিত কারও বিরুদ্ধেই আর কোনও ‘প্রমাণ’ মেলেনি। তাদের ওপর থেকে সন্ত্রাসবাদী অভিযোগ তুলে নিয়েছে এন আই এ।

মনে রাখা প্রয়োজন, মালেগাঁওয়ের দ্বিতীয় বিস্ফোরণই হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসবাদের ‘নিউক্লিয়াস’। এই মামলাটি লঘু করে দিতে পারলেই বাকিগুলি তার অনুসারী হিসাবেই লঘু হয়ে যায়। ফলে মালেগাঁও মামলায় হিন্দুত্ববাদীরা নির্দোষ ‘প্রমাণ’ হয়ে যাওয়ায় অন্য মামলাগুলিরও ফলাফল একইরকম হতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই আজমেঢ় বিস্ফোরণ মামলায় ছাড় পেয়ে গেছে অসীমানন্দ। আগেই তাকে ছাড় দেওয়া হয়েছে প্রথম মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলা থেকেও। এবার মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণ মামলা থেকেও ছাড়া পেয়ে গেল অসীমানন্দ। বাকি শুধু সমঝোতা এক্সপ্রেস মামলা। বুক বাজিয়ে ঘোষণা করেছিলেন মোদী, ‘দেশকে সন্ত্রাসবাদ মুক্ত করবো।’ সন্ত্রাসবাদ নয়, চার বছরে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসবাদীদেরই একে একে মুক্ত করছেন জেল থেকে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement